সাক্ষাৎকারে আসামের মুখ্যমন্ত্রী

সন্দেহভাজনদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়

Printed Edition
back-3
সন্দেহভাজনদের রাতের অন্ধকারে বাংলাদেশে ঠেলে পাঠানো হয়

বিশেষ সংবাদদাতা

ভারতের আসাম রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার এক সাক্ষাৎকারে অবৈধ অনুপ্রবেশকারী ইস্যু নিয়ে দেয়া বক্তব্য ঘিরে নতুন করে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। ভারতের টেলিভিশন চ্যানেল এবিপি লাইভে প্রচারিত এই সাক্ষাৎকারে তিনি স্বীকার করেন, বাংলাদেশী সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের অনেক সময় আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়া ছাড়া সীমান্ত পেরিয়ে ‘পুশব্যাক’ করা হয়।

সাক্ষাৎকারে প্রশ্নোত্তরের একপর্যায়ে সাংবাদিক জানতে চান- বাংলাদেশী বলে সন্দেহভাজন নথিবিহীন ব্যক্তিদের কি যথাযথ কূটনৈতিক ও আইনি প্রক্রিয়ায় ফেরত পাঠানো হয়? জবাবে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি সহজ নয় এবং বিদেশ দফতরের মাধ্যমে এই প্রক্রিয়া জটিল ও সময়সাপেক্ষ।

তিনি বলেন, একজন বাংলাদেশীকেও ফেরত পাঠানো সহজ কাজ নয়। কারণ বাংলাদেশ সহজে কাউকে তাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে না। সীমান্তে সুযোগ বুঝে, যেখানে বিডিআর (বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ-বিজিবি) উপস্থিত থাকে না, সেখানে এসব ব্যক্তিদের ঠেলে সীমান্তের ওপারে পাঠানো হয়।

আসামের মুখ্যমন্ত্রী ‘পুশব্যাক’ প্রক্রিয়া ব্যাখ্যা করে বলেন- ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কয়েক দিন নিজেদের হেফাজতে রেখে পরে উপযুক্ত সুযোগে সীমান্ত পার করে দেয়। সাংবাদিক এ বিষয়ে বিস্ময় প্রকাশ করলে তিনি বলেন, ‘আপনি বাস্তবতা জানেন না- এভাবেই কাজটা হয়।’

ভারতের আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার এ সাক্ষাৎকার ভূরাজনৈতিক মহলে ব্যাপক চাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছে। এতে তিনি অকপটে স্বীকার করেছেন যে, যথাযথ আন্তর্জাতিক আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ না করে রাতের অন্ধকারে অনেকটা জোরপূর্বক সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের সীমান্ত পার করে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়া হয়।

চরম কূটনৈতিক স্পর্শকাতর এই বিষয়টি ইতোমধ্যেই মানবাধিকারকর্মী এবং বিশ্লেষকদের মধ্যে উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে। প্রতিবেশী রাষ্ট্রের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রেখে এমন ‘অপ্রাতিষ্ঠানিক উচ্ছেদ’ আন্তর্জাতিক আইনের পরিপন্থী কি না, তা নিয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে। নিচে তার সাক্ষাৎকারের বাংলাদেশ সংশ্লিষ্ট অংশটি বিস্তারিত-

প্রশ্ন : অনুপ্রবেশকারী ইস্যুতে আপনারা এক ধরনের অস্থিরতা তৈরি করেছেন। সরকারি তথ্য মতে, গত এক বছরে আসাম থেকে মাত্র এক হাজার ৪২২ জনকে বের করা হয়েছে। যেখানে আপনারা মাসে ৫০ জনকেও সরাতে পারছেন না, সেখানে সাধারণ জনগণকে কেন বলছেন রিকশাচালকদের ৫ টাকার বদলে ৪ টাকা দিয়ে হয়রানি করতে? আপনি কি সমাজে ফাটল ধরাচ্ছেন না?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : দেখুন, একজন বাংলাদেশীকেও আনুষ্ঠানিকভাবে ফেরত পাঠানো সহজ কাজ নয়। কারণ সীমান্তে বাংলাদেশ সীমান্তরক্ষী বাহিনী তাদের গ্রহণ করতে চায় না। তা ছাড়া ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কোনো কার্যকর প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই।

প্রশ্ন : তাহলে আপনারা তাদের ফেরত পাঠান কিভাবে?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : আমরা মূলত অন্ধকারের সুযোগ নিই। যেখানে বিডিআর (মুখ্যমন্ত্রী বিজিবির পুরনো নাম উল্লেখ করেন) থাকে না, সেখানে তাদের ঠেলে পার করে দেয়া হয়। বিএসএফ অনেক সময় এদের নিজেদের হেফাজতে রাখে, তারপর সুযোগ বুঝে সুবিধাজনক স্থান দিয়ে সীমান্ত পার করে দেয়। একেই বলে ‘পুশব্যাক’। এসব তথ্য আপনি দাফতরিকভাবে কোথাও পাবেন না।

প্রশ্ন : কিন্তু আইনি পথে কেন পাঠাচ্ছেন না?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : আইনি প্রক্রিয়া অত্যন্ত দীর্ঘ। আসামের এনআরসি অনুযায়ী প্রাথমিকভাবে ১৭ লাখ অনুপ্রবেশকারী শনাক্ত হয়েছে। এদের উচ্ছেদ করতে গেলে ফাইল পাঠাতে হবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে, সেখান থেকে যাবে বাংলাদেশে। বাংলাদেশ তখন নাগরিকত্বের প্রমাণ চাইবে এবং তাদের সিদ্ধান্ত নেবে। এই দীর্ঘ প্রক্রিয়ার চেয়ে ‘পুশব্যাক’ বা ঠেলে পাঠিয়ে দেয়াকেই আমরা কার্যকর মনে করছি।

প্রশ্ন : সাধারণ মানুষ বুঝবে কিভাবে কে বাংলাদেশী? সবাই তো দেখতে একই রকম। এতে কি নিরপরাধ মানুষ হয়রানির শিকার হবে না?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : না, তারা এক রকম নয়। আসামের প্রতিটি মানুষ চেনে কারা বাংলাদেশী। এটা আমাদের দীর্ঘদিনের অস্তিত্বের সংগ্রাম। আমি হয়তো এখানে বসে সংজ্ঞায়িত করতে পারব না; কিন্তু রাজপথে গেলে যে কেউ বলে দিতে পারবে কারা নতুন এসেছে। আমরা চাই এমন এক সামাজিক পরিবেশ তৈরি করতে যাতে তারা নিজেরাই চলে যেতে বাধ্য হয়।

প্রশ্ন : অনুপ্রবেশকারীদের নিয়ে আপনার বক্তব্যে বলা হচ্ছে- সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা চলে যায়। কিন্তু বাস্তবে কতজনকে ফেরত পাঠানো হয়েছে?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : আইন সভায় দেয়া তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে প্রায় এক হাজার ৪২২ জন অবৈধ বিদেশীকে আসাম থেকে বের করে দেয়া হয়েছে।

প্রশ্ন : কিন্তু আপনি তো বলছেন সাধারণ মানুষ তাদের হয়রানি করুক- এতে কি সমাজে বিভাজন তৈরি হচ্ছে না?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : আমি বলছি, সমাজে এমন পরিবেশ তৈরি করতে হবে যাতে তারা নিজেদের থেকেই চলে যায়। এটি সামাজিক প্রতিরোধের অংশ।

প্রশ্ন : একজন বাংলাদেশীকে ফেরত পাঠানো এত কঠিন কেন?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : কারণ এটি সহজ নয়। বিদেশ দফতরের মাধ্যমে প্রক্রিয়া চালাতে হয়, যা জটিল ও সময় সাপেক্ষ। বাংলাদেশ সহজে কাউকে তাদের নাগরিক হিসেবে গ্রহণ করে না।

প্রশ্ন : তাহলে বাস্তবে কিভাবে তাদের ফেরত পাঠানো হয়?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : অনেক ক্ষেত্রে আনুষ্ঠানিকভাবে সম্ভব হয় না। তখন সুযোগ বুঝে সীমান্ত দিয়ে পাঠাতে হয়।

প্রশ্ন : আপনি কি বলতে চাইছেন- আইনি প্রক্রিয়া ছাড়া তাদের পাঠানো হয়?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : বাস্তবতা হলো, সীমান্তে যেখানে ‘বিডিআর’ উপস্থিত থাকে না, সেখানে তাদের ঠেলে পার করে দেয়া হয়- এটাকেই ‘পুশব্যাক’ বলা হয়।

প্রশ্ন : এই প্রক্রিয়ায় ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর ভূমিকা কী?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের কিছুদিন হেফাজতে রাখে- ১০ থেকে ৪০ দিন পর্যন্ত। পরে সুযোগ বুঝে সীমান্ত পার করে দেয়।

প্রশ্ন : কিন্তু তারা তো আবার ফিরে আসতে পারে?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : হ্যাঁ, অনেকেই ফিরে আসে- বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গের দিক দিয়ে।

প্রশ্ন : ভারত ও বাংলাদেশের মধ্যে কি কোনো প্রত্যর্পণ চুক্তি নেই?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : কার্যকরভাবে এমন কোনো চুক্তি নেই যার মাধ্যমে সহজে কাউকে ফেরত পাঠানো যায়। বাংলাদেশ প্রমাণ চায়।

প্রশ্ন : সুপ্রিম কোর্টের রায়ের প্রভাব কী?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : রায়ে বলা হয়েছে, জেলা ম্যাজিস্ট্রেট যদি মনে করেন কেউ ভারতীয় নয়, তাহলে তাকে উচ্ছেদের আদেশ দিতে পারেন। তবে কোথায় পাঠাতে হবে, তা স্পষ্ট নয়।

প্রশ্ন : তাহলে ‘উচ্ছেদ’ বলতে কী বোঝাচ্ছেন?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : বাস্তবে উচ্ছেদ মানে সীমান্তে নিয়ে গিয়ে পুশব্যাক করা।

প্রশ্ন : কতজনকে এভাবে পাঠানো হয়েছে?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : সঠিক সংখ্যা আনুষ্ঠানিকভাবে বলা হয় না। তবে অনেক ক্ষেত্রে এভাবে পাঠানো হয়েছে।

প্রশ্ন : সাধারণ মানুষ কিভাবে বুঝবে কে বাংলাদেশী?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : আসামের মানুষ জানে। এটি তাদের দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও বাস্তবতার অংশ।

প্রশ্ন : চিহ্নিত করার নির্দিষ্ট কোনো পদ্ধতি আছে?

হিমন্ত বিশ্বশর্মা : এটি আনুষ্ঠানিকভাবে ব্যাখ্যা করা যায় না, তবে স্থানীয় মানুষ নিজেরাই বুঝতে পারে।

এই সাক্ষাৎকারে ‘পুশব্যাক’ পদ্ধতির স্বীকারোক্তি, আইনি প্রক্রিয়ার সীমাবদ্ধতা এবং সামাজিকভাবে অনুপ্রবেশকারীদের বয়কটের আহ্বান- সবমিলিয়ে বিষয়টি মানবাধিকার, আন্তর্জাতিক আইন এবং বাংলাদেশ- ভারত সম্পর্কের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।