জাতির উদ্দেশে প্রধান উপদেষ্টার বিদায়ী ভাষণ
সংস্কার, বিচার ও নির্বাচনের লক্ষ্য অর্জন করেছে অন্তর্বর্তী সরকার
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
দীর্ঘ দেড় দশকের রাজনৈতিক অস্থিরতা, গণ-অভ্যুত্থান এবং অন্তর্বর্তী শাসনপর্বের পর নির্বাচিত সরকারের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তরের প্রাক্কালে জাতির উদ্দেশে এক আবেগঘন ও মূল্যায়নধর্মী বিদায়ী ভাষণ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূস। তিনি বলেন, গত ১৮ মাসে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান লক্ষ্য ছিল তিনটি-সংস্কার, বিচার ও একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন এবং এই তিন ক্ষেত্রেই রাষ্ট্রকে ‘স্বাভাবিক ধারায়’ ফেরানোর চেষ্টা করা হয়েছে।
ভাষণের শুরুতেই তিনি দেশবাসীকে শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, ‘দীর্ঘ ১৭ বছর পর একটি উৎসবমুখর, অংশগ্রহণমূলক ও শান্তিপূর্ণ জাতীয় নির্বাচন আয়োজন সম্ভব হয়েছে। জনগণ, রাজনৈতিক দল, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সম্মিলিত প্রচেষ্টায় বাংলাদেশ গণতান্ত্রিক উত্তরণের একটি নজির স্থাপন করেছে।’
গণ-অভ্যুত্থান থেকে দায়িত্ব গ্রহণ : প্রধান উপদেষ্টা স্মরণ করেন জুলাইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের দিনগুলো। তার ভাষায়, সেটি ছিল ‘মুক্তির উল্লাসের দিন’, তবে একই সাথে রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল প্রায় অচল। অনেক প্রশাসনিক কর্মকর্তা দায়িত্ব ত্যাগ করেন বা আত্মগোপনে চলে যান। সেই সঙ্কটে ছাত্রনেতাদের আহ্বানে তিনি বিদেশ থেকে ফিরে দায়িত্ব নেন।
‘আমাদের প্রথম কাজ ছিল দেশকে সচল করা। ভেঙে পড়া প্রশাসন, অবিশ্বাস আর ভয়ের পরিবেশের মধ্যে নতুন করে আস্থা গড়ে তোলা ছিল সবচেয়ে কঠিন চ্যালেঞ্জ,’ বলেন তিনি।
সংস্কার : প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের উদ্যোগ
ভাষণে অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কার কর্মসূচিকে সবচেয়ে বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়। প্রধান উপদেষ্টা জানান- প্রায় ১৩০টি নতুন আইন ও সংশোধনী প্রণয়ন ৬০০টির বেশি নির্বাহী আদেশ জারি অধিকাংশই ইতোমধ্যে বাস্তবায়নাধীন। তিনি দাবি করেন, এসব পদক্ষেপ নাগরিক অধিকার সুরক্ষা, বিচারব্যবস্থার স্বাধীনতা এবং গুম-খুন-বিচারবহির্ভূত হত্যার সংস্কৃতি বন্ধে কাঠামোগত পরিবর্তন এনেছে।
পুলিশ বাহিনীকে ‘জনবান্ধব ও জবাবদিহিমূলক’ রূপ দিতে নতুন কমিশন কাঠামো, বিচার বিভাগে পৃথক সচিবালয়, স্বচ্ছ নিয়োগব্যবস্থা এবং মানবাধিকার কমিশন পুনর্গঠনের কথাও উল্লেখ করেন তিনি।
নারী ও শিশুর সুরক্ষায় যৌন হয়রানি প্রতিরোধ, পারিবারিক সহিংসতা প্রতিরোধ এবং নির্যাতন দমন আইন সংশোধনের কথাও তুলে ধরা হয়।
বিচার : দায়মুক্তির সংস্কৃতির অবসানের প্রতিশ্রুতি
দীর্ঘ স্বৈরশাসনের সময়ে সংঘটিত গুম, নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিচারে একাধিক ট্রাইব্যুনাল কাজ করছে বলে জানান প্রধান উপদেষ্টা। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে গুমকে মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, ‘বিচারকে আমরা প্রতিশোধের ঊর্ধ্বে রেখেছি। ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠাই ছিল একমাত্র লক্ষ্য।’
নির্বাচন : ‘নতুন অভিযাত্রার সূচনা’
সাম্প্রতিক জাতীয় নির্বাচনকে তিনি শুধু ক্ষমতা হস্তান্তর নয়, বরং ‘বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার নতুন যাত্রা’ হিসেবে অভিহিত করেন। বিজয়ী ও পরাজিত-উভয় পক্ষকেই অভিনন্দন জানিয়ে বলেন, গণতন্ত্রে হার-জিতই সৌন্দর্য।
প্রথমবারের মতো প্রবাসীদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করাকে তিনি বিশেষ সাফল্য হিসেবে তুলে ধরেন।
অর্থনীতি : ধ্বংসস্তূপ থেকে পুনর্গঠন
ভাষণে অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে উল্লেখ করে তিনি বলেন, দায়িত্ব নেয়ার সময় ব্যাংকিং ব্যবস্থা দুর্বল, রিজার্ভ সঙ্কুুচিত এবং অর্থপাচার ব্যাপক ছিল।
সরকারের গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ হিসেবে তিনি উল্লেখ করেন- রাজস্ব ও কর ব্যবস্থায় সংস্কার, আর্থিক খাতে শৃঙ্খলা, বাজার তদারকি ও খাদ্য মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ ও প্রবাসী আয় বৃদ্ধি। তার দাবি, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ এখন ৩৪ বিলিয়ন ডলার, যা অর্থনীতিকে স্থিতিশীল করেছে।
শ্রমিক অধিকার সুরক্ষায় আন্তর্জাতিক শ্রম মানদণ্ড অনুসরণ, নতুন শ্রম আইন, এবং প্রবাসী কর্মীদের আইনি সহায়তা জোরদারের কথাও বলেন তিনি।
পররাষ্ট্রনীতি ও নিরাপত্তা : প্রধান উপদেষ্টা জানান, বাংলাদেশ এখন ‘নতজানু নয়, আত্মবিশ্বাসী ও ভারসাম্যপূর্ণ’ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করছে। আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক শক্তিগুলোর সাথে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সম্পর্ক জোরদার হয়েছে। রোহিঙ্গা সঙ্কট আন্তর্জাতিক অঙ্গনে আবার গুরুত্ব পেয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি।
সশস্ত্র বাহিনীর আধুনিকায়ন ও প্রতিরক্ষা সক্ষমতা বৃদ্ধিতে নতুন উদ্যোগ নেয়ার কথাও উল্লেখ করেন।
তরুণ প্রজন্ম ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন : দেশের তরুণদের দক্ষ জনশক্তি হিসেবে গড়ে তুলতে শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সততার ওপর জোর দেন প্রধান উপদেষ্টা। তার ভাষায়, ‘বাংলাদেশ শুধু স্বল্পমূল্যের শ্রমের দেশ হবে না; দক্ষতা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে রূপান্তরিত হবে।’
তিনি দুর্নীতি ও অসততার সংস্কৃতি থেকে সরে এসে জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্র গঠনের আহ্বান জানান।
স্মৃতি ও দায়বদ্ধতা : গণ-অভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের স্মরণ করে তিনি বলেন, তাদের আত্মত্যাগ যেন জাতি কখনো না ভোলে। ক্ষমতার অপব্যবহারের ইতিহাস ধরে রাখতে সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বাসভবনকে “জাতীয় জুলাই স্মৃতি জাদুঘর” হিসেবে প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন।
শেষ বার্তা : ভাষণের শেষাংশে প্রধান উপদেষ্টা দেশবাসীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে বলেন, ‘আমরা দায়িত্ব ছেড়ে যাচ্ছি, কিন্তু গণতন্ত্র, জবাবদিহিতা ও অধিকারচর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে তা যেন কখনো থেমে না যায়। নতুন বাংলাদেশ গড়ার দায়িত্ব এখন সবার।’
দোয়া প্রার্থনা করে তিনি বিদায় নেন।
অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসের শাসনকালকে প্রধান উপদেষ্টা উপস্থাপন করেছেন পুনর্গঠন, প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার, বিচার প্রক্রিয়া সক্রিয়করণ এবং একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের মধ্য দিয়ে গণতান্ত্রিক উত্তরণের অধ্যায় হিসেবে। এখন দৃষ্টি নির্বাচিত সরকারের হাতে এই ধারাবাহিকতা রক্ষার দিকে।