ইরানে তেজ হারাচ্ছে বিক্ষোভ সরকারের পক্ষে রাস্তায় জনতা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
কয়েক সপ্তাহের টানা বিক্ষোভের পর ইরানে সরকারবিরোধী আন্দোলন ধীরে ধীরে নিস্তেজ হয়ে আসছে। একই সাথে, রাজধানী তেহরানসহ দেশটির বিভিন্ন শহরে সরকারের পক্ষে বিশাল সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আলজাজিরার খবর অনুযায়ী এটি পরিস্থিতি ধীরে ধীরে সরকারের নিয়ন্ত্রণে আসার ইঙ্গিত দিচ্ছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিংকট্যাংক ইনস্টিটিউট ফর দ্য স্টাডি অব ওয়ারের ক্রিটিক্যাল থ্রেটস প্রজেক্ট জানিয়েছে, গত রোববার থেকে ইরানজুড়ে বিক্ষোভের মাত্রা কমতে শুরু করেছে। সংস্থাটির মতে, সরকারের দেশব্যাপী ইন্টারনেট বন্ধ এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপর কড়াকড়ি আরোপের ফলে আন্দোলনের গতি শ্লথ হয়ে পড়েছে।
এদিকে ইরানের বিভিন্ন শহরে সরকারপন্থী পাল্টা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হচ্ছে। আলজাজিরার তেহরান প্রতিনিধি তোহিদ আসাদি জানান, রাজধানীতে ডাকা সরকারপন্থী সমাবেশে হাজার হাজার মানুষ অংশ নিচ্ছেন। তিনি জানিয়েছিলেন, আগামী কয়েক ঘণ্টার মধ্যে নগালাবি স্কয়ারেও আরেকটি বড় সমাবেশ অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। ইরানি কর্তৃপক্ষ এসব সমাবেশে অংশ নিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে। ইরানে ইন্টারনেট ফের চালু করার ঘোষণা প্রসঙ্গে কাতারের জর্জটাউন বিশ্ববিদ্যালয়ের বিশ্লেষক মেহরান কামরাভা বলেন, সরকার মূলত রাস্তায় গণজমায়েত ঠেকাতেই ইন্টারনেট বন্ধ করেছিল। তার মতে, এখন পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে এসেছে বলেই কর্তৃপক্ষ আবার ইন্টারনেট চালু করতে যাচ্ছে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি এরই মধ্যে জানিয়েছেন, শিগগির ইন্টারনেট চালু করা হবে। কামরাভার কথায়, ইরানের নেতৃত্ব দেশবাসী ও আন্তর্জাতিক মহলকে দেখাতে চায় যে, পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে এবং তারা আলোচনায় আগ্রহী। পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো জানিয়েছেন, শিগগিরই দেশে ইন্টারনেট পুনরায় চালু করা হবে। সরকার নিরাপত্তা সংস্থার সাথে সমন্বয় করে এ বিষয়ে অগ্রগতি করছে। তিনি জানিয়েছেন, দূতাবাস এবং সরকারি দফতরগুলোর ইন্টারনেট সংযোগও পুনঃস্থাপন করা হবে। কামরাভা বলেন, ‘এটি তেহরানের জন্য সবচেয়ে গুরুতর সঙ্কটগুলোর একটি। সরকার এখন সঙ্কট ব্যবস্থাপনায় রয়েছে। তারা একদিকে জনসমর্থন দেখাতে চায়, অন্য দিকে যুক্তরাষ্ট্রকে বার্তা দিতে চায় যে রাষ্ট্র এখনো শক্ত অবস্থানে রয়েছে।’
এরই মধ্যে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরাকচি চলমান অস্থিরতাকে ‘বিক্ষোভ’ নয়, বরং ‘সন্ত্রাসী যুদ্ধ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘সন্ত্রাসী উপাদান’ সরকারি ভবন, পুলিশ স্টেশন ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে হামলা চালিয়েছে। আরাকচি বলেন, ‘যা চলছে তা প্রতিবাদ নয়, এটি দেশের বিরুদ্ধে একটি সন্ত্রাসী যুদ্ধ।’ তিনি আরো দাবি করেন, নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষের ওপর গুলি চালানোর নির্দেশ দেয়ার অডিও প্রমাণ সরকারের হাতে রয়েছে। সরকারের এই কঠোর অবস্থান এবং সরকারপন্থী সমাবেশের মধ্য দিয়ে ইরানে চলমান রাজনৈতিক অস্থিরতা একটি নতুন পর্যায়ে প্রবেশ করেছে বলে বিশ্লেষকদের ধারণা।
বিক্ষোভে হতাহতদের স্মরণে ৩ দিনের শোক
এদিকে দেশজুড়ে চলমান বিক্ষোভে একাধিক সহিংসতায় অনেক মানুষের প্রাণহানির পর তিন দিনের রাষ্ট্রীয় শোক ঘোষণা করা হয়েছে। নিহত ইরানিদের স্মরণে প্রেসিডেন্ট ও মন্ত্রিসভা শোক পালন করছে বলে জানিয়েছে প্রেসিডেন্টের দফতর। ইরানের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা তাসনিম নিউজ এ খবর জানিয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলি সরকারের বিরুদ্ধে ইরানের প্রতিরোধ আন্দোলনের সময় যারা নিহত হয়েছেন, তাদের স্মরণেই এই জাতীয় শোক পালন করা হচ্ছে। সরকারি এক বিবৃতিতে বলা হয়, ইরানি জাতি দেখেছে যে, কিভাবে অপরাধীরা দায়েশের (আইএসআইএল বা আইএসআইএস) মতো বর্বর সহিংসতা চালিয়ে সাধারণ মানুষ, বাসিজ স্বেচ্ছাসেবক ও পুলিশ সদস্যদের লক্ষ্যবস্তু করেছে, ফলে অনেকেই শহীদ হয়েছেন।
ইরানের পাশে থাকার ঘোষণা চীনের
তা ছাড়া আনাদোলু এজেন্সি জানায়, ইরানে চলমান বিক্ষোভের প্রেক্ষাপটে দেশটিতে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অভিযানের বিরোধিতা করে তেহরানের পাশে থাকার প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছে চীন। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের নিয়মিত ব্রিফিংয়ে মুখপাত্র মাও নিং বলেন, তারা অন্য দেশে-বিদেশী হস্তক্ষেপকে সমর্থন করে না। গতকাল সোমবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট তেহরানে সামরিক অভিযানের হুমকি দেন এবং ইরানের শীর্ষ নেতাদের সাথে আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এরপরই বেইজিং এ মন্তব্য করে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের এই অবস্থান মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে। মুখপাত্র মাও নিং আশা করেন, সহিংসতা বন্ধে করে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে ইরান দ্রুত সমস্যাগুলো কাটিয়ে উঠবে। তিনি রাষ্ট্রীয় সার্বভৌমত্বের রক্ষায় সবাইকে শান্ত থাকার ওপর জোর জোর দিয়েছেন। তিনি জোর দিয়ে বলেন, বেইজিং সব সময় অন্য দেশের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ প্রত্যাখ্যান করে আসছে।