ভ্যাপসা গরমে বিদ্যুতের লুকোচুরি জনজীবনে নাভিশ্বাস
বেশি বিপাকে পড়েছে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা
Printed Edition
নয়া দিগন্ত ডেস্ক
দেশজুড়ে বইছে তীব্র ভ্যাপসা গরম, তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে ঘনঘন লোডশেডিং। বিশেষ করে গ্রামীণ জনপদে বিদ্যুতের এই ভেল্কিবাজি সাধারণ মানুষের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে। তীব্র তাপদাহে ঘরে-বাইরে কোথাও স্বস্তি নেই। সবচেয়ে বেশি বিপাকে পড়েছে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা। পড়ার টেবিলে বসলেই বিদ্যুৎ চলে যাওয়ায় ব্যাহত হচ্ছে পরীক্ষার প্রস্তুতি। কোথাও চাহিদার অর্ধেক সরবরাহ, আবার কোথাও জ্বালানি সঙ্কটে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় শিল্প-কারখানায় স্থবিরতা নেমে এসেছে। কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও করেছে বিক্ষুব্ধ জনতা।
দিনাজপুর প্রতিনিধি জানান, বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ভেঙে পড়ায় এবং অসহনীয় লোডশেডিংয়ের প্রতিবাদে নবাবগঞ্জ পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে স্থানীয় জনতা। জেলায় নেসকো ও পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির মাধ্যমে সরবরাহ চললেও চাহিদার চেয়ে প্রায় ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ কম পাওয়া যাচ্ছে। দিনাজপুর চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক সহিদুর রহমান জানান, লোডশেডিংয়ের কারণে মিলের উৎপাদন সচল রাখতে জেনারেটর ব্যবহার করতে হচ্ছে, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি জানায়, ১০০ থেকে ১২২ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে ২৫-৩০ মেগাওয়াট ঘাটতি থাকছে।
মাদারীপুর প্রতিনিধি জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় দিনে ও রাতে ১০-১২ ঘণ্টা লোডশেডিং হচ্ছে। এতে শহর থেকে গ্রাম- সর্বত্রই ভোগান্তি চরমে। সবচেয়ে বেশি কষ্ট পাচ্ছেন পল্লী বিদ্যুৎ সমিতির গ্রাহকরা। বিদ্যুৎ সঙ্কটে স্থানীয় ছাপাখানা ও কলকারখানার চাকা ঘুরছে না, ফলে উৎপাদন নেমে গেছে অর্ধেকে। ওজোপাডিকো জানায়, ১৬ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে তারা পাচ্ছে মাত্র ১২ মেগাওয়াট। অন্য দিকে পল্লী বিদ্যুতের ৯৮ মেগাওয়াট চাহিদার বিপরীতে মিলছে মাত্র ৫২ মেগাওয়াট। পল্লী বিদ্যুৎ সমিতি বলছে, এলাকাভিত্তিক ভাগ করে লোডশেডিং দেয়া হচ্ছে।
লালমোহন (ভোলা) সংবাদদাতা জানান, তীব্র ভ্যাপসা গরমের মাঝে ঘণ্টায় ২০ থেকে ৩০ বার বিদ্যুতের ‘আসা-যাওয়া’ জনজীবনকে অতিষ্ঠ করে তুলেছে। বিশেষ করে এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা মারাত্মকভাবে বিঘিœত হচ্ছে। ভোলার নিজস্ব গ্যাস দিয়ে উৎপাদিত বিদ্যুৎ অন্যান্য জেলায় সরবরাহ করা হলেও স্থানীয় ৮৪ হাজার গ্রাহক বঞ্চিত হচ্ছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ব্যবসায়ীরা জানান, বিদ্যুতের অভাবে ফ্রিজের মালামাল নষ্ট হচ্ছে এবং ব্যবসায়প্রতিষ্ঠান বন্ধ রাখতে হচ্ছে। পল্লী বিদ্যুতের ডিজিএম মাহমুদুল হাসান জানান, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় লোডশেডিং দেয়া ছাড়া বিকল্প কোনো উপায় নেই।
বেলাব (নরসিংদী) সংবাদদাতা জানান, প্রচণ্ড তাপদাহের সাথে নজিরবিহীন লোডশেডিংয়ে স্থবির হয়ে পড়েছে সাধারণ জীবনযাত্রা। উপজেলা প্রশাসন, ব্যাংক ও বৃহৎ বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতে কাজকর্ম ব্যাহত হচ্ছে। এসএসসি পরীক্ষার্থীদের পড়াশোনা ব্যাহত হওয়ায় দুশ্চিন্তায় পড়েছেন অভিভাবকরা। নরসিংদী পল্লী বিদ্যুৎ অফিস জানিয়েছে, চাহিদার মাত্র ৪০ শতাংশ বিদ্যুৎ সরবরাহ পাওয়ায় পুরো এলাকা কাভার করা অসম্ভব হয়ে পড়েছে। লোডশেডিংয়ের প্রভাবে স্থানীয় মিল-ফ্যাক্টরির উৎপাদন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এবং অনেক এলাকায় বাধ্য হয়ে জেনারেটর ব্যবহার করা হচ্ছে।
কাউখালী (পিরোজপুর) সংবাদদাতা জানান, তীব্র তাপদাহ ও ঘনঘন বিদ্যুৎ বিভ্রাটে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছে চলমান এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার্থীরা। দীর্ঘ সময় বিদ্যুৎ না থাকায় রাতে মোমবাতি বা চার্জলাইটের আলোতে পড়াশোনা করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা শারীরিক ও মানসিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে। অভিভাবকরা জানান, এমন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ নিশ্চিত না করা হলে শিক্ষার্থীদের ফলাফলে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। স্থানীয় বিদ্যুৎ বিভাগের দাবি, জাতীয় গ্রিডে উৎপাদন ঘাটতিতে সাময়িকভাবে লোডশেডিং বেড়েছে।
কোটালীপাড়া (গোপালগঞ্জ) সংবাদদাতা জানান, সন্ধ্যা নামলেই গ্রামীণ জনপদ ভুতুড়ে নগরীতে পরিণত হচ্ছে। সরকার ঘোষিত নির্দেশনা অনুযায়ী সন্ধ্যা ৭টার মধ্যে দোকানপাট ও শপিং মল বন্ধ রাখতে হচ্ছে। ডিজেল ও অকটেন সংকটে যানবাহন চলাচল অর্ধেকে নেমে এসেছে, ফিলিং স্টেশনগুলোতে দেখা দিচ্ছে দীর্ঘ লাইন। ইউএনও জানান, লোডশেডিং ও জ্বালানি সঙ্কটে সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের মধ্যে নেতিবাচক প্রভাব পড়তে শুরু করেছে।
কুয়াকাটা (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা জানান, উপকূলীয় অঞ্চলে ৩৩ থেকে ৩৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা ও বাতাসের উচ্চ আর্দ্রতায় জনজীবন নাভিশ্বাস হয়ে উঠেছে। এর সাথে যোগ হয়েছে দিনরাতে গড়ে ১০ থেকে ১২ বার লোডশেডিং। পটুয়াখালী জেলার প্রায় ২৫ হাজার এসএসসি পরীক্ষার্থী পড়াশোনায় মারাত্মক বিঘেœর মুখে পড়েছে। দিনের বেলায় প্রচণ্ড গরমে কাজ শেষে রাতেও স্বস্তিতে ঘুমাতে পারছেন না নি¤œ আয়ের শ্রমজীবী মানুষ। বিশেষ করে শিশু ও বৃদ্ধরা অসুস্থ হয়ে পড়ছে। বিদ্যুৎ বিভাগ জানিয়েছে, চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় এই সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে।