ত্রয়োদশ জাতীয় নির্বাচন : আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে শঙ্কা

Printed Edition

আবদুল কাইয়ুম

  • আন্দোলন না করতে ডিএমপির অনুরোধ মানছে না কেউ : প্রতিদিনই সড়ক অবরোধ

  • বেশ কিছু ব্যত্যয় আগামী নির্বাচনে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে

তৌহিদুল হক

আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল এরইমধ্যে ঘোষণা করেছে নির্বাচন কমিশন। প্রার্থীদের মনোনয়নপত্রের বৈধতা যাচাই-বাছাইও চলছে। তবে নির্বাচন সামনে এলেও এখনো পর্যন্ত দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হয়নি। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশে বিভিন্ন দাবি আদায়ে বিক্ষোভ মিছিল, সমাবেশ ও সড়ক অবরোধ অব্যাহত রয়েছে। এ অবস্থায় আসন্ন নির্বাচন কতটা সুষ্ঠু ও গ্রহণযোগ্য হবে, তা নিয়ে জনমনে যেমন শঙ্কা বাড়ছে, তেমনি উদ্বেগ প্রকাশ করছেন নিরাপত্তা ও অপরাধ বিশ্লেষকরাও।

পুলিশ জানিয়েছে, সড়ক অবরোধ করে কোনো ধরনের আন্দোলন বা বিক্ষোভ মিছিল করা যাবে না। এ বিষয়ে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) পক্ষ থেকে একাধিকবার অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সাথে জানানো হয়েছে, যারা আইন অমান্য করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেয়া হবে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এবারের নির্বাচনকে ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ ও প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে। জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের আকাক্সক্ষা বাস্তবায়নের জন্য একটি অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন অত্যন্ত জরুরি। তবে বাস্তব পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। যদি নির্বাচনকালীন সময়ে আইনশৃঙ্খলা ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন মারাত্মকভাবে প্রভাবিত হতে পারে। এমনকি নির্বাচন প্রশ্নবিদ্ধ হলে পরবর্তী সরকার ও চলমান সংস্কার উদ্যোগও ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।

আইন ও সালিশ কেন্দ্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে দেশে তিন হাজার ৫০৯টি হত্যা মামলা হয়েছে। একই সময়ে রাজনৈতিক সহিংসতায় নিহত হয়েছেন ৯৮ জন। এসব পরিসংখ্যান সাধারণ মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ আরো বাড়িয়েছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর একটি বড় অংশ রাজনৈতিক কর্মসূচি, সমাবেশ ও ভোটকেন্দ্রের নিরাপত্তায় নিয়োজিত থাকে। ফলে নিয়মিত অপরাধ দমনে নজর কিছুটা শিথিল হয়, যার সুযোগ নেয় অপরাধী চক্র। এর সাথে নির্বাচন ঘিরে সংঘর্ষ, সহিংসতা ও ভাঙচুর পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তোলে।

ডিএমপি সূত্র জানায়, গত বছরের ৫ অক্টোবর থেকে তিন দিনব্যাপী নির্বাচনী দায়িত্ব সুষ্ঠুভাবে সম্পাদনের লক্ষ্যে পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বৃদ্ধির জন্য প্রশিক্ষণ কার্যক্রম শুরু করা হয়। এ পর্যন্ত ২২টি ব্যাচে ১৮ হাজার ১৫০ জন পুলিশ সদস্য সফলভাবে এই প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছেন। ডিএমপির ১৯টি ভেনুতে মোট ২৮টি ব্যাচে সম্ভাব্য ২৪ হাজার ৩৪২ জন পুলিশ সদস্যকে প্রশিক্ষণ দেয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।

নিরাপত্তা বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচন-পরবর্তী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নতি নির্ভর করবে মূলত চারটি বিষয়ের ওপর- নির্বাচনের গ্রহণযোগ্যতা, রাজনৈতিক সহনশীলতা, আইন প্রয়োগে নিরপেক্ষতা এবং বিচারহীনতা রোধে দৃশ্যমান অগ্রগতি। তাদের মতে, ১২ ফেব্রুয়ারির জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পর ২০২৫ সালের সহিংস অভিজ্ঞতা থেকে বেরিয়ে আসতে হলে শুধু রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা নয়; প্রয়োজন কঠোর আইন প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি এবং আইনের শাসনের প্রতি মানুষের আস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠা।

ডিএমপির উপকমিশনার তালেবুর রহমান বলেন, ‘কেউ যেন কোনো ধরনের আন্দোলন, বিক্ষোভ বা সড়ক অবরোধ না করে, এ জন্য ডিএমপির পক্ষ থেকে অনুরোধ জানানো হয়েছে। নির্বাচনকে সামনে রেখে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আমাদের পুলিশি কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি পুলিশের দক্ষতা ও সক্ষমতা বাড়াতে বিভিন্ন প্রশিক্ষণও দেয়া হচ্ছে। কেউ যাতে সড়ক অবরোধ করে পরিস্থিতি অস্থিতিশীল করতে না পারে, সে জন্য আমরা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।’

বাংলাদেশ পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বাহারুল আলম বলেন, ‘আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে যেকোনো মূল্যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্থিতিশীল রাখা হবে। নির্বাচনসংক্রান্ত কোনো ধরনের বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হলে তাৎক্ষণিকভাবে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। পুলিশের টহল কার্যক্রমের পাশাপাশি চেকপোস্টের মাধ্যমে তল্লাশি জোরদার করা হবে। পুলিশের আইনি কাজে কেউ বাধা সৃষ্টি করলে তাকে গ্রেফতার করে আদালতে সোপর্দ করা হবে।’

আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আগামী ৪০ দিন নিয়ন্ত্রণে রাখা গেলে নির্বাচন সুষ্ঠু হবে, এমন আশাবাদ ব্যক্ত করে ডিএমপি কমিশনার মো: সাজ্জাত আলী বলেন, ‘বর্তমানে ঢাকা শহরের অপরাধ পরিস্থিতি অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে আছে। আমরা যদি আগামী ৪০ দিন আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারি, তাহলে নির্বাচন সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হবে। ২০২৪ সাল ছিল জুলাই আন্দোলনের বছর, আর ২০২৫ সাল সেই ধারাবাহিকতায় বেশ অশান্ত কেটেছে। শত শত ক্রাউড কন্ট্রোল অপারেশন পরিচালনা করতে হয়েছে।’

তিনি আরো বলেন, ‘বিভিন্ন গোষ্ঠীর স্বার্থন্বেষী দাবি-দাওয়া নিয়ে রাস্তায় নেমে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সড়ক অবরোধ করে রাখা অত্যন্ত দুঃখজনক। এতে অসুস্থ মানুষ, গর্ভবতী নারীসহ সাধারণ জনগণ চরম ভোগান্তির শিকার হয়। বহুবার অনুরোধ করার পরও কেউ তা মানছে না। দাবি-দাওয়া আদায়ের নামে মানুষকে কষ্ট দেয়ার এই সংস্কৃতি থেকে আমাদের বেরিয়ে আসা জরুরি।’

র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র‌্যাব) মহাপরিচালক অতিরিক্ত আইজিপি এ কে এম শহিদুর রহমান বলেন, ‘আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি আরো উন্নত করতে র‌্যাব কাজ করছে। একটি সুন্দর ও সুষ্ঠু নির্বাচন আয়োজনের জন্য যে ধরনের নিরাপত্তাব্যবস্থা প্রয়োজন, তা নিশ্চিত করতে আমরা সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। আমাদের জনবল ও লজিস্টিক সক্ষমতার সর্বোত্তম ব্যবহার করে দায়িত্ব পালন করব।’

তিনি আরো জানান, ‘গত তিন মাসে আমরা হত্যা মামলার ৫২২ জন আসামি, ডাকাতি মামলার ১৫১ জন, ছিনতাই বিরোধী অভিযানে ৭০ জন, মানবপাচারকারী ৪১ জন এবং মাদক মামলায় এক হাজার ২১০ জনকে গ্রেফতার করেছি। এতে প্রমাণ হয়, আমাদের সক্ষমতা যথেষ্ট।’

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজকল্যাণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহযোগী অধ্যাপক ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক বলেন, ‘বর্তমানে বেশ কিছু ব্যত্যয় দেখা যাচ্ছে, যা আগামী নির্বাচনে ভয়াবহ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর সড়ক অবরোধ করে আন্দোলনের সুযোগ দেয়া কখনোই উচিত নয়। এই ধরনের কর্মকাণ্ড সরকারের ঘাটতির দিকটি স্পষ্ট করে। নির্বাচন কমিশনের উচিত এসব কার্যক্রম নিরুৎসাহিত করা এবং নিয়ম ভঙ্গ করলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া।’

তিনি বলেন, ‘বিভিন্ন এলাকায় রাজনৈতিক উত্তাপ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সব জায়গায় সঠিকভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে পারছে না। কোথাও নিয়ন্ত্রণ সম্ভব হলেও, অপরাধপ্রবণ এলাকায় ব্যর্থতা দেখা যাচ্ছে। রাজনৈতিক দলের নেতাকর্মীদের মধ্যে সঙ্ঘাতও ঘটছে। নির্বাচন সামনে রেখে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যে মাত্রায় কাজ করার কথা, তা এখনো দৃশ্যমান নয়। পরিস্থিতি ভয়াবহ হয়ে উঠলে নির্বাচন বাধাগ্রস্ত হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী যদি পিছু হটে, অপরাধীরা সক্রিয় হয়ে উঠবে। ব্যক্তিকে নয়, আইনকে প্রাধান্য দিলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সম্ভব।’

জনগণের অভিযোগ, এই মুহূর্তে সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন করার সুযোগ দেয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী নানা পদক্ষেপের কথা বললেও বাস্তবে প্রতিদিনই রাজধানীর কোথাও না কোথাও সড়ক অবরোধ করে আন্দোলন হচ্ছে। শাহবাগে শহীদ শরিফ ওসমান হাদির হত্যার বিচারের দাবিতে কয়েক দিন ধরে সড়ক অবরোধ চলছে। এ ছাড়া রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় নিয়মিত আন্দোলনের কারণে জনভোগান্তি বাড়ছে।

কাওরানবাজারে মোবাইল ব্যবসায়ীদের ব্লকেড

ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেনটিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) কার্যক্রম চালুর প্রতিবাদ ও অবৈধ সিন্ডিকেট ভেঙে দেয়ার দাবিতে রাজধানীর কাওরানবাজারে মোবাইল ব্যবসায়ীদের ব্লকেড কর্মসূচি ছত্রভঙ্গ করে দেয় পুলিশ। গতকাল কাওরানবাজার মোড়ে পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়ার ঘটনা ঘটে। একপর্যায়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ জলকামান, সাউন্ড গ্রেনেড ও লাঠি ব্যবহার করে। এতে কয়েকজন আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়।

ফার্মগেটে তেজগাঁও কলেজ শিক্ষার্থীদের সড়ক অবরোধ

তেজগাঁও কলেজ ছাত্রাবাসে দুই পক্ষের সংঘর্ষে এইচএসসি দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সাকিবুল হাসান রানা হত্যার ঘটনায় জড়িতদের গ্রেফতারের দাবিতে রাজধানীর ফার্মগেটে সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেন শিক্ষার্থীরা। রোববার দুপুরে শুরু হওয়া এই অবরোধের ফলে ফার্মগেট, মানিক মিয়া এভিনিউ ও কাওরানবাজারসহ আশপাশের এলাকায় তীব্র যানজট সৃষ্টি হয়। সপ্তাহের প্রথম কর্মদিবসে এতে চরম ভোগান্তিতে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ যাত্রীরা। শিক্ষার্থীরা ২৪ ঘণ্টার আলটিমেটাম দিয়ে দ্রুত বিচারের দাবি জানান।