মুনাফা তুলে নেয়ার প্রক্রিয়ায় সূচক হারাল পুঁজিবাজার

একসাথে ৯ কোম্পানি জেড ক্যাটাগরিতে

Printed Edition

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

দুই দিন সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পর সংশোধন ঘটেছে পুঁজিবাজারে। গতকাল দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) সূচকের সামান্য অবনতি ঘটে। বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগের দুই দিনে সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটায় মূল্যস্তরে যে পরিবর্তন এসেছে বিনিয়োগকারীরা তা থেকে মুনাফা তুলে নিতে গেলে সূচকের এ অবনতি ঘটে। আগের দিন ব্যাংকিং খাতে যে মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে গতকাল খাতটিতে বড় ধরনের সংশোধন ঘটে। একই দিন ব্যাংকের বাইরে অন্য কয়েকটি খাতেও মুনাফা তুলে নেয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছিল। তারা মনে করেন, এটাই বাজারের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সংশোধন শেষে আবার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরবে বাজারটি।

ডিএসইর প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ১০ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট অবনতির শিকার হয়। ৪ হাজার ৯৬৫ দশমিক ২৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি দিনশেষে নেমে আসে ৪ হাজার ৯৫৪ দশমিক ৮৬ পয়েন্টে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহ হারায় যথাক্রমে ১ দশমিক ০৮ ও দশমিক ০৯ পয়েন্ট। তবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জের (সিএসই) চিত্র ছিল কিছুটা ভিন্ন। এখানে সবগুলো সূচকের কমবেশি উন্নতি ঘটতে দেখা যায়। সিএসইর প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ২০ দশমিক ৭১ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি রেকর্ড করা হয় যথাক্রমে ৪৬ দশমিক ৪৯ ও ২০ দশমিক ৪৬ পয়েন্ট।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করেন, গতকালের বাজার আচরণ অনেকটা প্রত্যাশিত ছিল। কারণ এর আগে দুই দিন ডিএসইর সবগুলো সূচকের বড় ধরনের উন্নতি ঘটে। এ সময় প্রধান সূচকটি ১০০ পয়েন্টের বেশি বৃদ্ধি পায়। সুতরাং ১০০ পয়েন্ট উন্নতির বিপরীতে ১০ পয়েন্ট অবনতি ঘটতেই পারে। কারণ বাজার এখনো পুরোপুরি আস্থায় ফেরেনি। এ সময় মূল্যস্তরের উন্নতি ঘটলেই তা থেকে মুনাফা তুলে নেয়াটা স্বাভাবিক। আর এ মুনাফা তুলে নেয়া হয় বিশেষভাবে ব্যাংকিং খাত থেকে। এ খাতের বেশির ভাগ কোম্পানির দরপতনই তা প্রমাণ করে।

দিনের বাজার পর্যবেক্ষণে দেখা যায়, গতকাল লেনদেন শুরুর পর থেকে বাজার সূচক একরকম অস্থির আচরণ করতে দেখা যায়। লেনদেনের শুরুতেই বিক্রয়চাপের মুখে পড়ে ঢাকা শেয়ারবাজার। পরবর্তীতে চাপ সামলে সূচক ঊর্ধ্বমুখী হলেও তা একঘণ্টাও টেকেনি। পরবর্তী আধঘণ্টা পতন ঘটিয়ে ফের ঊর্ধ্বমুখী হতে দেখা যায় সূচককে। এভাবে দিনভর চলছিল সূচকের অস্থির ওঠানামা। প্রতিবারই ক্রয়চাপের বিপরীতে সৃষ্টি হচ্ছিল বিক্রয়চাপ। সচরাচর মুনাফা তুলে নিতে গিয়েই এটা ঘটে।

এ দিকে করপোরেট সুশাসন ও বিধিবিধান পালনে ব্যর্থতার দায়ে ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের ৯টি কোম্পানিকে ‘জেড’ ক্যাটাগরিতে নামিয়ে দেয়া হয়েছে। রোববার ডিএসই ওয়েবসাইটে এ তথ্য প্রকাশ করে পুঁজিবাজারটি। এতে এসব কোম্পানির শেয়ারের দরে বড় ধরনের ধস নেমেছে। ডিএসই থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায় নির্ধারিত সময়ের মধ্যে বার্ষিক সাধারণ সভা (এজিএম) করতে ব্যর্থ হওয়ায় কোম্পানিগুলোকে এই শাস্তিমূলক ব্যবস্থার মুখে পড়তে হয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানিগুলোর অবস্থা খারাপ থাকলেও তারা নানা কৌশলে এ শাস্তি থেকে বেঁচে যেত। কিন্তু এবার তা পারেনি। ডিএসইর এই সিদ্ধান্তের পর গত দুই দিন এসব কোম্পানির শেয়ার বড় ধরনের দরপতনের শিকার হয়। দুই দিনই ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ তালিকায় জায়গা করে নেয় এসব কোম্পানি। কারণ আরো বড় পতনের ভয়ে বিনিয়োগকারীরা তাদের হাতে থাকা এসব কোম্পানির শেয়ার ছেড়ে দিচ্ছেন। গতকাল ডিএসই সূচকের অবনতির এটাও একটা কারণ ছিল। এসব কোম্পানির মধ্যে ছিল জেমিনি সী ফুডস, আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ, বেস্ট হোল্ডিংস, বিচ হ্যাচারিজ, ফু ওয়াং ফুড, কাট্টলি টেক্সটাইলস, ওইম্যাক্স ইলেক্ট্রোড, এস আলম কোল্ডরোল স্টিলস এবং ফার্স্ট সিকিউরিটিজ ইসলামী ব্যাংক। তবে এদের মধ্যে ফার্স্ট সিকিউরিটি ব্যাংক ইতোমধ্যে আর চারটি ব্যাংকের সাথে একীভূত হয়ে ভিন্ন নামে পরিচালিত হচ্ছে। সবগুলো কোম্পানিই গত দুই দিনে প্রায় ২০ শতাংশ দরপতনের শিকার হয়।

সাম্প্রতিক দিনগুলোতে বেশ কিছু মৌলভিত্তিহীন কোম্পানি কোনো না কোনো কৌশল অবলম্বন করে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরিতে জায়গা করে নেয়। আর বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ এসব শেয়ার নিয়ে এক প্রকার জুয়া খেলায় মেতে ওঠে, যা দিনের পর দিন বাজারের শৃঙ্খলাকে নষ্ট করে দিচ্ছিল। তাই ডিএসইর এ সিদ্ধান্ত এ ধরনের কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীদের জন্য একটি বার্তা হিসেবে কাজ করবে বলে মনে করেন পুঁজিবাজার বিশ্লেষকরা।

গতকাল টানা দ্বিতীয় দিনের ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ওষুধ ও রসায়ন খাতের ওরিয়ন ইনফিউশন। ২২ কোটি ৭৯ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ৫ লাখ ৯৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ১৭ কোটি ২৭ লাখ টাকায় ৭২ লাখ ২ হাজার শেয়ার বেচাকেনা করে ব্যাংকিং খাতের উত্তরা ব্যাংক উঠে আসে দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে মালেক স্পিনিং, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, সিটি ব্যাংক, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, সায়হাম টেক্সটাইলস, সায়হাম কটন মিলস, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স ও রহিমা ফুড করপোরেশন।

ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল জীবনা বীমা কোম্পানি প্রগতি লাইফ ইন্স্যুরেন্স। গতকাল ৮ দশমিক ৪০ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে কোম্পানিটির। ৬ দশমিক ৭৭ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পাওয়া বস্ত্র খাতের সায়হাম টেক্সটাইল উঠে আসে এ তালিকার দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ ১০ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বাংলাদেশ ন্যাশনাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি, নর্দার্ন ইন্স্যুরেন্স, ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স, ইসলামী ব্যাংক, সেন্ট্রাল ইন্স্যুরেন্স, সদ্ধানী লাইফ ইন্স্যুরেন্স, সমতা লেদার ও আর ডি ফুড।

দিনের দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বস্ত্র খাতের আলিফ ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড। ১০ শতাংশ দর হারায় কোম্পানিটি। ৯ দশমিক ৮৮ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় কোম্পানি ছিল বিচ হ্যাচারিজ। অন্যান্য কোম্পানির মধ্যে এস আলম কোল্ড রোল স্টিলস ৯ দশমিক ৬২ শতাংশ, কাট্টলি টেক্সটাইলস ৯ দশমিক ৫২ শতাংশ, বিডি ওয়েল্ডিং ইলেক্ট্রোড ৯ দশমিক ২৮ শতাংশ, রিজেন্ট টেক্সটাইলস ৯ দশমিক ০৯ শতাংশ, ফু ওয়াং ফুড ৭ দশমিক ৯২ শতাংশ বিআইএফসি ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ, জিএসপি ফিন্যান্স ৫ দশমিক ৮৮ শতাংশ ও ওরিয়ন ইনফিউশন ৫ দশমিক ৭১ শতাংশ দর হারায়।