টার্গেট বিপুল জনগোষ্ঠীর কর্মসংস্থান

দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হচ্ছে বাংলাদেশ

ড. ইউনূসের ডাকে সাড়া দিচ্ছেন বিদেশী বড় বিনিয়োগকারীরা

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও মানবসম্পদ দেশটিকে চীনসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে।

কাওসার আজম
Printed Edition
Manufacturing-Gub

কাওসার আজম চীন থেকে ফিরে

বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং (উৎপাদন) হাব। বড় বড় শিল্প কলকারখানা স্থাপন হবে এ দেশে। এখান থেকে উৎপাদিত পণ্য নেপাল, ভুটান, মিয়ানমার, ভারত-পাকিস্তানসহ বিভিন্ন দেশে রফতানি হবে। আয় হবে বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা। কর্মসংস্থান হবে লাখ লাখ বেকার যুবগোষ্ঠীর।

গত ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার বিপ্লবের মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নেয়ার পর নোবেলজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস সেই প্রচেষ্টাই চালিয়ে যাচ্ছেন। সরকার প্রধানের দায়িত্বে আসার পর যেন এটি (বাংলাদেশ হবে দক্ষিণ পূর্ব এশিয়ার ম্যানুফ্যাকচারিং হাব) তার বড় আকাক্সক্ষা বা স্বপ্ন হয়ে ওঠে। এই স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার বিদেশী বড় বিনিয়োগ। গত কয়েক মাসে বিদেশী অসংখ্য বিনিয়োগকারীর সাথে বৈঠক করেছেন। আশ্বাসও পেয়েছেন বড় বিনিয়োগের। সর্বশেষ গত ২৬-২৯ মার্চ চীন সফরে গিয়ে দেশটির বড় বড় ব্যবসায়ীদের বড় বিনিয়োগের সাড়া পেয়েছেন স্বপ্নবাজ ড. ইউনূস।

গত ২৭ মার্চ বোয়াও ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে যোগ দেন প্রধান উপদেষ্টা। সাইডলাইনে চীনা এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান চেন হুয়াইইউর সাথে বৈঠক করেন। এক্সিম ব্যাংকের চেয়ারম্যান বাংলাদেশে চীনা উৎপাদন কারখানা স্থানান্তরের সহায়তার ঘোষণা দিয়েছেন। একই সাথে দেশটির শীর্ষ ১০০ বিনিয়োগকারীর সাথেও বৈঠক করেছেন ড. ইউনূস।

চীনা এক্সিম ব্যাংক দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশে বেইজিং-অর্থায়িত অবকাঠামো ও জ্বালানি প্রকল্পগুলোর প্রধান অর্থায়নকারী। তবে এবারই প্রথম তারা দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশে চীনা বেসরকারি উৎপাদন বিনিয়োগকে সহায়তার আগ্রহ প্রকাশ করেছে।

প্রধান উপদেষ্টা বলেন, বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান ও মানবসম্পদ দেশটিকে চীনসহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় কোম্পানিগুলোর জন্য উৎপাদন কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। তার সরকার শীর্ষস্থানীয় চীনা বেসরকারি নির্মাতাদের বাংলাদেশে কারখানা স্থানান্তরের আমন্ত্রণ জানিয়েছে এবং তাদের জন্য আকর্ষণীয় সুবিধা ও একটি বাণিজ্য করিডোর দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে।

তিনি বলেন, উৎপাদন খাতে বাংলাদেশ চীনের পরিপূরক ভূমিকা পালন করতে পারে। অন্তর্বর্তী সরকার দ্রুত চট্টগ্রাম অঞ্চলে একটি চীনা বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল নির্মাণের কাজ এগিয়ে নিচ্ছে।

তিনি আরো জানান, বাংলাদেশ নতুন বড় বন্দর নির্মাণ করছে, যা শুধুমাত্র দেশের অর্থনীতিকে নয়, বরং নেপাল ও ভুটানের মতো স্থলবেষ্টিত দেশগুলোর পাশাপাশি ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সাতটি রাজ্যের অর্থনীতিকেও সহায়তা করবে।

চেন হুয়াইইউ বলেন, বাংলাদেশ এমনভাবে অবস্থিত, যা দক্ষিণ-পূর্ব ও দূরপ্রাচ্যের পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য ও পশ্চিম এশিয়ার বাজারেও কার্যকরভাবে সেবা দিতে পারে। আরো বেশি চীনা কোম্পানি বিশ্বব্যাপী সম্প্রসারণ করছে এবং তার ব্যাংক বাংলাদেশের বিনিয়োগ ও উৎপাদন খাতে তাদের সহায়তা করবে।

চীনাদের বিনিয়োগ পরিবেশ সৃষ্টির জন্য আলাদা বিশেষ ইকোনোমিক জোন সৃষ্টি করতে নির্দেশ দিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টা। এজন্য বিডাকে নির্দিষ্ট সময় বেঁধে দেয়া হয়েছে। আশা করা হচ্ছে এক বছরের মধ্যেই ইকোনমিক জোন সৃষ্টির কাজ শুরু হবে।

এ বিষয়ে প্রধান উপদেষ্টার প্রেস সেক্রেটারি শফিকুল আলম বলেন, চীন হলো বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ অর্থনীতির দেশ। ম্যানুফ্যাকচারিং ক্ষেত্রে চীনের ধারেকাছে কেউ নেই। চীনের ম্যানুফ্যাকচারিং যুক্তরাষ্ট্রের তিনগুণ বড়। প্রফেসর ইউনূসের বড় ইচ্ছা বাংলাদেশকে একটি বড় ম্যানুফ্যাকচারিং হাব হিসেবে গড়ে তোলা। এটা করতে না পারলে আমরা বড় ধরনের কর্মসংস্থান তৈরি করতে পারব না। তিনি মনে করেন বাংলাদেশে অনেক কর্মসংস্থান তৈরি করা উচিত। বাংলাদেশের প্রতি বছর ২০ লাখ ছেলেমেয়ে জব মার্কেটে আসছে। এজন্য আমাদের কর্মসংস্থান তৈরি করতে হবে। আর এর প্রধান চালিকাশক্তি হতে পারে ম্যানুফ্যাকচারিং খাত। এজন্য বিদেশী বিনিয়োগকারীদের বাংলাদেশে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করতে হবে ।

জানা যায়, চীনের লংজি গ্রিন এনার্জি টেকনোলজি কোম্পানি, টংওয়েই কোম্পানি ও ইউনান শোর মতো শীর্ষস্থানীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি কোম্পানি ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সফর করেছে। তারা বাংলাদেশের নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) নির্বাহী চেয়ারম্যানের সাথে বৈঠক চীনের ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল এ দেশে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে বিনিয়োগের সুযোগ অনুসন্ধান করছে। এ লক্ষ্যে সম্প্রতি তারা বিডা ও বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠক করেছে।

বিডার নির্বাহী চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশ সরকার একটি বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ ক্ষেত্রে কর অবকাশ, শুল্কমুক্ত পণ্য আমদানি ও দক্ষ শ্রমশক্তি নিশ্চিত করার মতো বিভিন্ন সুবিধা দেয়া হচ্ছে। দেশের শিল্প কারখানাগুলোতে সৌরশক্তির ব্যবহার বাড়ানোর জন্য সরকার বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে যার মধ্যে ছাদে সৌরশক্তি ব্যবস্থা স্থাপন অন্যতম।

লংজি গ্রিন এনার্জি টেকনোলজি কোম্পানি শুধু চীন নয়, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সোলার প্যানেল ম্যানুফ্যাকচারিং কোম্পানি। তারা ইতোমধ্যে বাংলাদেশের সোলার প্যানেল তৈরির প্রস্তাব দিয়েছে।

প্রধান উপদেষ্টার এবারে চীন সফরকে ঐতিহাসিক হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। প্রতিবেশী দেশ ভারতের সাথে যখন পতিত আওয়ামী সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ইস্যুতে সম্পর্কে টানাপড়েন চলছে বাংলাদেশ নিয়ে যখন নেতিবাচক প্রচারণার কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে ভারত, সেই মুহূর্তে আরেক প্রতিবেশী দেশ চীনের সাথে সম্পর্কোন্নয়নে ড. ইউনূসের এই সফর ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তার এই সফরে চীনের প্রেসিডেন্ট শিজিনপিংয়ের সাথে বৈঠক হয়। দুই শীর্ষনেতা দ্বিপক্ষীয় সহযোগিতা বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছেছেন এবং বাংলাদেশ চীনের ‘এক চীন নীতি’তে তার অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করেছে। ড. ইউনূসকে পিকিং বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সম্মানসূচক পিএইচডি ডিগ্রিও দেয়া হয়। তিস্তা প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং ২০২৮ সাল পর্যন্ত কোটা ও শুল্ক সুবিধারও প্রতিশ্রুতি পায় বাংলাদেশ। ৯টি চুক্তি ও সমঝোতায় সই হয়েছে। এর মধ্যে বিনিয়োগ, ঋণ ও অনুদান হিসেবে বাংলাদেশকে ২.১ বিলিয়ন ডলার দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে বৃহৎ অর্থনীতির দেশ চীন। এর মধ্যে প্রায় ৩০টি চীনা কোম্পানি বাংলাদেশের চীনা শিল্প অর্থনৈতিক অঞ্চলে ১ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের অঙ্গীকার করেছে। মংলা বন্দর আধুনিকীকরণে ৪০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ, অর্থনৈতিক অঞ্চলের উন্নয়নে ৩৫০ মিলিয়ন ডলার এবং প্রযুক্তিগত সহায়তায় ১৫০ মিলিয়ন ডলার বরাদ্দের পরিকল্পনা রয়েছে। বাকি অর্থ অনুদান ও অন্যান্য ঋণসহায়তা হিসেবে আসবে। চীন বাংলাদেশের জন্য বিদ্যমান শুল্ক ও কোটামুক্ত রপ্তানি সুবিধা আরো দুই বছর, অর্থাৎ ২০২৬ সাল থেকে বাড়িয়ে ২০২৮ সাল পর্যন্ত বহাল রাখার ঘোষণা দিয়েছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাংলাদেশ ভৌগোলিকভাবে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি দেশ। ড. মুহাম্মদ ইউনূস তার বৈশ্বিক পরিচয় কাজে লাগিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারীদের এ দেশে উৎপাদন কারখানা স্থাপনে বড় বিনিয়োগ টানায় মনোযোগ দিয়েছেন। সেক্ষেত্রে চীনের ব্যবসায়ীদের প্রতি বেশি ঝুঁকলেও ইউরোপ-আমেরিকাসহ অন্যান্য দেশের বড় বিনিয়োগকারীদেরও দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন ড. ইউনূস।

বিষয়সমূহ