চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর

সাড়ে ৩ মিনিটে বিল পাস : সরকারি চাকুরেদের শৃঙ্খলাভঙ্গ রোধে কঠোর শাস্তি

Printed Edition
first-1
চাকরির বয়সসীমা ৩২ বছর

সংসদ প্রতিবেদক

সরকারি চাকরিতে প্রবেশের সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ এবং সরকারি কর্মচারীদের শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে শাস্তির পরিধি বাড়িয়ে দু’টি গুরুত্বপূর্ণ আইন জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে। রোববার জাতীয় সংসদের অধিবেশনে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো: আব্দুল বারী উত্থাপিত সংশ্লিষ্ট বিলগুলো কণ্ঠভোটে পাস হয়।

এর মধ্যে ‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) বিল, ২০২৬’ এবং ‘সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত, সংবিধিবদ্ধ সরকারি কর্তৃপক্ষ, পাবলিক নন-ফিন্যান্সিয়াল করপোরেশন ও স্বশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের সর্বোচ্চ বয়সসীমা আইন, ২০২৬’- এই দু’টি বিল বিশেষ গুরুত্ব বহন করছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম বিল হিসেবে এগুলো পাস হতে সময় লেগেছে মাত্র তিন মিনিট ৩৫ সেকেন্ড। বিলের ওপর কোনো বিস্তারিত আলোচনা হয়নি এবং বিরোধী দল ভোটদানে বিরত ছিল।

শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর আইন

‘সরকারি চাকরি (সংশোধন) আইন, ২০২৬’-এর মাধ্যমে সরকারি কর্মচারীদের চার ধরনের কর্মকাণ্ডকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এগুলো হলো- অনানুগত্য প্রদর্শন বা কর্মপরিবেশে শৃঙ্খলা বিঘিœত করা; যৌক্তিক কারণ ছাড়া একক বা সমবেতভাবে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকা; অন্য কর্মচারীদের কাজে বিরত থাকতে উসকানি দেয়া এবং কোনো কর্মচারীকে দায়িত্ব পালনে বাধা প্রদান করা।

আইনে বলা হয়েছে, এসব কর্মকাণ্ড ‘শৃঙ্খলাভঙ্গজনিত অসদাচরণ’ হিসেবে গণ্য হবে। দোষী প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট কর্মচারীর বিরুদ্ধে বরখাস্ত, চাকরিচ্যুতি, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি কিংবা বেতন গ্রেড হ্রাসের মতো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া যাবে।

এ ছাড়া নতুন সংযোজিত ধারা ৩৭ (ক)-তে জনসেবার কার্যক্রম ব্যাহতকারী যেকোনো কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্ত ও ব্যবস্থা গ্রহণের বিধান রাখা হয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বৈধ নির্দেশ অমান্য করা বা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নে বাধা দেয়াও শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৫ সালের মে ও জুলাই মাসে জারি করা সংশোধিত অধ্যাদেশের ভিত্তিতেই এই আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। সংসদীয় বিশেষ কমিটি ১৩৩টি অধ্যাদেশের মধ্যে ৯৮টি অপরিবর্তিতভাবে পাসের সুপারিশ করেছিল, যার অংশ হিসেবেই এই আইনটি সংসদে উত্থাপিত ও পাস হয়। রাষ্ট্রপতির অনুমোদন পেলেই এটি পূর্ণাঙ্গ আইনে পরিণত হবে।

উল্লেখ্য, অধ্যাদেশ জারির পরদিন সচিবালয়সহ বিভিন্ন দফতরে সরকারি কর্মচারীরা এর প্রতিবাদে বিক্ষোভ করেছিলেন।

চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা ৩২ বছর

অন্য দিকে নতুন আইনের মাধ্যমে সরকারি ও স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করা হয়েছে। এর আগে বিভিন্ন নিয়োগ বিধিতে বয়সসীমা ৩৩, ৩৫, ৪০ এমনকি ৪৫ বছর পর্যন্ত নির্ধারিত থাকায় নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছিল।

বিলের ব্যাখ্যায় বলা হয়, ২০২৪ সালের অধ্যাদেশে প্রথমবার বয়সসীমা বাড়িয়ে ৩২ বছর করা হলেও বাস্তব প্রয়োগে জটিলতা দেখা দেয়। সেই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালে সংশোধনী এনে বিষয়টি পুনর্বিন্যাস করা হয় এবং এখন তা আইনে পরিণত করা হলো।

আইনটির উদ্দেশ্য ও কারণসংবলিত বিবৃতিতে বলা হয়েছে, বয়সসীমা ৩২ বছর নির্ধারণ করলে চাকরিপ্রার্থীদের সুযোগ বাড়বে এবং শিক্ষিত বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানে যুক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হবে। এর ফলে বেকারত্ব হ্রাস এবং অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশন (বিপিএসসি) ইতোমধ্যে বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিস (বিসিএস)-এ সরাসরি নিয়োগের ক্ষেত্রে ৩২ বছর বয়সসীমা অনুসরণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করছে। ফলে বিদ্যমান বাস্তবতার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আইনগত কাঠামো প্রণয়ন করা হয়েছে।

এক দিকে সরকারি কর্মচারীদের জবাবদিহিতা ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করতে কঠোর শাস্তির বিধান, অন্য দিকে চাকরিতে প্রবেশের বয়সসীমা বাড়িয়ে সুযোগ সম্প্রসারণ- এই দুই সিদ্ধান্ত রাষ্ট্রীয় প্রশাসন ব্যবস্থায় একধরনের ভারসাম্য আনার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে। তবে বিলগুলো অত্যন্ত স্বল্প সময়ে ও আলোচনা ছাড়াই পাস হওয়ায় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অঙ্গনে এ নিয়ে বিতর্কের অবকাশ থেকেই যাচ্ছে।