শ্রমিক সমাবেশে ডা: শফিক

শ্রমিক-মালিকের সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের শত্রুর নয়

নিজস্ব প্রতিবেদক
Printed Edition
1st-4
রাজধানীতে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ডা: শফিকুর রহমান : নয়া দিগন্ত

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা: শফিকুর রহমান বলেছেন, শ্রমিক মালিকের সম্পর্ক হবে ভ্রাতৃত্বের; শত্রুর নয়। এটাই ইসলামের নির্দেশনা। শ্রমিক তার ন্যায্য অধিকার না পেলে শিল্প এগিয়ে যাবে না। বরং শ্রমিকরা কাজ না করলে শিল্প পিছিয়ে পড়বে। শ্রমিকরা বাঁচলে শিল্প বাঁচবে আর শিল্প বাঁচলে শ্রমিকরা বাঁচবে এই কথা মালিক ও শ্রমিক উভয় পকে অনুধাবন করতে হবে।

১ মে রাজধানীর পল্টন মোড়ে আন্তর্জাতিক শ্রমিক দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন আয়োজিত বিশাল শ্রমিক সমাবেশে প্রধান অতিথির বক্তৃতায় তিনি এ কথা বলেন। ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক এমপি আ. ন. ম শামসুল ইসলামের সভাপতিত্বে ও সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমানের সঞ্চালনায় এতে বিশেষ অতিথি ছিলেন জামায়াতে ইসলামীর নায়েবে আমির ও ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি সাবেক এমপি অধ্যাপক মুজিবুর রহমান, জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও ফেডারেশনের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ও সাবেক এমপি অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার, জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান ও সাবেক এমপি ড. এ এইচ এম হামিদুর রহমান আজাদ, ঢাকা মহানগরী দক্ষিণ জামায়াতের আমির নুরুল ইসলাম বুলবুল, ফেডারেশনের সিনিয়র কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি অধ্যাপক হারুনুর রশিদ খান, জামায়াতে ইসলামীর ঢাকা মহানগরী উত্তরের নায়েবে আমির ইঞ্জিনিয়ার গোলাম মোস্তফা, ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি লস্কর মো: তসলিম, কবির আহমদ ও মজিবর রহমান ভূঁইয়া প্রমুখ।

ডা: শফিকুর রহমান বলেন, বর্তমানে মালিক শ্রমিকের মাঝে কৃত্রিম সঙ্কট ও সমস্যা সৃষ্টি করে একদল মানুষ ফায়দা লুটছে। ষড়যন্ত্রকারীদের ফাঁদে পা দিয়ে শ্রমিকরা অনেক সময় নিজেদের কর্মস্থল ধ্বংস করছে। তারা বুঝতে পারছে না কর্মস্থল ক্ষতিগ্রস্ত হলে তারা দাবি জানাবে কোথায়? অপর দিকে কিছু মালিক অধিক মুনাফা করতে গিয়ে শ্রমিকদের পেটে আঘাত করছে। ফলে শ্রমিকরা কাজে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছে। এতে উভয়ের ক্ষতি হচ্ছে। আমরা শ্রমিক-মালিকের মাঝে সব প্রকার দ্বন্দ্বের অবসান চাই।

তিনি বলেন, শ্রমিক এবং কর্মজীবী মানুষ নানাভাবে নির্যাতিত এবং তাদের ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত। মিল, ফ্যাক্টরি ও ইন্ডাষ্ট্রিতে শ্রমিকদের উপযুক্ত মূল্যায়ন করা হয় না। তাদের শ্রমের মর্যাদা দেয়া হয় না। এখনো বহু কলকারখানার কর্মপরিবেশ ঠিক করা যায়নি। সত্যিকারার্থে আমরা যদি টেকসই বাংলাদেশ গড়তে চাই, একটি শান্তির বাংলাদেশ গড়তে চাই- তাহলে সমাজের প্রত্যেকে পরস্পর সম্মান এবং ভালোবাসা দিয়ে এ সমাজকে গড়ে তুলতে হবে। যেদিন মালিকরা শ্রমিকদের মন থেকে ভালোবাসবে এবং সম্মান দিবে সেদিন শ্রমিকরা মালিকের ষোলআনা পূরণ করবে। আর শ্রমিক যতদিন পর্যন্ত অনুভব করবে আমার মালিক তো আমাকে মানুষই মনে করে না। ততদিন পর্যন্ত মালিকের আয় উন্নতি বাধাগ্রস্ত হবে। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের মূল কাজ হচ্ছে মালিক এবং শ্রমিকের সমন্বয়ে, একটি পারস্পরিক ভালোবাসা এবং সম্মানের সমাজ গড়ে তোলা। আমরা সেই সমাজটাকেই দেখতে চাই। ডা: শফিকুর রহমান বলেন, আমি বিশ^াস করি শ্রমিকরা রক্ত পানি করে গায়ের ঘাম ফেলে যে টাকা আয় করে তা হালাল। তাদের গায়ের ঘাম আমার কাছে আতরের মতো। আমি যখন শ্রমিকের সংস্পর্শে যাই তখন অনেকে হাত মিলাতে চায় না আমি তাদের বুকে নিয়ে নিই। আসো ভাই আমি তোমাকে একটু বুকে নিয়ে নিই। কারণ আল্লাহর রাসুল বলেছেন শ্রমিকরা ৫০০ বছর আগে জান্নাতে চলে যাবে।

অধ্যাপক মজিবুর রহমান বলেন, বছরের ৩৬৪ দিন শ্রমিকদের সম্মান, মর্যাদা ও অধিকার দেয়া হয় না। যদি এটা হতো তাহলে বাংলাদেশে একটা আদর্শ রাষ্ট্র বাস্তবায়ন হতো। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এদেশে ইসলামী শ্রমনীতি বাস্তবায়ন করতে চায়। মানুষ হিসেবে আমাদের দায়িত্ব হচ্ছে আল্লাহর আইন মেনে চলা। তিনি বলেন, আল্লাহ তায়ালা বলেন তোমরা নামাজ শেষ করে জমিনে ছড়িয়ে পড়ো। অর্থাৎ কাজে নেমে পড়ো। আগামী দিনে নামাজ কায়েমের মাধ্যমে মানুষের চরিত্র ভালো করব এবং আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে নিজেদের ভালো রাখব এবং এ দেশের মানুষকে ভালো রাখার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

অধ্যাপক মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, শ্রমিক আন্দোলনে নতুন ধারা সৃষ্টিকারী শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন এই ঐতিহাসিক জমায়েতের মধ্যে দিয়ে প্রমাণ করেছে বাংলাদেশের শ্রমিকরা নতুন ধারাকে গ্রহণ করেছেন। ষাটের দশকে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তানের বিভিন্ন কল কারখানায় ঢাকা, চট্টগ্রাম, ডেমরা, গাজীপুর, খুলনার শিল্প এলাকায় ট্রেড ইউনিয়নের নামে মালিক শ্রমিক দ্বন্দ্ব বাধিয়ে এক শ্রেণীর শ্রমিক নেতারা পাশ্চাত্যের সমাজতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষ রাজনীতির বীজ ঢুকিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিকদের সমাজতন্ত্রের দীক্ষা দিতে শুরু করেছিল। কলকারখানার মালিক-শ্রমিক দ্বন্দ্ব বাধিয়ে তারা নাস্তিক্যবাদী ধারার সূচনা করেছিল। তারা বলত শ্রেণি সংগ্রামী হচ্ছে পৃথিবীর ইতিহাস। শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠা লাভ করে বলেছিল- শ্রেণী সংগ্রাম নয়, সত্য মিথ্যার দ্বন্দ্বই পৃথিবীর ইতিহাস। মালিক-শ্রমিকের দ্বন্দ্ব নয় সৎ মালিক ও সৎ শ্রমিকের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় কলকারখানার উৎপাদনের চাকা সচল রেখে একদিকে শ্রমিকের অধিকার প্রতিষ্ঠা অপর দিকে অর্থনীতির চাকাকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার নতুন ধারা সৃষ্টি করেছে শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন।

সভাপতির বক্তব্যে আ ন ম শামসুল ইসলাম বলেন, শ্রমিকরা যেখানে নির্যাতিত হচ্ছে, নিপীড়িত হচ্ছে, সেই নির্যাতিত শ্রমিকদের দাবিদাওয়া যাতে মেনে নেয়া হয়। আল্লাহর রাসুল সা: যে ভাবে শ্রমনীতি সাজিয়েছেন ঠিক সেভাবে যদি আমরা শ্রমনীতি সাজাতে পারি তাহলে শ্রমিকদের আর কোনো সমস্যা থাকবে না। বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন সেই কাজ করে যাচ্ছে। আমরা আল্লাহর জমিনে আল্লাহর আইন বাস্তবায়ন করার মাধ্যমে শ্রমিকের অধিকার ফিরিয়ে দিবো ইনশাআল্লাহ।

দু’দিনব্যাপী আমির সম্মেলন আজ শুরু : আজ শনিবার ও আগামীকাল রোববার সকাল থেকে দুই দিনব্যাপী বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর জেলা ও মহানগরী আমির সম্মেলন ঢাকার মগবাজারস্থ আল-ফালাহ মিলনায়তনে অনুষ্ঠিত হবে। এতে জামায়াত আমির ডা: শফিকুর রহমানসহ কেন্দ্রীয় নেতারা উপস্থিত থাকবেন।

আওয়ামী লীগের প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও ভোট দেয়নি-নূরুল ইসলাম বুলবুল : আওয়ামী লীগের প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও ভোট দেয়নি উল্লেখ করে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য ও ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের আমির মো: নূরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, জামায়াতে ইসলামীসহ ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে বিরোধী দলগুলোর আন্দোলনের বড় সাফল্য হচ্ছে আওয়ামী লীগের পাতানো নির্বাচন বর্জন। পুরো জাতি বিরোধী দলগুলোর ভোট বর্জনকে সমর্থন করেছে। এমনকি আওয়ামী লীগের ওই সব প্রহসনের নির্বাচনে আওয়ামী লীগও ভোট দেয়নি। কারণ দিন শেষে দেখে গেছে ৪ শতাংশ থেকে ৫ শতাংশ ভোট পড়েছে। আওয়ামী লীগের প্রহসনের নির্বাচনের প্রার্থী ও তাদের পরিবারের লোক ছাড়া আর কেউ ভোট দেয়নি। মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়ে আওয়ামী লীগ এ দেশে ফ্যাসিবাদ শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে। মানুষ ভোটের অধিকার ফিরিয়ে পেতে দীর্ঘ আন্দোলন সংগ্রাম করে ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করেছে। মানুষ এমন একটি ভোট চায়, যেখানে নিজের পছন্দের প্রার্থীকে নির্বিঘেœ, নির্ভয়ে ভোট দিতে পারবে এবং ভোটের ফলাফল সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে প্রকাশ পাবে। শুধু ভোট গ্রহণ সুষ্ঠু হলে হবে না, ফলাফলও সুষ্ঠু হতে হবে। কারণ ভোট গ্রহণের পর পরাজয়ের ভয়ে ক্ষমতা লোভীরা নির্বাচনের সাথে জড়িতদের প্রভাবিত করে ফলাফল পাল্টিয়ে দেয়। এ জন্য জামায়াতে ইসলামী জাতীয় নির্বাচনের আগে স্থানীয় নির্বাচন করে নির্বাচন কমিশন সহ সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সক্ষমতা যাচাই করতে চায়। এই দাবি শুধু রাজনৈতিক দল হিসেবে জামায়াতে ইসলামীর নয়, এই দাবি বাংলাদেশের প্রতিটি মানুষের। বৃহস্পতিবার রাতে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী ধানমণ্ডি জোনের বিশেষ শিক্ষা বৈঠকে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।

অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তৃতা করেন, বাংলাদেশ ল’ইয়ার্স কাউন্সিলের সভাপতি ঢাকা-১০ আসনে জামায়াত মনোনীত সংসদ সদস্য প্রার্থী অ্যাডভোকেট জসিম উদ্দিন সরকার। ঢাকা মহানগরী দক্ষিণের কর্মপরিষদের সদস্য ও ধানমণ্ডি জোন পরিচালক অধ্যাপক নুর নবী মানিকের সভাপতিত্বে শিক্ষা বৈঠকে ধানমন্ডি জোনের সব থানা আমির ও সেক্রেটারিসহ দায়িত্বশীল নেতারা উপস্থিত ছিলেন।