রাঙ্গামাটিতে ৩ দিনের বিজু বৈসুবিষু উৎসব শুরু

Printed Edition
3rd 3
রাঙ্গামাটিতে ৩ দিনের বিজু বৈসুবিষু উৎসব শুরু

রাঙ্গামাটি প্রতিনিধি

রাঙ্গামাটিতে কাপ্তাই হ্রদে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে পার্বত্য অঞ্চলের পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর তিন দিনব্যাপী বৃহৎ সামাজিক ও ধর্মীয় উৎসব বিজু, সাংগ্রাই, বৈসু, বিষু, চাংক্রান, চাংলান, পাতা ও বিহু।

গতকাল ভোরে রাজবাড়ী ঘাটসহ বিভিন্ন স্থানে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে উৎসবের সূচনা হয়। এ উপলক্ষে ভোর থেকেই পাহাড়ি তরুণ-তরুণীরা বাগান থেকে ফুল সংগ্রহ করে ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত হয়ে কাপ্তাই হ্রদের তীরে জড়ো হন। পরে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে পানিতে ফুল ভাসিয়ে নতুন বছরের মঙ্গল কামনা করেন তারা। এ সময় নারী-পুরুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে উৎসবমুখর হয়ে ওঠে পুরো এলাকা।

শহরের গর্জনতলীতে ত্রিপুরা কল্যাণ ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে গঙ্গা দেবীর উদ্দেশ্যে ফুল ভাসানোর মধ্য দিয়ে ত্রিপুরা সম্প্রদায়ের বৈসু উৎসবের উদ্বোধন করেন রাঙ্গামাটি জেলা পরিষদের সদস্য সাগরিকা রোয়াজা। এসময় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

এ উৎসব পার্বত্য চট্টগ্রামে বসবাসরত ১৪টি ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সবচেয়ে বড় সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন। পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর বিশ্বাস, ফুল ভাসানোর মাধ্যমে তারা সৃষ্টিকর্তার আশীর্বাদ লাভ করেন এবং পুরনো বছরের সব গ্লানি ধুয়ে নতুন বছরের জন্য শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করেন।

রাঙ্গামাটি বৈসাবি উদযাপন কমিটির সদস্যসচিব ইন্টু মনি তালুকদার জানান, পুরনো বছরের গ্লানি ভুলে সুন্দর ভবিষ্যতের প্রত্যাশায় আমরা ফুল ভাসিয়ে প্রার্থনা করেছি। বিশ্বের সব মানুষের মঙ্গল এবং পাহাড়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় থাকুক এটাই আমাদের কামনা।

এ দিকে উৎসবকে ঘিরে পাহাড়ের বাজার ও বিপণিবিতানগুলোতে বেড়েছে কেনাকাটা আর শহরে ভিড় জমিয়েছেন অসংখ্য পর্যটক। পাহাড়ের বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠী নিজেদের স্বতন্ত্র ঐতিহ্য অনুযায়ী এই উৎসব পালন করে। চাকমারা একে বিজু, মারমারা সাংগ্রাই, ত্রিপুরারা বৈসু, তঞ্চঙ্গ্যারা বিষু, ম্রো ও খুমিরা চাংক্রান, সাওতালরা পাতা এবং অহমিয়া বা গুর্খারা বিহু নামে উদযাপন করে থাকে। সমতলের মানুষের কাছে এটি ‘বৈসাবি’ নামে পরিচিত হলেও সম্প্রতি প্রতিটি জনগোষ্ঠীর নিজস্ব নামে উৎসব পালনের ওপর গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে, যা তাদের সাংস্কৃতিক স্বাতন্ত্র রার একটি প্রয়াস হিসেবে দেখা হচ্ছে।

নববর্ষের আনন্দে উচ্ছ্বাসিত খাগড়াছড়ি

খাগড়াছড়ি প্রতিনিধি জানান, বাংলা নববর্ষের আনন্দে উচ্ছ্বাসিত পার্বত্য জনপদ খাগড়াছড়ি। বর্ষ বিদায় ও বরণ অনুষ্ঠানকে ঘিরে নতুন সাঁজে সেজেছে পাহাড় ঝিড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের সমাহার খাগড়াছড়ির প্রতিটি জনপদ। সব পাপাচার ও মিথ্যাচার ধুয়ে মুছে নিতে খাগড়াছড়িতে চাকমা সম্প্রদায়ের তিন দিনব্যাপী বিজু উৎসব শুরু হয়েছে গতকাল। চাকমারা তিন দিন ধরে এই বর্ষবরণ উৎসব সেই আদিকাল থেকে পালন করে আসছে।

পুরনো বছরকে বিদায় এবং নতুন বছরকে বরণ উপলক্ষে এই বর্ষবরণ উৎসবকে চাকমা সম্প্রদায় বিজু, মারমা সম্প্রদায় সাংগ্রাইং এবং ত্রিপুরা জনগোষ্ঠী বৈসু বলে আখ্যা দিয়ে থাকে। প্রত্যেক সম্প্রদায় তিন দিনব্যাপী এ উৎসব পালন করলেও ১২ এপ্রিল থেকে শুরু হয়ে ১৬ এপ্রিল পর্যন্ত মূলত বর্ষবরণ উৎসব পালিত হয় এ অঞ্চলে। ১২, ১৩ ও ১৪ এপ্রিল চাকমারা বিজু, ১৩, ১৪ ও ১৫ এপ্রিল ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু এবং ১৪, ১৫ ও ১৬ এপ্রিল মারমা জনগোষ্ঠী সাংগ্রাইং পালন করে থাকে।

চাকমারা বিজু উৎসবকে তিনটি ভাগে পালন করে থাকে। প্রথম দিন ফুল বিজু। এ দিন শিশু-কিশোররা ফুল তুলে নদীতে ভাসায় ও ঘর সাজায়। দ্বিতীয় দিন মূল বিজু। এ দিন নানা ধরনের খাবারের আয়োজন করে থাকে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য একটি খাবার হচ্ছে পাচন, যা নানা প্রকারের উপাদানের সংমিশ্রণে সবজির মতো রান্না হয়ে থাকে। এ ছাড়া বিভিন্ন ধরনের পিঠা ও মিষ্টান্নও তৈরি করা হয়। এ দিন ঘরের দরজা থাকে অতিথিদের জন্য উন্মুক্ত থাকে। এ ছাড়াও বিজুর তিন দিন চাকমারা পালন করে সাংসারিক ও সামাজিক আচারণ অনুষ্ঠান। তৃতীয় দিনকে বলা হয় গজ্যাপজ্যা। এ দিন ধর্মপ্রাণ চাকমা জনগোষ্ঠীর লোকজন বিহারে গিয়ে প্রার্থনা করে।

উল্লেখ্য, আজ ১৩ এপ্রিল ত্রিপুরা সম্প্রদায় বৈসু এবং ১৪ এপ্রিল মারমা জনগোষ্ঠী সাংগ্রাইং উৎসব শুরু হবে। ইতঃপূর্ব এসব উৎসবকে স্বাগত জানিয়ে বর্ণাঢ্য র‌্যালি করেছে খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ আর ৯ এপ্রিল ত্রিপুরাদের উদ্যোগে বৈসু শোভাযাত্রাসহ ঐতিহ্যবাহী ত্রিপুরা নৃত্য অনুষ্ঠিত হয়। ১৪ এপ্রিল মারমাদের সাংগ্রাইং শোভাযাত্রা ও পানি খেলা অনুষ্ঠিত হবে। এ দিকে ২৯৮নং খাগড়াছড়ি আসনের সংসদ সদস্য ওয়াদুদ ভূঁইয়ার প্রষ্ঠপোষকতায় হৃদয়ে চৈত্র সংক্রান্তি বাংলা বর্ষবরণ উদযাপন কমিটির উদ্যোগে পয়লা বৈশাখ ১৪৩৩ উদযাপন উপলক্ষে লোকজ সংস্কৃতির সমন্বয়ে বর্ণাঢ্য শোভাযাত্রা ও দ্বিতীবারের মতো খাগড়াছড়ি সরকারি উচ্চবিদ্যালয় প্রাঙ্গণে শতবর্ষী বটমূলে মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়েছে। এ ছাড়াও রয়েছে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বর্ষবরণের র‌্যালি এবং বিভিন্ন সম্প্রদায়ের সপ্তাহব্যাপী নানা কর্মসূচি।