মাটির চুলা বিক্রি করে চলে যার সংসার
Printed Edition
উত্তম গোলদার
আধুনিকতার ছোঁয়ায় হারিয়ে যাচ্ছে আমাদের এক সময়ের গ্রামের ঐতিহ্য। সেসব ঐতিহ্য এখন মানুষের মুখে মুখে বা কল্পকাহিনীতে শোনা যায়। তবে এখনো কিছু কিছু মানুষ এসব ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন জীবন বাঁচানোর তাগিদে। এমনি একজন ‘মাটির চুলা’ বানানোর কারিগর মোসা. খাদিজা বেগম (৪৮)। তার দেখা মেলে পটুয়াখালীর মির্জাগঞ্জ উপজেলার ঝাটিবুনিয়া আশ্রয়ণ প্রকল্পে। সরেজমিন দেখা যায়, আশ্রয়ণ প্রকল্পের পাশে শ্রীমন্ত নদীর বাঁধের ওপর নানা রকমের ‘মাটির চুলা’ বানিয়ে সাজিয়ে রেখেছেন। মাটির চুলা পছন্দ হলে মানুষ ক্রয় করে নিয়ে যাচ্ছেন বাড়িতে। জানা যায়, মাটির চুলা তৈরি করতে নদীর পাড়ে জমির এঁটেল মাটি প্রয়োজন হয়। এ মাটির চুলা খুব শক্ত হয় এবং সহজে ভাঙে না। প্রতিটি চুলায় সাধারণত একটি করে জ্বালানি প্রবেশের মুখ থাকে। যেসব চুলায় একটি হাঁড়ি বা পাতিল বসানো যায়, সেটি একমুখো চুলা। যে চুলায় দু’টি হাঁড়ি বা পাতিল বসানো যায়, সেগুলোকে দু’মুখো চুলা বলা হয়। দু’মুখো মাটির চুলা দিয়ে সাধারণত গ্রামের বাড়িতে ধান সিদ্ধ করাসহ নানা কাজে ব্যবহার করা হয়। মাটির চুলার কারিগর মোসা. খাদিজা বেগমের সাথে আলাপ করলে তিনি জানান, আমাদের জমিজমা নেই,তাই আশ্রয়ণ ঘরে সবাইকে নিয়ে বসবাস করিছ। স্বামী একটি দুর্ঘটনায় হাত-পা ভেঙে যাওয়ায় দীর্ঘদিন অসুস্থ ছিলেন। আমার পরিবারে তিন মেয়ে ও এক পুত্রসন্তান রয়েছে। দু’টি মেয়েকে ধারদেনা করে বিবাহ দিয়েছি, ছোট মেয়েটি একটি মাদরাসার অষ্টম শ্রেণীর ছাত্রী এবং ছোট্ট ছেলে হাফিজিতে পড়ছে। টাকার অভাবে এবারে মাদরাসা থেকে নিয়ে এসেছি। এখন সরকারি বিদ্যালয়ে ভর্তি করাব। সেখানে টাকা-পয়সা তো লাগে না। স্বামী এখন কিছুটা সুস্থ আছেন তাই মানুষের বাড়িতে শ্রমিকের কাজ করেন এবং স্বামীর পাশাপাশি সংসারের বাড়তি আয়ের জন্য গত বছর থেকে ‘মাটির চুলা’ বানানোর কাজ শুরু করেছি আমি। এতে মোটামুটি আয় ভালো হয়। মাটির চুলা সম্পর্কে তিনি আরো বলেন, আমি বিভিন্ন প্রকারের ‘মাটির চুলা’ তৈরি করতে পারি। নদীর তীরের লাল বা এঁটেল মাটি হলে চুলা বানাতে ভালো হয়। ক্রেতারা যে ডিজাইনের বলে দেন সেভাবে তৈরি করতে পারি। এ ছাড়াও মাটির চুলা বানানো থাকে, ক্রেতারা পছন্দ মতো নিয়ে যান। এলাকাভিত্তিক মাটির চুলার একাধিক নাম রয়েছে। প্রতিটি চুলা ২০০-২৫০ টাকায় বিক্রি করি। মজার বিষয় হলো-মাটির চুলা বাকিতেও দিতে হয়। নদীর মাটি আর নিজের পরিশ্রম দিয়ে মাটির চুলা তৈরি করি। স্বামীর পাশাপাশি সংসারে এখন ভালো বাড়তি আয় হচ্ছে। তবে এখন মানুষ গ্যাসের চুলা ব্যবহারের ফলে আমার এ ‘মাটির চুলা’র কদর কমে গেছে। এখন আগের মতো মানুষ আর মাটির চুলা কিনতে আসে না। তবে গ্রামের পুরানো ঐতিহ্যবাহী পরিবারগুলোতে এখনো মাটির চুলায় রান্না হয়। কারণ মাটির চুলার রান্নার স্বাদ অনেক ভালো হয়।
লেখক : মির্জাগঞ্জ (পটুয়াখালী) সংবাদদাতা