সাক্ষাৎকার : ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী
সংস্কার নিয়ে সংসদের বাইরে বসতে হবে
Printed Edition
রাশিদুল ইসলাম : সংস্কার নিয়ে সংসদে আলোচনা ক্রমশ পয়েন্ট অব রিটার্নের দিকে চলে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে। প্রধান বিরোধীদলীয় নেতা বলেছেন, কথা বলতে না পারলে সংসদে বসে থেকে কী লাভ। সংসদে সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকায় বিরোধী দলের প্রতি তাদের অনঢ় অবস্থান দেখা যাচ্ছে। সংস্কার নিয়ে বিতর্ক বাড়ছে কিন্তু সিদ্ধান্তে পৌঁছানো কঠিন হয়ে পড়ছে। বিশেষজ্ঞরাও অনেকটা হতাশ। আবার কেউ কেউ বলছেন, আলোচনার মধ্যে দিয়েই সংস্কার বাস্তবায়নে সরকারি দল ও বিরোধী দলকে এগিয়ে যেতে হবে। সংস্কার নিয়ে গণরায় উপেক্ষার কোনো সুযোগ নেই। গণভোটের রায়ে হাত দেয়ার অধিকার কারো নাই। তাই এ নিয়ে সংসদের বাইরেও সরকারি দল ও বিরোধী দলের পরামর্শ এসেছে। বিষয়টি নিয়ে বিশিষ্ট আইনজ্ঞ ও সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী তাদের অভিমত দিয়েছেন।
সংবিধান সংস্কার কমিশনের সদস্য ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী বলেছেন সংস্কার নিয়ে সরকারি দল ও বিরোধী দলের মধ্যে যে বিতর্ক চলছে তার সমাধান সংসদে হবে না; বরং সংসদের বাইরে সরকারি দল ও বিরোধী দলের উচিত সংস্কার বাস্তবায়নে একটু ইনফরমাল কম্যুনিকেশন ডেভলপ করা। সমঝোতার আলোকে সংস্কারের বিষয়গুলো নিষ্পত্তি হওয়ার জন্যে এ ধরনের উদ্যোগ নেয়া জরুরি। কারণ পার্লামেন্ট এমন একটা জায়গা হয়ে গেছে পার্লামেন্টের প্রসিডিংসগুলো সবাই দেখছে এবং এটা রাইট ভার্সেস রং গুড ভার্সেস ইগো হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংসদে সবাই নিজ অবস্থানে অনঢ় থাকে, একটা অসহায় পরিস্থিতি, এটা তো আসলে ভালো না। যেহেতু সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে, এখানে সংখ্যাধ্যিকের কারণেই বিরোধী দল হেরে যাবে। এ জন্যেই সরকারি দল ও বিরোধী দলের কিছু সিনিয়র লিডার বসে যদি সংস্কার নিয়ে সমঝোতায় আসেন, তাহলে ভালো হয়।
নয়া দিগন্ত : সরকারি দল ও বিরোধী দলের পাশাপাশি কি সংস্কার নিয়ে কোনো বিশেষজ্ঞ প্যানেলের প্রয়োজন রয়েছে?
ব্যারিস্টার ইমরান সিদ্দিকী : সংসদে তো অনেক আইনজীবী রয়েছেন। তারা নিজেরা আলোচনার সূত্রপাত ও বিষয়টি নিয়ে পরামর্শ করতে পারেন। তারা যদি মনে করেন তাদের বাইরেও রিটায়ার্ড জাজেজ যারা সংবিধান নিয়ে অনেক রায় দিয়েছেন, যারা বিজ্ঞ ও প্রাজ্ঞ তাদের মতামত নেয়া যেতে পারে, তাদের পরামর্শটা কী জানা যেতে পারে।
নয়া দিগন্ত : উদ্যোগটা কে নেবে?
ব্যারিস্টার ইমরান: যেহেতু সরকারি দলের দুই-তৃতীয়াংশ মেজরিটি, উদ্যোগটা ওনাদের নেয়া উচিত। এ প্রস্তাব বিরোধী দলের পক্ষ থেকেও আসতে পারে। ইনফরমাল আলাপ হতে পারে, কমিটি হতে পারে। আলোচনার জন্যে উভয় পক্ষ উভয়ের ওপর বিষয়টি জরুরি বিবেচনা করে চাপ সৃষ্টি করতে পারেন।
নয়া দিগন্ত : সংসদের ভেতরেও তো বিতর্কের মধ্যে দিয়ে সমঝোতায় পৌঁছানো যায়।
ব্যারিস্টার ইমরান : না, সংস্কার নিয়ে এ পর্যন্ত সংসদে যেসব আলোচনা হচ্ছে যা দেখলাম, ডিবেটের মাধ্যমে তো আসলে কোনো ধরনের সমাধান হবে বলে আমরা মনে করছি না। কারণ এক পক্ষ যে যুক্তি দিচ্ছে, অন্য পক্ষ পাল্টা যুক্তি দিচ্ছে, পাল্টা পাল্টা যুক্তি হচ্ছে, তো এটাতো কোনো সলিউশন না। এটা এভাবে হবে না।
নয়া দিগন্ত : সুশীল সমাজ বা নাগরিক সংগঠনের কি কোনো ভূমিকা থাকতে পারে?
ব্যারিস্টার ইমরান : সুশীল সমাজ বা নাগরিক সংগঠন বলেন তাদের সমন্বয়েই তো এ ধরনের সংস্কার প্রস্তাব দেয়া হয়েছে। রাজনীতিবিদরা এ নিয়ে মাসের পর মাস আলোচনাও করেছেন। তাদের ইমপুট বা উদ্যোগেই তো কাজগুলো করা হয়েছিল।
নয়া দিগন্ত : কিন্তু সংস্কার নিয়ে নোট অব ডিসেন্ট দেয়া হয়েছে।
ব্যারিস্টার ইমরান : ৭০ শতাংশ ভোটার জুলাই সনদ বাস্তবায়নে আদেশের পক্ষে ভোট বা রায় দিয়েছেন। গণরায় উপেক্ষা করার সুযোগ নাই। রাষ্ট্রের আসল মালিক জনগণ। ঐতিহাসিক সন্ধিক্ষণে আমরা দাঁড়িয়ে আছি, সাংবিধানিক মুহূর্তে এমন কোনো কাজ করা ঠিক হবে না যাতে আইনি ঝুঁকির সৃষ্টি হয়। নোট অব ডিসেন্ট থাকুক বা না থাকুক, জুলাই সনদের রিফর্ম প্রোপজালগুলোই প্রাধান্য পাবে। আইনপ্রণেতাদের সদিচ্ছা সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। ইতোমধ্যে বিচার বিভাগ স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারবে কি না সন্দেহের সৃষ্টি হয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকলে মানবাধিকার, গুম-সংক্রান্ত নিষ্পত্তির ভবিষ্যত অনিশ্চয়তার মুখে পড়তে পারে। প্যারালাল গভর্নমেন্ট হওয়ার কোনো সুযোগ নাই। চেক অ্যান্ড ব্যালান্স মানে মন্ত্রণালয়ের অধীন নয়। মন্ত্রণালয়ের অধীনে মানবাধিকার কমিশন রাখলে তা কখনোই স্বাধীন হতে পারবে না। চেক অ্যান্ড ব্যালান্সের ঘাটতি থেকে যাবে।
নয়া দিগন্ত : সংস্কার নিয়ে এত উদ্যোগ এত আলোচনা শেষ পর্যন্ত কোথায় যাচ্ছে বিষয়টি।
ব্যারিস্টার ইমরান : এখন মূলকথা হচ্ছে সংস্কার কিভাবে বাস্তবায়ন হবে। সংসদে সংস্কার নিয়ে আলাপের পাশাপাশি সরকারি দল ও বিরোধী দল উভয়কেই ইনফরমালি বিষয়টি নিয়ে আলোচনার মাধ্যমে উদ্ভূত পরিস্থিতি কাটিয়ে উঠতে হবে। সমঝোতার মাধ্যমে বিষয়গুলো নিষ্পত্তি করতে পারলে ভালো হয়।