র‌্যাব বিলুপ্ত, এসআরবি বিল পাস

Printed Edition
Font-3

- র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল, নতুন নামে একই বাহিনী নয়- শফিকুর রহমান

- রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার ভিত্তিতেই বিশেষায়িত ইউনিট গঠন - স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী

সংসদ প্রতিবেদক

বিরোধী দলের তীব্র আপত্তির মধ্যে জাতীয় সংসদে র‌্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র‌্যাব) বিলুপ্ত করে পুলিশের আওতাধীন ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) আইন, ২০২৬’ পাস হয়েছে। গতকাল বৃহস্পতিবার ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের তৃতীয় অধিবেশনের শেষ দিন বিলটি উত্থাপন করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। এ পর্যায়ে অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ। এর আগে ৩ সেপ্টেম্বর বিলটি সংসদে উত্থাপনের পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য সংসদীয় কমিটিতে পাঠানো হয়। গত বুধবার সংসদীয় স্থায়ী কমিটির প্রতিবেদন সংসদে উত্থাপন করেন জয়নুল আবেদীন। বিলের ওপর সাতটি আপত্তি জানায় বিরোধী দল।

নোট অব ডিসেন্টে বিরোধী সদস্যরা বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠনের আগে যথাযথ জাতীয় পরামর্শ ও শক্তিশালী জবাবদিহির ব্যবস্থা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাদের আপত্তির মধ্যে রয়েছে বিলটি দ্রুত পাস, র‌্যাবের জনবল-সম্পদ ও রেকর্ড সরাসরি এসআরবিতে হস্তান্তর, অভিযোগ তদন্তের কাঠামো, গ্রেফতার ও আটকের মতা, প্রশিণ এবং বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকারকারী সদস্যদের সুরা। তাদের আশঙ্কা, যথাযথ স্বাধীন নজরদারি ও জবাবদিহি নিশ্চিত না হলে নতুন এসআরবি র‌্যাবেরই নতুন নাম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। এ জন্য রাজনৈতিক দল, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, বিচারক, আইনজীবী, ভুক্তভোগী পরিবার ও মানবাধিকার সংগঠনসহ সংশ্লিষ্টদের সাথে বিস্তৃত পরামর্শের প্রস্তাব দেয়া হয়।

গতকাল বৃহস্পতিবার র‌্যাব বিলুপ্ত করে এসআরবি বিল, ২০২৬ পাসের আগে সংসদে সরকারি ও বিরোধী দলের সদস্যদের মধ্যে তুমুল বিতর্ক হয়েছে। বিরোধী দলের সদস্যরা বলেছেন, র‌্যাবের জনবল, স্থাপনা, সম্পদ ও কার্যক্রমের বড় অংশ নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর করে শুধু নাম পরিবর্তন করলে অতীতের গুম, হেফাজতে নির্যাতন, বেআইনি আটক ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের অবসান হবে না। তাদের দাবি, নতুন বাহিনী গঠনের আগে স্বাধীন তদন্ত ও জবাবদিহিতার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে এবং অংশীজনদের মতামত নিতে হবে। বিলটি প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছেন বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান। তবে সরকারি দলের দাবি র‌্যাবের মতো আরেকটি বিশেষায়িত সংস্থার প্রয়োজন আছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ এসব আপত্তির জবাবে বলেছেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পদ নষ্ট না করে প্রয়োজনীয় জনবল ও সরঞ্জাম নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর করা হবে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেন, বিলটি নিয়ে যথেষ্ট আলোচনা ও পরামর্শ হয়েছে। বিরোধীদলীয় নেতার প্রস্তাবের পর স্থায়ী কমিটিতে আলোচনার জন্য সময় বাড়ানো হয়েছিল। চার কার্যদিবস আলোচনা হয়েছে এবং স্থায়ী কমিটির রিপোর্টেই তার প্রতিফলন রয়েছে।

তিনি বলেন, বিলটি মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছিল এবং বাইরের অংশীজনদের মতামতও নেয়া হয়েছে। বিরোধী সদস্যদের দেয়া নোট অব ডিসেন্ট নিয়ে স্থায়ী কমিটিতে আলোচনা হয়েছে এবং তাদের প্রস্তাব অনুযায়ী সংশোধনীও আনা হয়েছে।

ধারা ২৪-এর অভিযোগ প্রতিকার কমিটি নিয়ে আপত্তির জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই কমিটি কোনো ফৌজদারি অপরাধের তদন্তের জন্য নয়; এটি বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা ও প্রশাসনিক অভিযোগ নিষ্পত্তির জন্য। কোনো সদস্য অপরাধ করলে প্রচলিত আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেয়ার বিধান রয়েছে।

গ্রেফতারকৃত ব্যক্তির বিষয়ে বিলে স্পষ্ট বিধান রয়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, গ্রেফতারের পর তাকে অবিলম্বে নিকটবর্তী থানার হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করতে হবে এবং এসংক্রান্ত প্রতিবেদন যথাযথ কর্তৃপরে কাছে দিতে হবে।

র‌্যাব থেকে এসআরবিতে সম্পদ হস্তান্তরের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, র‌্যাব বিলুপ্ত করা হচ্ছে এবং এসআরবি হবে নতুন একটি বাহিনী। তবে রাষ্ট্রের অস্ত্র, সরঞ্জাম, স্থাপনা ও অন্যান্য সম্পদ নষ্ট বা নিলামে দিয়ে দেয়া যায় না। রাষ্ট্রীয় সম্পদ রা এবং নতুন করে একই সরঞ্জাম কিনে অর্থ অপচয় ঠেকাতেই প্রয়োজন অনুযায়ী সেসব সম্পদ নতুন বাহিনীতে হস্তান্তর করা হবে।

তিনি বলেন, র‌্যাব মূলত আর্মড পুলিশ ব্যাটালিয়ন আইনের একটি ধারার অধীনে পরিচালিত হতো। দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতায় ওই কাঠামোর ত্রুটি ধরা পড়েছে। তাই র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন আইনগত কাঠামোর অধীনে এসআরবি গঠন করা হচ্ছে।

স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, অপরাধের ধরন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং সাইবার স্পেস ব্যবহারের প্রবণতা বাড়ছে। এ কারণে ভবিষ্যতে পুলিশ বাহিনীর অধীনে সাইবার সিকিউরিটি ইউনিট গঠনের উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে। সমাজের প্রয়োজন ও রাষ্ট্র পরিচালনার বাস্তবতার ভিত্তিতেই বিশেষায়িত ইউনিট গঠন করা হয়।

বিরোধী দলের নোট অব ডিসেন্টের অধিকাংশ বিষয়ের জবাব দেয়া হয়েছে দাবি করে তিনি বলেন, এসআরবি কোনোভাবেই র‌্যাবকে নতুন নামে ফিরিয়ে আনা নয়। র‌্যাব বিলুপ্ত করেই নতুন বাহিনী গঠন করা হচ্ছে।

‘র‌্যাব বিলুপ্তির দাবি ছিল, নতুন নামে একই বাহিনী নয়’:

বিলটি পাসের আগে বিরোধীদলীয় নেতা ডা: শফিকুর রহমান বলেন, এসআরবি বিল জাতীয় জীবনের অন্য সাধারণ বিলের মতো নয়। র‌্যাব প্রতিষ্ঠার পর এর কিছু ইতিবাচক ভূমিকা থাকলেও নেতিবাচক কর্মকাণ্ড এত বেশি ছিল যে তা দেশ-বিদেশে উদ্বেগ তৈরি করেছে।

তিনি বলেন, র‌্যাবের হাতে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের অনেকে আজও নিখোঁজ। র‌্যাব বিলুপ্ত করাই ছিল বিভিন্ন মহলের দাবি। কিন্তু র‌্যাব বিলুপ্ত করে নতুন নামে একই ধরনের বাহিনী গঠনের দাবি কারো ছিল না।

র‌্যাবের স্থাপনা, লজিস্টিক ও মতা বহাল রেখে শুধু নাম পরিবর্তনের সমালোচনা করে তিনি বলেন, বিলটি আলোচনার সময়ও একই বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে অভিযোগ সামনে এসেছে। এতে প্রমাণ হয়, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই বাহিনীর চরিত্র পরিবর্তন হয় না।

জামায়াতের আমির বলেন, বিলটি নিয়ে সিভিল সোসাইটিসহ বিভিন্ন মহল আপত্তি জানিয়েছে। তাই এ অধিবেশনেই বিলটি পাস না করে সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সাথে আরো আলোচনা করা উচিত। কেন এমন একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন, সেটিও জনগণের কাছে স্পষ্ট করতে হবে। কিছু ছোটখাটো পরিবর্তন আনা হলেও মৌলিক জায়গায় পরিবর্তন হয়নি। ‘আমি অপরাধ করব, আমিই তদন্ত করব’Ñ এমন ব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য নয় উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতীয় স্বার্থে বিলটি প্রত্যাহার করে আরো চিন্তাভাবনার পর নতুন করে আনা উচিত।

‘র‌্যাবের আগের ভূমিকা ছিল ভিন্ন, বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন’ Ñবাবর :

নেত্রকোনা-৪ আসনের সদস্য ও সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী মো: লুৎফুজ্জামান বাবর বলেন, বিরোধী দলের সদস্যরা মূলত গত ১৫ বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে র‌্যাবকে দেখছেন। কিন্তু র‌্যাব প্রতিষ্ঠার সময় এর ভূমিকা ছিল ভিন্ন। তিনি বলেন, ১৭ আগস্টের সিরিজ বোমা হামলা, শীর্ষ সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযানসহ রাষ্ট্রের নিরাপত্তায় র‌্যাব গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও র‌্যাবের মতো একটি বিশেষায়িত বাহিনী প্রয়োজন।

বাবর বলেন, র‌্যাবকে রাজনৈতিকভাবে ব্যবহার করা উচিত নয়। প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসআরবিকে জনগণের নিরাপত্তা ও রাষ্ট্রের স্বার্থে পরিচালনার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। বিরোধী দলের প্রস্তাবিত সংশোধনীগুলো পরবর্তী সময়ে বিবেচনার আশ্বাস দিয়ে তিনি বিলটি অনুমোদনের সুযোগ দেয়ার আহ্বান জানান।

‘চার কার্যদিবসে এত গুরুত্বপূর্ণ বিল পাসের সুপারিশ গ্রহণযোগ্য নয়’ :

চাঁপাইনবাবগঞ্জ-৩ আসনের সদস্য নুরুল ইসলাম বুলবুল বলেন, এসআরবি বিল নিয়ে তিনি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটিতে ‘নোট অব ডিসেন্ট’ দিয়েছেন। র‌্যাবের বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও এত বড় একটি বিল মাত্র চার কর্মদিবসের মধ্যে পাসের জন্য সংসদে আনা গ্রহণযোগ্য নয়।

তিনি বলেন, ভুক্তভোগী, ফৌজদারি আইনজীবী, মানবাধিকার কমিশন, আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা ও বিচারিক প্রক্রিয়ার সাথে সংশ্লিষ্টদের মতামত নিয়ে বিলটি আরো পর্যালোচনা করা প্রয়োজন ছিল।

‘নতুন বোতলে পুরনো র‌্যাব থেকে যাওয়ার আশঙ্কা’ :

পাবনা-১ আসনের সদস্য ব্যারিস্টার নাজিবুর রহমান বলেন, ২০১৪ সালের নারায়ণগঞ্জের সাত খুনের পর র‌্যাবকে ‘কিলিং স্কোয়াড’ আখ্যায়িত করে এর বিলুপ্তির দাবি করেছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। ২০১৯ সালেও তিনি র‌্যাবকে ‘ক্যান্সার’ আখ্যায়িত করে বিলুপ্তির দাবি করেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বিএনপির প থেকে পুলিশ সংস্কার কমিশনের কাছেও র‌্যাব বিলুপ্তির আনুষ্ঠানিক সুপারিশ করা হয়েছিল বলে উল্লেখ করেন তিনি।

নাজিবুর রহমান বলেন, জাতিসঙ্ঘ, হিউম্যান রাইটস ওয়াচ ও গুমসংক্রান্ত কমিশনও র‌্যাব বিলুপ্তির সুপারিশ করেছিল। অথচ এসআরবি বিলে র‌্যাবের জনবল, কার্যালয়, মতা, নথিপত্র, সম্পদ, চুক্তি ও দায়দায়িত্ব নতুন বাহিনীর কাছে হস্তান্তরের কথা বলা হয়েছে। ফলে ‘নতুন বোতলে পুরনো র‌্যাব’ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

চুয়াডাঙ্গা-২ আসনের সদস্য মো: রুহুল আমিন বলেন, বাংলাদেশের অপরাধজগতের আলোচিত ঘটনাগুলোর সাথে র‌্যাবের ভূমিকা নিয়ে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। সেই বাহিনী বিলুপ্ত করে নতুন বাহিনী গঠন করা হলেও পুরনো কাঠামো ও সংস্কৃতি বহাল থাকলে তা ‘পুরনো বোতলে নতুন কিছু ঢালার’ মতো হবে।

শেরপুর-১ আসনের সদস্য মো: রাশিদুল ইসলাম রাশেদ র‌্যাবের বিরুদ্ধে বেআইনি আটক, হেফাজতে নির্যাতন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, নতুন বাহিনীকে অতীতের এসব অভিজ্ঞতা থেকে শিা নিতে হবে। অভিযোগ তদন্তের জন্য বাহিনীর প্রভাবমুক্ত স্বাধীন ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি, মানবাধিকার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিদের অন্তর্ভুক্ত করে এ ব্যবস্থা গঠনের প্রস্তাব দেন তিনি।

কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সদস্য শেখ মুজিবুর রহমান ইকবাল বিলটির পে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ২০০৪ সালে মানুষের নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রার উদ্দেশ্যে র‌্যাব গঠন করা হয়েছিল। প্রতিষ্ঠার পর শীর্ষ সন্ত্রাসী দমন ও আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে বাহিনীটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

তবে পরবর্তী সময়ে র‌্যাবের বিরুদ্ধে গুম, হত্যা ও নানা অপকর্মের অভিযোগ ওঠে উল্লেখ করে তিনি বলেন, শুধু নাম পরিবর্তন করলেই হবে না, কার্যক্রমেও পরিবর্তন আনতে হবে। এসআরবি যেন দলীয় কাজে বা দলীয়করণে ব্যবহার না হয়, সে নিশ্চয়তা দেয়ার আহ্বান জানান তিনি।

কী আছে এসআরবি বিলে

বিলে বলা হয়েছে, দেশের জননিরাপত্তা রা, সন্ত্রাসবাদ ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ দমন এবং পুলিশ বাহিনীকে সহায়তার জন্য আধুনিক, পেশাদার, দ ও জবাবদিহিমূলক একটি বিশেষায়িত ইউনিট প্রয়োজন। মতা প্রয়োগে স্বচ্ছতা, তদারকি ও কার্যকর জবাবদিহিতা নিশ্চিত করার কথাও বলা হয়েছে।

বিলের ৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘পুলিশ বাহিনীর আওতাধীন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি) নামে একটি বিশেষায়িত ইউনিট থাকিবে।’ সরকার প্রয়োজন অনুযায়ী পুলিশ ও অন্যান্য শৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তা, আর্মড পার্সোনেল ও কর্মচারী পদায়ন বা প্রেষণে নিয়োগের মাধ্যমে ইউনিট গঠন করবে। এর সদর দফতর থাকবে ঢাকায়।

এসআরবির একজন মহাপরিচালক থাকবেন। বাংলাদেশ পুলিশের অন্যূন অতিরিক্ত পুলিশ মহাপরিদর্শক পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে সরকার তাকে নিয়োগ দেবে। তিনি ইউনিটের প্রশাসনিক, আর্থিক ও অপারেশনাল মতা প্রয়োগ করবেন।

যেসব দায়িত্ব থাকবে :

বিলের ১০ ধারায় এসআরবির দায়িত্বের মধ্যে জননিরাপত্তা রা, সন্ত্রাস ও সঙ্ঘবদ্ধ অপরাধ দমন, বেআইনি অস্ত্র, গোলাবারুদ ও বিস্ফোরক উদ্ধার, মাদক, সাইবার অপরাধ, গুম ও ভূমিদস্যুতার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথা বলা হয়েছে।

এ ছাড়া নারী ও শিশু নির্যাতন, ধর্ষণ, মানবপাচার, অপহরণসহ মানবতাবিরোধী কাজে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা, আইনশৃঙ্খলা-সংক্রান্ত গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহ এবং অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে সহায়তা করবে ইউনিটটি। আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শকের নির্দেশে এসব অপরাধের তদন্তও করতে পারবে এসআরবি।

তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের মতা

বিলের ১২ ধারায় এসআরবিকে কোনো স্থানে প্রবেশ, তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেফতারের মতা দেয়া হয়েছে। তবে এসব মতা ফৌজদারি কার্যবিধি ও প্রচলিত অন্যান্য আইন অনুসরণ করে প্রয়োগ করতে হবে।

১৩ ধারায় ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্তকারী কর্মকর্তার মতা ও দায়িত্ব ইউনিটের সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কর্মকর্তাকে দেয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে গ্রেফতার করা ব্যক্তি বা জব্দ করা আলামত এসআরবির কাছে রাখা যাবে না। বিলের ১৪ ধারায় বলা হয়েছে, ‘গ্রেফতারকৃত ব্যক্তিকে বা জব্দকৃত আলামত অবিলম্বে নিকটবর্তী থানা কর্তৃপরে হেফাজতে সোপর্দ বা হস্তান্তর করিবেন।’

ফৌজদারি অপরাধের তদন্ত

আদালত, সরকার বা পুলিশ মহাপরিদর্শক এসআরবি মহাপরিচালককে কোনো ফৌজদারি অপরাধ তদন্তের নির্দেশ দিতে পারবেন। মহাপরিচালক সাব-ইন্সপেক্টর বা তার ঊর্ধ্ব পদমর্যাদার কোনো সদস্যকে তদন্তের দায়িত্ব দিতে পারবেন। তদন্তের েেত্র ফৌজদারি কার্যবিধি ও সংশ্লিষ্ট বিধিবিধান অনুসরণ করতে হবে।

শৃঙ্খলা লঙ্ঘন ও শাস্তি

বিলের ১৭ ধারায় কর্তব্যরত অবস্থায় মাতাল বা নেশাগ্রস্ত থাকা, সহকর্মীকে আঘাত বা অসদাচরণ, অনুমতি ছাড়া দায়িত্বস্থল ত্যাগ, আটক বা গ্রেফতার থেকে পালানো এবং ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার আইনসঙ্গত আদেশ অমান্য করাকে শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

এ ছাড়া দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতা, অস্ত্র-গোলাবারুদ বা সরঞ্জাম তি বা হারানো, বলপূর্বক অর্থ আদায়, বেআইনিভাবে জমি দখল, সম্পদ চুরি বা ধ্বংস, অপরাধীকে আটক করতে ব্যর্থ হওয়া এবং জুয়া বা অবৈধ মাদকের সাথে জড়িত হওয়াও শৃঙ্খলা লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে।

শাস্তি হিসেবে বরখাস্ত, অপসারণ, বাধ্যতামূলক অবসর, পদাবনতি, পদোন্নতি বন্ধ, বেতন-ভাতা বা জ্যেষ্ঠতা বাজেয়াপ্ত এবং বেতন বৃদ্ধি স্থগিতের বিধান রাখা হয়েছে। লঘুদণ্ড হিসেবে জরিমানা, তিরস্কার, কোয়ার্টার গার্ডে আটক এবং অতিরিক্ত ড্রিলের বিধান রয়েছে। আত্মপ সমর্থনের সুযোগ না দিয়ে কোনো সদস্যকে শাস্তি দেয়া যাবে না।

বিভাগীয় আদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিলের সুযোগ থাকবে। আপিলের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হবে।

অভিযোগ প্রতিকার কমিটি

এসআরবি সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত অভিযোগ এবং বাহিনীর সদস্যদের অভ্যন্তরীণ সংােভ নিরসনে অভিযোগ প্রতিকার কমিটি গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। এতে এসআরবির কর্মকর্তা, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও পুলিশ সদর দফতরের প্রতিনিধি, বিচার বিভাগীয় কর্মকর্তা এবং মানবাধিকার সংরণ ও বাস্তবায়নে অভিজ্ঞ একজন ব্যক্তি থাকবেন।

বিরোধী সদস্যদের আপত্তি ছিল, অভিযোগ প্রতিকার কমিটির নেতৃত্বে এসআরবির কর্মকর্তারা থাকায় এর স্বাধীনতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে। তারা অবসরপ্রাপ্ত হাইকোর্ট বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিটি এবং জাতীয় মানবাধিকার কমিশন, বার কাউন্সিল, মানবাধিকারকর্মী ও সাংবাদিকদের প্রতিনিধিত্ব রাখার প্রস্তাব দেন।

আটকের বিষয়ে বিধান

বিলে শৃঙ্খলা লঙ্ঘনের অভিযোগ বা আশঙ্কার যৌক্তিক কারণ থাকলে সদস্যকে আটক করার মতা রাখা হয়েছে। কোনো সদস্য ১৫ দিনের বেশি আটক থাকলে প্রতি সাত দিন অন্তর ঊর্ধ্বতন কর্তৃপরে কাছে প্রতিবেদন দেয়ার বিধান রয়েছে। ‘আটককৃত সদস্যের বিরুদ্ধে প্রাথমিক কোনো প্রমাণ না থাকিলে তাহাকে অবিলম্বে মুক্তি দিতে হইবে।’

বিরোধী সদস্যরা বেসামরিক ব্যক্তিকে কোথায় ও কতণ আটক রাখা যাবে, সে বিষয়ে স্পষ্ট সময়সীমা নির্ধারণের দাবি জানান। প্রতিটি হাজতখানা ও জিজ্ঞাসাবাদ করে তথ্য গেজেটে প্রকাশ এবং হেফাজতের বিস্তারিত রেজিস্টার সংরণের প্রস্তাবও দেন তারা।

প্রশিণ ও বেআইনি আদেশ

বিলে এসআরবির সদস্যদের প্রশিণের বিধান থাকলেও প্রশিণের মেয়াদ ও মানদণ্ড পরে বিধির মাধ্যমে নির্ধারণের কথা বলা হয়েছে। বিরোধী সদস্যরা প্রশিণ শেষ করে সনদ না পাওয়া পর্যন্ত ফৌজদারি তদন্তের মতা না দেয়ার প্রস্তাব করেন। একই সাথে বেআইনি আদেশ মানতে অস্বীকারকারী বা বেআইনি কর্মকাণ্ডের তথ্য দেয়া সদস্যদের সুরার বিষয়েও তারা স্পষ্ট বিধানের দাবি জানান।

র‌্যাবের সম্পদ-জনবল এসআরবিতে

আইন কার্যকর হওয়ার সাথে র‌্যাব গঠনসংক্রান্ত সংশ্লিষ্ট বিধান রহিত হবে। তবে র‌্যাবের জনবল, আদেশ, মতা, বিদ্যমান সুবিধা, তহবিল, নগদ ও ব্যাংকের অর্থ, দায়, চুক্তি, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি, হিসাববহি, রেজিস্টার, রেকর্ডপত্র ও সংশ্লিষ্ট দলিল এসআরবির অনুকূলে ‘তৎণাৎ স্থানান্তরিত এবং ন্যস্ত বা অর্পিত’ হবে।