চট্টগ্রাম-২ (ফটিকছড়ি) আসন
অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় নির্বাচনে সহিংসতার আশঙ্কা
Printed Edition
মুহাম্মদ ফজল করিম ফটিকছড়ি (চট্টগ্রাম) থেকে
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের দিনক্ষণ যতই ঘনিয়ে আসছে, চট্টগ্রামের ফটিকছড়ি উপজেলায় লুণ্ঠিত অবৈধ আগ্নেয়াস্ত্র উদ্ধার না হওয়ায় জনমনে গভীর উদ্বেগ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। এ আসনের প্রার্থী ও সাধারণ ভোটাররা প্রতিনিয়ত শঙ্কা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন। প্রার্থীরা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে অবিলম্বে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে অস্ত্র উদ্ধারের জোর দাবি জানিয়েছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, এমন পরিস্থিতি নির্বাচনী মাঠে সহিংসতার মাত্রা বাড়িয়ে দিতে পারে, যা ভোটের সার্বিক পরিবেশ ও আইনশৃঙ্খলাকে মারাত্মকভাবে বিঘিœত করবে। ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানের দিন থানা ও বিভিন্ন স্থাপনা থেকে লুট হওয়া বিপুলসংখ্যক আগ্নেয়াস্ত্র এখনো উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ। এসব অস্ত্র অপরাধী চক্রের হাতে পড়ে হত্যা, ডাকাতি, ছিনতাই, চাঁদাবাজিসহ নানা অপরাধে ব্যবহৃত হচ্ছে।
স্থানীয় সূত্র জানায়, লুট হয়ে যাওয়া অস্ত্রগুলো এখনো অপরাধীদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে, যার ফলে গত দেড় বছরে ফটিকছড়িতে আগ্নেয়াস্ত্র-সংশ্লিষ্ট অপরাধের সংখ্যা উদ্বেগজনক হারে বেড়েছে। এ যাবৎ একুশটিরও বেশি গুরুতর অপরাধের ঘটনা ঘটছে, যা এ আসনের প্রার্থী ও ভোটারদের সবচেয়ে উদ্যোগের কারণ।
গত দেড় বছরে উল্লেখযোগ্য ঘটনাগুলোর মধ্যে রয়েছে- ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আলমগীর আলম (৪০) ও জাহাঙ্গীর আলম (৪৫) নামে দুই সহোদরকে মব সৃষ্টি করে পিটিয়ে হত্যা; ২৯ নভেম্বর নিখোঁজের ১৩ দিন পর তাবাচ্ছুম (৬) নামে এক শিশুর লাশ উদ্ধার; ২০২৫ সালের ৯ জানুয়ারি বালু উত্তোলনে বাধা দেয়ায় দুলায়েত হোসেনকে (৬০) পিটিয়ে হত্যা; ১২ জানুয়ারি পারিবারিক কলহে আনিকা আক্তার (১৮) নিহত; ১ ফেব্রুয়ারি আধিপত্য বিস্তারের জেরে মো: শহীদকে (৩২) পিটিয়ে হত্যা; ২৭ ফেব্রুয়ারি নিখোঁজের দুই দিন পর অটোচালক মো: বেলাল উদ্দিনের (৪৫) গলাকাটা লাশ উদ্ধার; ৩ এপ্রিল মো: মাসুম (৩৩) খুন হন; একই দিনে তন্ময় রায়কে (১৩) কুপিয়ে হত্যা; ৬ এপ্রিল জুলেখা খাতুন (৫৫) নিজ ছেলের হাতে খুন হন; ৫ জুলাই মো: জাহাঙ্গীর আলমের (৫৫) লাশ উদ্ধার; একই দিনে সুপ্তা মাজিকে (১৫) কুপিয়ে হত্যা; ১৮ জুলাই মো: এনামের (৬০) লাশ উদ্ধার; ২০ জুলাই ট্যাক্সিচালক সন্তোষ নাথের (৪০) হাত-পা বাঁধা লাশ উদ্ধার; ২২ জুলাই মো: আরমানের (২৮) লাশ উদ্ধার; ৫ আগস্ট এনজিও পরিচালক মোহাম্মদ জসীম উদ্দীনকে (৩৮) অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়; ৮ আগস্ট আবুল মনছুরের (৪৫) গলাকাটা লাশ উদ্ধার; ৯ আগস্ট কিশোর সাজু ত্রিপুরাকে (১৭) অপহরণ; ১৫ নভেম্বর আব্দুল্লাহ আল মাসুদকে (৩২) পিটিয়ে হত্যা এবং সর্বশেষ ২০২৬ সালের ১০ জানুয়ারি দুর্বৃত্তের গুলিতে জামাল উদ্দিন নিহত এবং নাসির উদ্দিন গুলিবিদ্ধ। এসব ঘটনা অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার ও অপরাধের বাড়বাড়ন্তকে স্পষ্ট করে তুলছে।
জামায়াতে ইসলামী মনোনীত দাঁড়িপাল্লার প্রার্থী অধ্যক্ষ নুরুল আমিন বলেন, ‘নির্বাচনের আগে অবৈধ অস্ত্রের বিস্তার একটি ভয়াবহ পরিস্থিতির ইঙ্গিত দিচ্ছে। রাজনৈতিক সহিংসতা বাড়লে সাধারণ ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যেতে ভয় পাবে। লুণ্ঠিত অস্ত্র উদ্ধারে ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতিকে দুর্বল করছে। সম্প্রতির লেলাং ইউনিয়নে দুর্বৃত্তের গুলিতে জামায়াতকর্মী নিহতের ঘটনায় প্রশাসন কোনোভাবে দায় এড়াতে পারে না।’ তিনি অবিলম্বে কার্যকর অভিযান চালিয়ে অস্ত্র উদ্ধারের পাশাপাশি সব প্রার্থীর জন্য সমান নিরাপত্তা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান।
বিএনপি মনোনীত ধানের শীষ প্রতীকের প্রার্থী সরওয়ার আলমগীর একই উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, ‘বারবার অনুরোধ সত্ত্বেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কার্যকর পদক্ষেপ নেয়নি। আমরা নির্বাচনী প্রচারণায় প্রতিনিয়ত আতঙ্কের মধ্যে রয়েছি। ফটিকছড়িতে প্রচুর অবৈধ অস্ত্র আছে। অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার না হলে নির্বাচন ঘিরে সহিংসতার মাত্রা বাড়বে এবং ভোটাররা ভোটকেন্দ্রে যাওয়ার আগ্রহ হারাবেন।’ তিনি প্রশাসনের ব্যর্থতার অভিযোগ তুলে অতিদ্রুত অভিযান পরিচালনার দাবি জানান।
হাটহাজারী সার্কেলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার কাজী মো: তারেক আজিজ বলেন, ‘লুট হওয়া অস্ত্র উদ্ধার এবং নির্বাচনকে ঘিরে আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। নিয়মিত অভিযান চলমান রয়েছে এবং গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে সন্দেহভাজনদের নিবিড় নজরদারিতে রাখা হয়েছে। নির্বাচনী এলাকায় চেকপোস্ট ও টহল জোরদার করা হয়েছে এবং যেকোনো সহিংসতা কঠোরভাবে দমন করা হবে।’ তিনি সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে সবার কাছে সহযোগিতা কামনা করছেন।