বিক্রয়চাপ সামলে ফের ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজার

ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি

Printed Edition
artho-1
বিক্রয়চাপ সামলে ফের ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজার

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

বিক্রয়চাপের মাধ্যমে সৃষ্ট অস্থির আচরণ শেষ হয়েছে পুঁজিবাজারের। গতকাল সপ্তাহের দ্বিতীয় কর্মদিবসে এসে তারই ইঙ্গিত দিলো দেশের দুই পুঁজিবাজার। বড় কোনো বিক্রয়চাপ ছাড়াই সোমবারের লেনদেন শেষ করে দেশের দুই পুঁজিবাজার। গত ১৫ ফেব্রুয়ারির দুই পুঁজিবাজার সূচকের রেকর্ড উন্নতির পর টানা সংশোধনের মধ্য দিয়ে পার করছিল বাজারগুলো। এ কয়দিন লেনদেনের প্রায় পুরোটা সময়জুড়েই বিক্রয়চাপে অস্থির হয়ে থাকতো পুঁজিবাজারগুলো। গতকাল লেনদেনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত এ চাপ সামলে ফের ঘুরে দাঁড়াল পুঁজিবাজার।

প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জের (ডিএসই) প্রধান সূচক ডিএসইএক্স গতকাল ৮৫ দশমিক ২৩ পয়েন্ট বৃদ্ধি পায়। ৫ হাজার ৪৬৭ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট থেকে সকালে লেনদেন শুরু করা সূচকটি সোমবার দিনশেষে পৌঁছে যায় ৫ হাজার ৫৫৩ দশমিক ০৭ পয়েন্টে। এ সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক ডিএসই-৩০ ও ডিএসই শরিয়াহর উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ৩৩ দশমিক ৩০ ও ১১ দশমিক ৮৪ পয়েন্ট। অনুরূপভাবে দেশের দ্বিতীয় পুঁজিবাজার চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) প্রধান সূচক সিএএসপিআই গতকাল ১৫০ দশমিক ৯৭ পয়েন্ট উন্নতি ধরে রাখে। একই সময় বাজারটির দুই বিশেষায়িত সূচক সিএসই-৩০ ও সিএসসিএক্স সূচকের উন্নতি ঘটে যথাক্রমে ২১৩ দশমিক ৭৩ ও ৯৮ দশমিক ৭৮ পয়েন্ট।

পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, গত কিছুদিন ধরে বাজারে যে সংশোধন চলে আসছিল তা হয়তো শেষ হয়েছে। এ কারণে নতুন করে ইতিবাচক ধারায় ফিরছে পুঁজিবাজার। তারা মনে করেন, গত ১৫ ফেব্রুয়ারি ডিএসইর প্রধান সূচকটির ২০০ পয়েন্ট উন্নতি ঘটে। পরবর্তী চারটি কর্মদিবসে আবার ১৩৫ পয়েন্টে বেশি হারায় সূচকটি। এতে বাজারের মূল্যস্তরে যে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটেছিল তা থেকে বিনিয়োগকারীরা প্রত্যাশিত মুনাফা তুলে নিয়েছেন। এ ছাড়া নতুন সরকার আসায় বিভিন্ন ক্ষেত্রে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পাওয়ারও সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এর অংশ হিসেবে সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীদের একটি অংশও নতুন করে বাজারে অবস্থান নিচ্ছেন। গতকালের বাজার আচরণ তারই ইঙ্গিত দিচ্ছে। বড় কোনো ঘটনা না ঘটলে এ যাত্রায় ভালো কিছু আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।

সোমবার লেনদেনের শুরুতেই ঊর্ধ্বমুখি ছিল দুই পুঁজিবাজার সূচক। এর আগে রোববার দিনভর ওঠানামার মধ্যে সূচকের অস্থির আচরণ দেখা গেলেও দিনশেষে পতন কাটিয়ে ওঠাই সর্বপর্যায়ের বিনিয়োগকারীদের কাছে ইতিবাচক বার্তা ছিল। তাই লেনদেনের শুরু থেকেই বিনিয়োগকারীরা গতকাল এক প্রকার ঝাঁপিয়ে পড়েন। লেনদেন শুরুর আধঘণ্টা না পেরোতেই ঢাকা শেয়ার বাজারের প্রধান সূচকটির উন্নতি ঘটে ৮২ পয়েন্টের বেশি। এরপর সাময়িকভাবে কিছুটা নিম্নমুখী হলেও বেলা ১২টার পর আবার ঊর্ধ্বমুখী আচরণ শুরু করে সূচকটি। আর এভাবেই সূচকের বড় উন্নতি ধরে রেখেই লেনদেন শেষ করে দেশের প্রধান পুঁজিবাজারটি।

বিনিয়োগকারীরাও গতকালের বাজার আচরণে বেশ সন্তোষ প্রকাশ করেছেন। গতকাল মতিঝিলে অবস্থিত বিভিন্ন ব্রোকার হাউজ ও মার্চেন্ট ব্যাংকের ট্রেডিং ফ্লোরগুলোতে গিয়ে দেখা যায় প্রায় সবগুলো হাউজেই বিনিয়োগকারীদের উপস্থিতি ছিল বেশ ভালো। আর তাদের বেশির ভাগই বেশ উৎসাহ নিয়েই বেচাকেনায় অংশ নিচ্ছেন। এসব কোম্পানির শেয়ারে মুনাফা পাচ্ছেন তা বিক্রয় করে অপেক্ষাকৃত কম মূল্যস্তরে থাকা শেয়ারে বিনিয়োগ করছেন। এদের কয়েকজনের সাথে বাজার পরিস্থিতি নিয়ে আলাপ করলে তারা নয়া দিগন্তকে বাজার আচরণ নিয়ে তাদের সন্তুষ্টির কথা জানান।

এ দিকে গতকাল দেশের দুই পুঁজিবাজারেই লেনদেনে অংশ নেয়া কোম্পানিগুলোর বেশির ভাগই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় জায়গা করে নেয়। বড় কোনো বিক্রয়চাপ না থাকায় সবগুলো খাতেই এ মূল্যবৃদ্ধি ঘটে। কোনো কোনো খাতে দামি বেড়েছে শতভাগ কোম্পানির। তবে বরাবরের মতো গতকালও সূচকের বড় ধরনের উন্নতির পেছনে বেশি ভূমিকা ছিল ব্যাংক, বীমা ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মতো বড় মূলধনের কোম্পানিগুলোর। এ ছাড়া ঢাকা শেয়ারবাজারে সবগুলো খাতেই মূল্যবৃদ্ধির তালিকায় ছিল প্রায় ৯০ শতাংশ কোম্পানি। একই সময় অন্যান্য খাতের মৌলভিত্তিসম্পন্ন কোম্পানিগুলো কয়েক দিনের হারানো দরের একটি অংশ ফিরে পায় যা দুই বাজার সূচককে সাবলীলভাবে এগিয়ে নেয়। ঢাকা শেয়ারবাজারে লেনদেনে অংশ নেয়া ৩৯০টি কোম্পানি ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ৩৪৭টির মূল্যবৃদ্ধির বিপরীতে দর হারায় মাত্র ২১টি। এ ছাড়া ২২টি কোম্পানি ও ফান্ডের দর ছিল অপরিবর্তিত অপর দিকে চট্টগ্রাম শেয়ারবাজারে লেনদেন হওয়া ১৬৬টি সিকিউরিটিজের মধ্যে দাম বাড়ে ১০৫টির, দর হারায় ৪০টি এবং দর অপরিবর্তিত থাকে ২১টির।

গতকাল ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল ব্যাংকিং খাতের সিটি ব্যাংক। ৪৫ কোটি ৫৭ লাখ টাকায় কোম্পানিটির ১ কোটি ৫০ লাখ ৮৯ হাজার শেয়ার হাতবদল হয় গতকাল। ২৭ কোটি ৫৩ লাখ টাকার শেয়ার বেচাকেনা করে একই খাতের ব্র্যাক ব্যাংক ছিল দ্বিতীয় অবস্থানে। ডিএসইর লেনদেনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, খান ব্রাদার্স পিপি ওভেন ব্যাগ, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, রবি অজিয়াটা, বিডি থাই ফুডস, স্কয়ার ফার্মাসিউটিক্যালস, ইস্টার্ন ব্যাংক ও সায়হাম কটন মিলস।

সোমবার ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ কোম্পানি ছিল জ¦ালানি খাতের কোম্পানি এনার্জি প্যাক পাওয়ার জেনারেশন। কোম্পানিটির মূল্যবৃদ্ধির হার ছিল ৯ দশমিক ৪৯ শতাংশ। ৭ দশমিক ৬৯ শতাংশ মূল্যবৃদ্ধি পেয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে জায়গা করে নেয় পিএইচপি ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড। ডিএসইর মূল্যবৃদ্ধিতে শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে বিডি থাই ফুডস, জনতা ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এবি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, আইএফআইসি ব্যাংক ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এশিয়াটিক ল্যাবরেটরিজ, এলআর গ্লোবাল ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ড, এমএল ডাইং ও ক্রিস্টাল ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি লি:।

ডিএসইতে দিনের দরপতনের শীর্ষ কোম্পানি ছিল বসুন্ধরা গ্রুপের মেঘনা সিমেন্ট। কোম্পানিটি ৫ দশমিক ৪৪ শতাংশ দর হারায় গতকাল। ২ শতাংশ দর হারিয়ে এ তালিকার দ্বিতীয় স্থানে ছিল আইসিবি এমপ্লয়িজ মিউচুয়াল ফান্ড। গতকাল ডিএসইর দরপতনের শীর্ষ দশ কোম্পানির অন্যগুলো ছিল যথাক্রমে ঝিল বাংলা সুগার মিলস, স্ট্যান্ডার্ড ব্যাংক, আইসিবি অগ্রণী মিউচুয়াল ফান্ড, সামিট অ্যালাইয়েন্স পোর্ট, প্রাইম ফিন্যান্স ফার্স্ট মিউচুয়াল ফান্ডসিএপিএম বিডিবিএল মিউচুয়াল ফান্ড, খুলনা পাওয়ার কোম্পানি ও বাটা সু।