দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর সফরের সফলতা নির্ভর করছে

চীনের সাথে সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হলো

সার্বিকভাবে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেয়া রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর সফরের সফলতা নির্ভর করছে বলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে যেকোনো দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে। তবে এটি যাতে অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

কূটনৈতিক প্রতিবেদক
Printed Edition
Tareq Rahman-china visit

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সদ্য সমাপ্ত চীন সফরে দেশটির বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (জিডিআই) সাথে বাংলাদেশে যুক্ত হয়েছে। কূটনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ২+২ কৌশলগত সংলাপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখাতে দুই দেশ সম্মত হয়েছে। চীন তিস্তা নদী সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও পুনরুদ্ধার প্রকল্পে তার সামর্থ্য অনুযায়ী সমর্থন ও সহায়তা দেবে। প্রকল্পের সম্ভাব্যতা সমীক্ষা ও সংশ্লিষ্ট কাজ ত্বরান্বিত করতে উভয় দেশের বিশেষজ্ঞরা কাজ করবে। উভয় পক্ষ যৌথভাবে মংলা বন্দর পরিকাঠামো আধুনিকীকরণ ও সম্প্রসারণ প্রকল্প এবং চট্টগ্রামে চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের উন্নয়নে কাজ এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে। চীন জাতিসঙ্ঘের মতো বহুপক্ষীয় প্রতিষ্ঠানে বাংলাদেশের বৃহত্তর ভূমিকা পালনে, উদীয়মান অর্থনীতির দেশগুলোর জোট ব্রিকসে বাংলাদেশের অংশগ্রহণে এবং সাংহাই সহযোগিতা সংস্থার অংশীদার হওয়ার আবেদনে সমর্থন জুগিয়েছে। সার্বিকভাবে দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেয়া রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর সফরের সফলতা নির্ভর করছে বলে কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন। তাদের মতে, বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে যেকোনো দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে। তবে এটি যাতে অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে অর্জনের ওপর আলোকপাত করে দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ গতকাল নয়া দিগন্তের সাথে আলাপকালে বলেন, সরকার প্রধান পর্যায়ের সফরই যেকোনো দেশের জন্য বড় অর্জন হিসেবে বিবেচিত হয়। প্রধানমন্ত্রীর চীন সফরে দুই দেশের সম্পর্কে নতুন মাত্রা যোগ হলো। এই সফরের সময় যে ১৭টি সমঝোতা স্মারক (এমওইউ) সই হয়েছে, সেগুলো অর্জনের একটি চিত্র তুলে ধরে। তিনি বলেন, বাংলাদেশে ও চীনের মধ্যে আগে থেকেই গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলোতে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক ছিল। এবারের সফরে বাণিজ্য, অর্থনীতি, বিনিয়োগ, শিক্ষা, কৃষি গবেষণা, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি প্রভৃতি ক্ষেত্রে সহযোগিতা আবারো বাড়ানোর ব্যাপারে আলোচনা হয়েছে। এই সফরে বিশেষ করে রোহিঙ্গা সঙ্কট সমাধানে দুই দেশের একসাথে কাজ করার কথা বলা হয়েছে। এই ইস্যুতে মিয়ানমারকে সাথে নিয়ে বাংলাদেশের সাথে ত্রিপক্ষীয় আলোচনার উদ্যোগ চীন নিয়েছিল। কিন্তু মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক ধারায় ছেদ পড়া এবং রাখাইনে সশস্ত্র সঙ্ঘাতের কারণে এই উদ্যোগ আশানুরূপ ফল আনতে পারেনি। চীন এ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। প্রধানমন্ত্রীর সফরে চীনের বৈশ্বিক উন্নয়ন উদ্যোগের (জিডিআই) সাথে বাংলাদেশে যুক্ত হয়েছে। এর আগে দেশটির বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভে (বিআরআই) বাংলাদেশ যুক্ত হয়েছিল।

দুই দেশের শীর্ষ পর্যায় থেকে দেয়া রাজনৈতিক দিকনির্দেশনা বাস্তবায়নের ওপর সফরের সফলতা নির্ভর করছে উল্লেখ করে রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিং পিংয়ের সাথে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বৈঠকে পর দেয়া যৌথ ইশতেহারে নানাবিধ ইস্যুতে ইচ্ছা প্রকাশ ও অঙ্গীকার করা হয়েছে। এই ইশতেহার বাস্তবায়নের সময়ই বোঝা যাবে আসলে দুই দেশ কতটা অর্জন করতে পেরেছে। বিশ্বের যে কয়টি দেশের সাথে বাংলাদেশের সবচেয়ে বিস্তৃত সম্পর্ক রয়েছে, তার মধ্যে চীন অন্যতম। অবকাঠামো, বিদ্যুৎ উৎপাদন, নদী শাসন ইত্যাদি ক্ষেত্রে বাংলাদেশকে দেয়া চীনের সহায়তা অব্যাহত থাকবে। চীনের সহযোগিতায় তিস্তা মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়নের বিষয়টি আলোচনা হয়েছে। তবে এ ব্যাপারে চীন কতটা কী করতে পারবে, সে সব খুঁটিনাটি বিষয় খতিয়ে দেখার জন্য সময় প্রয়োজন।

বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজের (বিআইআইএসএস) সাবেক এই চেয়ারম্যান বলেন, প্রধানমন্ত্রীর সফরে কূটনীতি ও প্রতিরক্ষার ক্ষেত্রে ২+২ কৌশলগত সংলাপের সম্ভাবনা খতিয়ে দেখার বিষয়টি এসেছে। এ ধরনের সংলাপ অন্যান্য দেশের মধ্যেও রয়েছে। বেশ আগে থেকেই বাংলাদেশের সমরাস্ত্রের সবচেয়ে বড় উৎস চীন। তাই চীনের সাথে কৌশলগত সংলাপের সম্ভাবনা স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখতে হবে। তিনি বলেন, বিশ্বের সব বৃহৎ শক্তির সাথে আমাদের মিলেমিশে কাজ করতে হবে। চীনের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে গিয়ে আমরা যদি অন্য কাউকে অবহেলা করি, সেটা আমাদের জন্য ক্ষতি হবে। বিশেষ করে ভারতের ভৌগোলিক অবস্থান আমাদের তিন দিকে রয়েছে। তাই ভারতের সাথে শক্রতা করে বা ভারতকে উপেক্ষা করে আমাদের জন্য স্থিতিশীলতা পরিবেশে উন্নয়নের অভীষ্ট লক্ষ্যে পৌঁছানো কঠিন হয়ে যাবে। ভারতের সাথে যেসব ক্ষেত্রে কাজ করার সুযোগ রয়েছে, তা আমরা হারাতে চাই না। সে জন্য অন্য রাষ্ট্র সম্পর্কে বক্তব্যে আমাদের আরো সতর্ক হওয়া প্রয়োজন।

চীন থেকে দূরে থাকার জন্য মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যকে ‘অকূটনৈতিকসুলভ’ হিসেবে আখ্যায়িত করে রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমেদ বলেন, বাংলাদেশের নিজ স্বার্থে যেকোনো দেশের সাথে সম্পর্ক রাখতে পারে। তবে এটি যাতে অন্য কোনো দেশের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে বাধা হয়ে না দাঁড়ায়, সেদিকে লক্ষ রাখতে হবে।

জিডিআই : চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং ২০২১ সালের সেপ্টেম্বরে জাতিসঙ্ঘ সাধারণ পরিষদের ৭৬তম অধিবেশনে গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট ইনিশিয়েটিভ (জিডিআই) ঘোষণা করেন। এর মূল লক্ষ্য হচ্ছে জাতিসঙ্ঘের ২০৩০ সালের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা জোরদার করা এবং উন্নয়নশীল দেশগুলোর উন্নয়ন সক্ষমতা বাড়ানো। জিডিআইয়ের আওতায় আটটি অগ্রাধিকার খাত নির্ধারণ করা হয়েছে। এগুলো হলো, দারিদ্র্য বিমোচন, খাদ্যনিরাপত্তা, মহামারী মোকাবেলা ও ভ্যাকসিন সহযোগিতা, উন্নয়ন অর্থায়ন, জলবায়ু পরিবর্তন ও সবুজ উন্নয়ন, শিল্পায়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি ও সংযোগ এবং অবকাঠামো উন্নয়ন। চীন বলছে, জিডিআই কোনো সামরিক বা নিরাপত্তা জোট নয় বরং এটি উন্নয়ন সহযোগিতাকেন্দ্রিক একটি আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্ম। এখন পর্যন্ত ১০০টির বেশি দেশ ও আন্তর্জাতিক সংস্থা জিডিআইকে সমর্থন জানিয়েছে। এ ছাড়া জাতিসঙ্ঘে গঠিত ‘গ্রুপ অব ফ্রেন্ডস অব জিডিআই’-এ ৮০টির বেশি দেশ অংশ নিয়েছে। জিডিআই ধীরে ধীরে একটি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন প্ল্যাটফর্মে পরিণত হচ্ছে।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলাদেশ আনুষ্ঠানিকভাবে জিডিআইতে যুক্ত হওয়ায় ঢাকা-বেইজিং সম্পর্ক নতুন মাত্রা পাবে এবং উন্নয়ন সহযোগিতার নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করবে। তবে একই সাথে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক ভূরাজনীতির ভারসাম্য রক্ষার চ্যালেঞ্জও বাংলাদেশের সামনে থাকবে।