হালুয়াঘাটে সেচ সঙ্কটে বোরো চাষে বিপর্যয়
অনাবাদি ২ হাজার হেক্টর জমিতে ১২ হাজার টন ধান হারানোর আশঙ্কা
Printed Edition
মো: সাজ্জাতুল ইসলাম ময়মনসিংহ
হালুয়াঘাট উপজেলায় তীব্র সেচ সঙ্কটে চলতি বোরো মৌসুমে ধান উৎপাদনে বড় ধরনের ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর অস্বাভাবিকভাবে নিচে নেমে যাওয়ায় উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় চাষাবাদ ব্যাহত হচ্ছে। সরকারি হিসাব অনুযায়ী অন্তত দুই হাজার ১৬৯ হেক্টর জমি অনাবাদি পড়ে রয়েছে। এতে প্রায় ১২ হাজার টন ধান উৎপাদন থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছেন কৃষকরা।
উপজেলা কৃষি দফতর সূত্রে জানা গেছে, হালুয়াঘাটে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ২৫ হাজার ১৯ হেক্টর। চলতি বোরো মৌসুমে ২২ হাজার ৮৫০ হেক্টর জমিতে আবাদ হলেও সেচের অভাবে সদর, কৈচাপুর, জুগলী, ভুবনকুড়া ও গাজীরভিটা ইউনিয়নের বিস্তীর্ণ এলাকা পতিত রয়েছে। তবে মাঠপর্যায়ের কৃষকদের দাবি, প্রকৃত অনাবাদি জমির পরিমাণ সরকারি হিসাবের চেয়েও বেশি।
সেচ সঙ্কটের প্রধান কারণ হিসেবে সামনে এসেছে গভীর নলকূপের অচলাবস্থা। বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন (বিএডিসি) সূত্র জানায়, উপজেলায় স্থাপিত ৭৭টি গভীর নলকূপের মধ্যে বর্তমানে চালু আছে মাত্র ৩৬টি। ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ৪১টি নলকূপ কার্যত অচল হয়ে পড়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, সাধারণত নলকূপের মোটর বসানো হয় প্রায় ৯০ ফুট গভীরে। কিন্তু শুষ্ক মৌসুমে পানির স্তর ১২০ থেকে ১৫০ ফুট নিচে নেমে যাওয়ায় পাম্পগুলো পানি তুলতে পারছে না। প্রযুক্তিগতভাবে এ অবস্থাকে ‘ড্রাই রানিং’ বলা হয়। এ অবস্থায় পাম্প পানির স্তরের ওপরে উঠে যাওয়ায় তার কার্যকারিতা হারায়।
কৃষি বিশেষজ্ঞদের মতে, ভূপ্রকৃতিগত কারণেও সঙ্কট জটিল হয়ে উঠেছে। সীমান্তবর্তী অনেক এলাকায় মাটির নিচে পাথরের স্তর থাকায় নতুন গভীর নলকূপ স্থাপন অত্যন্ত কঠিন ও ব্যয়বহুল। ফলে বিকল্প সেচব্যবস্থা গড়ে তোলাও সীমিত হয়ে পড়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, সীমান্তবর্তী নদীগুলোতে নির্মিত জলকপাট ও রাবারড্যাম প্রত্যাশিত সুফল দিতে পারছে না। যথাযথ পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নের অভাবে এসব প্রকল্পের সুবিধা দেশের অভ্যন্তরের কৃষকরা পুরোপুরি পাচ্ছেন না।
কৃষক রুকন উদ্দিন বলেন, বোরো মৌসুমে পানির অভাবে প্রতি বছরই জমি পতিত রাখতে হয়। সরকারিভাবে নতুন করে গভীর নলকূপ স্থাপন করা গেলে এসব জমি পুনরায় আবাদে আনা সম্ভব। ডাকিয়াপাড়ার কৃষক আতাউর রহমান জানান, শুষ্ক মৌসুমে পানির অভাবের পাশাপাশি বর্ষায় পাহাড়ি ঢলে নদীভাঙনে ঘরবাড়ি ও ফসলের ক্ষতি হয়।
বিএডিসির ময়মনসিংহ সার্কেলের সহকারী প্রকৌশলী ওয়াসিম আকরাম বলেন, পানির স্তর ক্রমাগত হ্রাস পাওয়ায় ২০০০ সালের পর থেকে অন্তত ১২টি গভীর নলকূপ বন্ধ হয়ে গেছে। অতীতে নীতিগত সীমাবদ্ধতায় নতুন নলকূপ বসানো সম্ভব হয়নি। তবে এখন নদীর পানি ব্যবহার করে সেচব্যবস্থার উন্নয়নে উদ্যোগ নেয়া হচ্ছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুর রহমান জানান, সীমান্তবর্তী নদী পুনর্খনন, পানি সংরক্ষণ এবং নতুন গভীর নলকূপ স্থাপনের মাধ্যমে অনাবাদি জমি পুনরায় চাষের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই সেচ ব্যবস্থাপনা ছাড়া এ সঙ্কট থেকে উত্তরণ কঠিন।