যুক্তরাষ্ট্র-ইরানের হামলা পাল্টা হামলা বাড়ছেই

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে হামলা, পাল্টা হামলার ঘটনা বেড়েই চলেছে। আর একে অপরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ অবসানে প্রায় দুই সপ্তাহ আগে স্বাক্ষরিত অন্তর্বর্তী চুক্তি লঙ্ঘনের অভিযোগ করছে। যুক্তরাষ্ট্র ‘সামরিকভাবে কাজটি সম্পন্ন করতে পারে’, প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এমন হুমকি দেয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই রোববার প্রথম কয়েক ঘণ্টায় কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক ঘাঁটিতে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা চালায় ইরান, এর মধ্য দিয়ে ক্রমবর্ধমান আক্রমণের ধারাবাহিকতা বজায় থাকে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।

এর আগে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনী জানিয়েছিল, তারা আবার ইরানে আঘাত হেনেছে। হরমুজ প্রণালীতে একটি ট্যাংকারে হামলা হওয়ার কয়েক ঘণ্টার মধ্যে এ কথা জানিয়েছিল মার্কিন বাহিনী। আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালী ইরানের পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকবে বলে জানিয়েছেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাকচি। গতকাল রোববার আলজাজিরার এক খবরে এ তথ্য জানানো হয়েছে। আরাকচি বলেন, আমি ইরাকের পররাষ্ট্রমন্ত্রীকে ইরানের ওপর চাপিয়ে দেয়া যুদ্ধের সর্বশেষ পরিস্থিতি সম্পর্কে অবহিত করেছি। পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্রের সাথে স্বাক্ষরিত সমঝোতা স্মারকের সাম্প্রতিক অগ্রগতির বিষয়েও তাকে জানিয়েছি। তিনি আরো বলেন, আগামী ৩০ দিন হরমুজ প্রণালী ইরানের পূর্ণ তত্ত্বাবধান ও নিয়ন্ত্রণে থাকবে। সব বাধা দূর করার পর এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের পূর্ণ সক্ষমতা ফিরিয়ে আনা হবে। বর্তমানে আমরা সেটি নিয়েই কাজ করছি। ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, হরমুজ প্রণালীর রক্ষণাবেক্ষণ ও নিরাপত্তার পুরো দায়িত্ব শুধু ইরানের। এ ক্ষেত্রে অন্য কোনো দেশ বা পক্ষের কোনো ধরনের সংশ্লিষ্টতা নেই। তিনি সতর্ক করে দিয়ে বলেন, সমঝোতা স্মারকের আওতায় এ বিষয়টি স্পষ্ট করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের হস্তক্ষেপ বা একতরফা পদক্ষেপ পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলবে এবং প্রণালী ফের খুলে দেয়ার প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে।

হরমুজ প্রণালী বিশ্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি সরবরাহের নৌপথ, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়ার পর যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সাথে চার মাস ধরে চলা যুদ্ধের বেশির ভাগ সময় ইরান এ পথটি কার্যকরভাবে বন্ধ করে রেখেছিল। চলতি মাসের প্রথম দিকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে ১৪ দফার যে অন্তর্বর্তী চুক্তি হয়েছে তাতে লড়াই বন্ধ ও হরমুজ প্রণালী ফের চালু হওয়ার কথা ছিল। আর ইরানের পারমাণবিক প্রকল্পগুলোর মতো আরো গুরুতর বিষয়গুলো নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে বিস্তারিত আলোচনা হওয়ার কথা আছে।

এক সপ্তাহ আগে সুইজারল্যান্ডে যুক্তরাষ্ট্রের ভাইস প্রেসিডেন্ট জে ডি ভ্যান্স ও ইরানের পার্লামেন্টের স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কলিবফের নেতৃত্বে এক পর্ব মধ্যবর্তী আলোচনা হয়ে গেছে। এই আলোচনার পর ওয়াশিংটন তেহরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়, কিন্তু তারপর থেকে লড়াই ও পাল্টাপাল্টি দোষারোপ আবার শুরু হয় ও তীব্র হতে থাকে। ট্রাম্প সামাজিক মাধ্যমে এক পোস্টে বলেন, ‘এমন এক মুহূর্ত আসতে পারে যখন আমরা আর যুক্তিসঙ্গত থাকতে পারব না আর যে কাজটি আমরা অত্যন্ত সফলভাবে শুরু করেছিলাম তা সামরিকভাবে সম্পন্ন করতে বাধ্য হতে পারি। যদি তেমনটি হয় তাহলে ইসলামিক প্রজাতন্ত্র ইরানের আর অস্তিত্ব থাকবে না!’

ট্রাম্পের এই পোস্টের প্রায় আধ ঘণ্টা পর কুয়েতের সেনাবাহিনী জানায়, তাদের বিমান প্রতিরক্ষা ‘শত্রুপক্ষীয়’ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলা প্রতিরোধের চেষ্টা করছে। পাশাপাশি বাহরাইনের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, দেশটিতে আকাশ হামলার সতর্কতা জানিয়ে সাইরেন বাজানো হয়েছে। ইরানের ইসলামিক রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর জানায়, ইরানের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের সাম্প্রতিক হামলার প্রতিক্রিয়ায় তাদের নৌবাহিনী ও বিমান বাহিনী কুয়েত ও বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর যৌথ ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন অভিযান চালিয়েছে।

যুক্তরাষ্ট্রের এক কর্মকর্তা, কুয়েত ও বাহরাইনে তাদের সামরিক স্থাপনাগুলোতে হামলা হয়েছে বলে নিশ্চিত করছেন। তিনি জানিয়েছেন, হামলার পর পরিস্থিতি এখনো পুরোপুরি পরিষ্কার হয়নি তবে যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষে কেউ হতাহত হয়নি আর এই সময় পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন স্থাপনাগুলো বড় ধরনের কোনো ক্ষয়ক্ষতির শিকার হয়নি। এক বিবৃতিতে ইরানের রেভ্যুলুশনারি গার্ড কোর বলেছে, যুক্তরাষ্ট্রের হামলায় যুদ্ধবিরতির লঙ্ঘন হয়েছে আর এর ‘ফলে সব ধরেনের কূটনৈতিক প্রক্রিয়া বন্ধ থাকবে’। ‘আগামী দিনগুলোতে’ পশ্চিম এশিয়ায় মার্কিন সামরিক ঘাঁটিগুলোর ‘নারকীয় অভিজ্ঞতা হবে’ বলে হুঁশিয়ার করেছে তারা।

এর আগে মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড জানায়, শনিবার পানামার পতাকাবাহী একটি ট্যাংকার ইরানের ড্রোন হামলার শিকার হওয়ার পর তারা ফের ইরানের উপকূলীয় এলাকাগুলোতে আঘাত হেনেছে। এক বিবৃতিতে সেন্ট্রাল কমান্ড (সেন্টকম) বলেছে, ‘ইরানকে যুদ্ধবিরতি চুক্তিকে সম্মান জানানোর একটি সুযোগ দেয়া হয়েছিল কিন্তু তারা তা না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।’ তারপর তারা বলেছে, ‘বাণিজ্যিক জাহাজগুলোর বিরুদ্ধে ইরানের আগ্রাসনের সরাসরি জবাব দেয়া হয়েছে।’ ইরানের সামরিক নজরদারি, যোগাযোগ অবকাঠামো, বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা, ড্রোনের গুদাম ও মাইন পাতার ব্যবস্থাগুলোর ওপর আঘাত হানা হয়েছে বলে জানিয়েছে সেন্টকম। ইরানের রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম আইআরআইবি জানিয়েছে, দক্ষিণ ইরানের সিরিকে বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে।

রভ্যুলুশনারি গার্ড বলেছে, “সিরিক লক্ষ্য করে আমেরিকার লক্ষ্যহীন আক্রমণ হরমুজ প্রণালীর উপর আমাদের আধিপত্যের আবসান ঘটাতে পারবে না। কিন্তু লঙ্ঘনকারীদের লক্ষ করে আমাদের ছোড়া গুলি বাকি জাহাজগুলোকে পরিষ্কার যাতায়াতের পথটির কথা মনে করিয়ে দেবে।“

‘সমঝোতা স্মারক থেকে বেরিয়ে যাওয়ার পথ খুঁজছে যুক্তরাষ্ট্র!

তেহরান বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক আহমাদিয়ানের মতে যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের সই করা সেই সমঝোতা স্মারকের তোয়াক্কা না করে নতুন কোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চাইছে। আল-জাজিরাকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে এই হুঁশিয়ারি দিয়েছেন তিনি। তার মতে ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে চলমান পাল্টাপাল্টি হামলা একটি ‘ডোমিনো এফেক্টে’র [একটি ঘটনার জেরে ধারাবাহিক ঘটনা] সূত্রপাত করতে পারে, যা দুই দেশের মধ্যে সংঘাতকে চূড়ান্ত উত্তেজনার দিকে নিয়ে যাবে। হাসান আহমাদিয়ান মনে করেন, এই সংঘাত আরো বড় আকার ধারণ করবে। তিনি বলেন, ‘আমি মনে করি আমরা একটি চরম উত্তেজনার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি। কারণ, এটি স্পষ্ট যে ইরানিরা এই হামলার পাল্টা জবাব দেবে।’ দুই দেশের মধ্যকার সমঝোতা স্মারকের (এমওইউ) প্রসঙ্গ টেনে তিনি বলেন, ‘সমঝোতা স্মারকের ৫ নম্বর অনুচ্ছেদে স্পষ্টভাবে উল্লেখ আছে যে, প্রথম ৬০ দিন ইরান বাণিজ্যিক জাহাজের নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করবে। এরপর ইরান ও ওমান যৌথভাবে এই নিরাপত্তা নিশ্চিতের দায়িত্ব পালন করবে।’ আহমাদিয়ানের দাবি, যুক্তরাষ্ট্র এখন নিজের সই করা সেই সমঝোতা স্মারকের তোয়াক্কা না করে নতুন কোনো ব্যবস্থা চাপিয়ে দিতে চাইছে। তিনি বলেন, ‘আমরা যা দেখছি তা হলো- যুক্তরাষ্ট্র এই সমঝোতা স্মারক থেকে বেরিয়ে আসার পথ খুঁজছে, অথচ তারা ইরানকে চুক্তির শর্তগুলো মেনে চলতে বাধ্য করছে।’

তিনি আরো উল্লেখ করেন যে, লেবাননেও একটি নতুন ফ্রেমওয়ার্ক চুক্তির মধ্যস্থতা করার সময় যুক্তরাষ্ট্র একই ধরনের আচরণ করেছিল। ইরানের অবস্থান পরিষ্কার করে এই অধ্যাপক বলেন, ইরানিরা এই বিষয়টি সহজে ছেড়ে দেবে না। তেহরান চায় কেবল বাণিজ্যিক জাহাজগুলোই এই প্রণালী দিয়ে চলাচল করুক। ফলে যেসব জাহাজ আগে থেকে সমন্বয় করবে না, সেগুলোকে সামরিক জাহাজ বা সামরিক সরঞ্জাম বহনকারী জাহাজ হিসেবে গণ্য করা হতে পারে। ইরানিরা তাদের জলসীমায় এমন কিছু চায় না। হাসান আহমাদিয়ান বলেন, ‘নিরাপদ চলাচলের বিষয়টি তাদের (ইরান) মাধ্যমেই আয়োজিত হওয়া এবং দুই মাস কেবল বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিষয়ে ইরানের অনড় অবস্থানের পেছনে যৌক্তিক কারণ রয়েছে। তাই আমি মনে করি না যে ইরান পিছিয়ে আসবে। বরং যুক্তরাষ্ট্র যদি উত্তেজনা অব্যাহত রাখে, তবে ইরানও পাল্টাপাল্টি ব্যবস্থা আরো জোরদার করবে।’