আঙিনায় সবজি চাষের ধুম প্রবাসী বাংলাদেশীদের

Printed Edition

রফিকুল হায়দার ফরহাদ নিউ ইয়র্ক থেকে

‘নিন, লাল শাক ভাজি খান। এটা আমাদের বাগানে চাষ করা লাল শাক।’ নিউ ইয়র্কের লং আইল্যান্ডে আমার এক আত্মীয়ের বাসায় দুুপুরে এভাবেই নিজেদের চাষ করা শাক খাওয়ালো আমাকে। খাবার গ্রহণ শেষে দেখতে গেলাম সেই বাগান। ও মা! এ দেখি এলাহি কাণ্ড। বাংলাদেশে যে সব তরি-তরকারি পাওয়া যায়, সবই চাষ করা হচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী বাংলাদেশীদের বাড়ির আঙিনায়। লাউ, শিম, বরবটি, মিষ্টি কুমড়া, গোল আলু, টমেটো, বেগুন, ফুলকপি, ঢেঁড়শ, গাজর, পুঁইশাক, লাল শাক, নোনা শাক, সরিষা শাক, বতুয়ার শাক, শসা, মরিচ, বোম্বাই মরিচ সবই চাষ করছেন বাংলাদেশীরা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র প্রবাসী যেসব বাংলাদেশীর নিজস্ব বাড়ি আছে তারাই বাড়ির আঙিনায় চাষ করেন এই শাক সবজি। প্রবাসীরা জানিয়েছেন নিউ ইয়র্ক থেকে দক্ষিণের ফ্লোরিডাতে ব্যাপক হারে বাংলাদেশীরা তরি-তরকারি চাষ করেন। সেখানকার আবহাওয়া গরম।

ফ্লোরিডা ছাড়া অন্য যেসব এলাকা যেগুলো শীতপ্রধান সেখানে মে মাস থেকে সেপ্টেম্বর মাস পর্যন্ত এই পাঁচ মাসে ব্যাপক হারে চাষ করা হয় এই শাকসবজি। এই বাংলাদেশী সবজিগুলোর বীজ বাংলাদেশীদের দোকানে পাওয়া যায়। এসব বীজ ৫০ থেকে ১০০ গ্রামের আড়াই ডলার থেকে সাত ডলার দিয়ে কিনতে হয়। এপ্রিলের শেষে শুরু হয় বীজ লাগানো। তখন যদি আবহাওয়া ভালো থাকে তাহলে আগে ভাগেই খাওয়ার উপযোগী হয়ে যায় এই শাকসবজি তরি-তরকারি। তা না হলে মে মাসের অনুকূল আবহাওয়ার অপেক্ষায় থাকতে হয়।

সাধারণত প্রবাসী বাংলাদেশীদের মধ্যে যারা বয়স্ক তারাই পাঁচ মাস এই তরকারি ও সবজি চাষে ব্যস্ত থাকেন। এই চাষাবাদের জন্য মাটিতে যে সার দিতে হয় তা তারা ইউটিউব দেখে দেখে শেখেন। বাগানের পাশেই সার তৈরির পাত্র। বিভিন্ন তরকারির খোসা, কলার ছিলকা, ডিমের খোসা পানিতে ভিজিয়ে তারা সার তৈরি করেন। এরপর তা টবে এবং মাটিতে লাগানো গাছের গোড়ায় দেন। উল্লেখ্য টবে ও মাটিতে চাষ করা হয় এই শাকসবজি। এই উৎপাদিত শাকসবজি আবার এক বাংলাদেশীর বাসা থেকে আরেক বাসায় দেয়া হয়। এই পরিবারগুলো পরস্পরের বাগান দেখতে এক বাসা থেকে আরেক বানায় যান। একেক বাগানে এত বেশি শাকসবজি উৎপাদিত হয় যে খেয়ে শেষ করা যায় না। তাই বিভিন্ন বাসায় দেয়া। সে সাথে পরস্পরের সাথে দেখা হওয়া। প্রবাসীরা জানিয়েছেন ফ্লোরিডাতে বাংলাদেশীদের উৎপাদিত এই তরি-তরকারি মার্কেটে বিক্রি করা হয়।

এই আঙিনায় উৎপাদিত শাকসবজি ও তরি-তরকারি মোটামুটি অর্থ সাশ্রয় করে প্রবাসীদের। লং আইল্যান্ডে ডিয়ার পার্কের বাসিন্দা নুরজাহান হক পারুল জানান, মাসে আড়াই শ’ ডলারের মতো সাশ্রয় হয় আমাদের। সে সাথে একবারেই তাজা শাকসবিজ খেতে পারি আমরা। সাথে অন্যদেরও দেই।’ তার স্বামী শহীদুল হক সোহেল এই বাগান পরিচর্যায় সহায়তা করেন। বিশেষ করে লাউ, শিম, বরবটি, শসা গাছের জন্য মাচা তৈরির কাজে মূল সহায়তা তার। কাঠের মধ্যে ড্রিল মেশিন দিয়ে আরেক কাঠ লাগিয়ে চলে এই মাচা তৈরির কাজ। এ ছাড়া স্টিলের নেটও ব্যবহার হচ্ছে মাচা তৈরিতে। ছোট পরিসরের এই পাবিারিক কৃষি আবাদ হলেও সব কিছুতে আধুনিকতার ছাপ।

বাংলাদেশের প্রখ্যাত ক্রীড়া সংগঠক মনজুর কাদেরের বোন জাহানারা শফিউল্লাহ মিলি থাকেন লং আইল্যান্ডে। তিনিও জানান, ‘আমিও আমার বাসায় শাকসবজি চাষ করছি। এতে অবসরটা এভাবেই পার করি। সব বাসাতেই এখন চাষ হচ্ছে এই শাকসবজি।’

বুতয়ার শাক যুক্তরাষ্ট্রের বিভিন্ন স্থানে হয়। ফ্রান্সের প্যারিসেও দেখেছি। আগে মার্কিনিরা এই শাক যে খাওয়া যায় তা জানতো না। এখন তারা বাংলাদেশীদের কাছে শিখেছে। এরপর ইউটিউবে সার্চ দিয়ে এই শাকের উপকারিতা জেনে এখন ব্যাপক হারে খাওয়া শুরু করেছে। নুরজাহান হক পারুল জানান, আমাদের চেয়ে মার্কিনিরাই বেশি করে বাড়ির আঙিনায় তরি-তরকারির আবাদ করে। তারা অবশ্য তাদের পছন্দের তরকারি ও সবজিই চাষ করছে।