ডাকসু নির্বাচন কমিশন গঠনে বিলম্ব শিক্ষার্থীদের অসন্তোষ

হারুন ইসলাম
Printed Edition
3rd-2
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের দু’জন শিক্ষার্থীর হাতে বৃত্তির চেক তুলে দেন ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান : নয়া দিগন্ত

গত ৫ আগস্টের রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) নির্বাচনের দাবি জোরালো হয়ে ওঠে। শিক্ষার্থীদের দাবির প্রেক্ষিতে প্রশাসন ডাকসু নির্বাচন আয়োজনের কাজ শুরু করলেও, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম হত্যার পর সৃষ্ট ঘোলাটে পরিবেশের কারণে সেটির অগ্রগতি থমকে পড়ে। ওই সময় শিক্ষার্থীরা ভাইস চ্যান্সেলরের বাসভবনের সামনে অনশনে বসেন। ২ জুনের মধ্যে ডাকসু নির্বাচন কমিশন গঠনের আশ্বাসে তখন দীর্ঘ ৮১ ঘণ্টা পর অনশন ভঙ্গ করেন ছাত্র অধিকার পরিষদের সভাপতি বিন ইয়ামিন মোল্লাসহ তিন শিক্ষার্থী। তারিখ অনুযায়ী গতকাল ডাকসুর নির্বাচন কমিশন গঠিত হওয়ার কথা থাকলেও অনিবার্য কারণে ঈদের আগে ডাকসু নির্বাচন কমিশন গঠন হচ্ছে না বলে জানিয়েছে কর্তৃপক্ষ।

জনসংযোগ অধিদফতর থেকে পাঠানো এক চিঠিতে জানানো হয়, ডাকসুর প্রস্তুতিমূলক কার্যক্রমের ধারাবাহিকতায় গত ১৫ এপ্রিল বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ডাকসু নির্বাচনের একটি টাইমলাইন প্রকাশ করেছিল। এই টাইমলাইন অনুসারেই নির্বাচন আয়োজনের কার্যক্রম এগিয়ে চলেছে এবং ঘোষিত টাইমলাইন অনুসারে চতুর্থ ধাপের কাজ পুরোপুরিভাবে সম্পন্ন হয়েছে। পঞ্চম, ষষ্ঠ এবং সপ্তম ধাপের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে রয়েছে। চতুর্থ ধাপ পর্যন্ত কার্যক্রমের ফলাফল নিয়ে পঞ্চম ধাপে ছাত্রসংগঠনগুলোর সাথে প্রথম পর্বের বৈঠক গত ১৩ মে সম্পন্ন হয়েছে। ঈদের ছুটির পর ক্যাম্পাস খোলা হলে সেটি সম্পন্ন করা হবে। এ ছাড়া ষষ্ঠ ধাপে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের অংশীজনদের সাথে আলোচনা অব্যাহত রয়েছে।

ইতিমধ্যে প্রাথমিকভাবে তিন জন শিক্ষককে নির্বাচন কমিশনের সদস্য হিসেবে চূড়ান্ত করা হয়েছে। তারা হলেন: ১. উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ জসীম উদ্দিন,

২. গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের অধ্যাপক ড. এস এম শামীম রেজা, ৩. ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মারুফুল ইসলাম।

তবে এই অগ্রগতির বিষয়ে সন্তুষ্ট হতে পারছেন না শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, ডাকসু নির্বাচন ইস্যুতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন শিক্ষার্থীদের সাথে তামাশা করছেন। ডাকসু শিক্ষার্থীদের প্রাণের দাবি। ডাকসু হলে ক্যাম্পাসে নিয়মতান্ত্রিক ছাত্ররাজনীতির পথ সুগম হবে। সেখানে গণঅভ্যুত্থানের স্পিরিট ধারণকারী এই প্রশাসনের ডাকসু নির্বাচনে বিলম্ব হওয়ার কারণ জানতে চেয়েছেন অনেকে। জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে লিখেছেন, অদৃশ্য কোনো শক্তির কারণে ডাকসু পিছিয়ে যাচ্ছে, প্রশাসনকে বলতে হবে। একটি মাত্র সংগঠনের জন্য নির্বাচন থেমে থাকতে পারে না।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এক শিক্ষার্থী বলেন, ছাত্রদল শুরু থেকেই ডাকসু নির্বাচন বন্ধের পাঁয়তারা করছে। তারা বিভিন্নভাবে প্রশাসনকে চাপ প্রয়োগ করে ডাকসু আটকাতে চাইছে। ছাত্রলীগের মতো তারা ক্যাম্পাসে আধিপত্যের রাজনীতি প্রতিষ্ঠা করতে চায়। ডাকসু নির্বাচন হলে সেটা ব্যর্থ হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সৌরভ নামের এক শিক্ষার্থী বলেন, ডাকসু গণতান্ত্রিক চর্চার কেন্দ্র হওয়ায় সচেতন, দক্ষ নেতৃত্ব গড়ে ওঠে, যা দুর্বল বা স্বৈরাচারী শাসকদের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়ায়। ইতিহাস প্রমাণ করে যে অনেক বড় সরকারবিরোধী আন্দোলনের নেতৃত্ব এসেছিল ছাত্রদের হাত থেকেই।

তিনি আরো বলেন, ডাকসু চালু হলে পুরনো, সুবিধাভোগী ছাত্রনেতারা ও দলনির্ভর নেতৃত্বের অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে, ফলে তারা নিজের স্বার্থেই নির্বাচন চান না। সব মিলিয়ে, যারা ডাকসু চান না, তারা মূলত চায় অন্যায় করেও টিকে থাকতে এবং ছাত্রসমাজকে দমন করে রাখতে।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন জানান, ঈদের ছুটি ও সম্ভাব্য শিক্ষকদের কেউ কেউ ছুটিতে থাকায় কিছুটা বিলম্ব হচ্ছে। তবে ঈদের পরপরই তাদের সম্মতি গ্রহণপূর্বক সিন্ডিকেট সভায় প্রস্তাবিত নামগুলো অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করা হবে। সিন্ডিকেটে অনুমোদনের পর নির্বাচন কমিশন গঠন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে এবং নির্বাচন কার্যক্রমের পরবর্তী ধাপগুলো শুরু হবে।

অর্থনীতি স্মৃতিবৃত্তি পেলেন দু’জন শিক্ষার্থী

অর্থনীতি বিভাগের দু’জন মেধাবী শিক্ষার্থীকে ‘ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় অর্থনীতি ১৯৭৬ স্মৃতি ট্রাস্ট ফান্ড বৃত্তি’ দেয়া হয়েছে। তারা হলেন মো: তানভীর মাহতাব ওয়াদুদ এবং মোছা: হাজেরা খাতুন মারিয়া। ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খান ২ জুন এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে তাদের হাতে বৃত্তির চেক তুলে দেন।

ভিসির সাথে সাম্যের পরিবারের সাক্ষাৎ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের (ঢাবি) মেধাবী শিক্ষার্থী শাহরিয়ার আলম সাম্য’র পরিবারের সদস্যরা সোমবার ভিসি অধ্যাপক ড. নিয়াজ আহমদ খানের সাথে তার সভাকক্ষে সাক্ষাৎ করেছেন। এ সময় ঢাবি ভিসি বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে গৃহীত বিভিন্ন পদক্ষেপ সম্পর্কে সাম্যের পরিবারের সদস্যদের বিস্তারিতভাবে জানান।

এ সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ড. এম জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, কলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ ছিদ্দিকুর রহমান খান, সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. তৈয়েবুর রহমান, ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের অধ্যাপক ড. মো: আবুল কালাম সরকার, মুহসীন হলের প্রভোস্ট অধ্যাপক ড. মো: সিরাজুল ইসলাম, শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক হোসনে আরা বেগম, অধ্যাপক ড. মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, প্রক্টর সহযোগী অধ্যাপক সাইফুদ্দীন আহমদ এবং ভারপ্রাপ্ত রেজিস্ট্রার মুনশী শামস উদ্দিন আহম্মদ উপস্থিত ছিলেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, শাহরিয়ার আলম সাম্য হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় দোষীদের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করতে প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে কাজ করছে। এ লক্ষ্যে প্রশাসন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নিয়মিত যোগাযোগ রক্ষা করছে।

এ ছাড়া শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিতে ইতোমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বেশ কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে যার মধ্যে রয়েছে : সোহরাওয়ার্দী উদ্যানকেন্দ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার, মামলার অগ্রগতি তদারকি ও নিয়মিত তথ্য হালনাগাদ, সরকারের উচ্চ মহলের সাথে যোগাযোগ রক্ষা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সাথে নিয়মিত সমন্বয় সভার আয়োজন প্রভৃতি।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দৃঢ়ভাবে আশ্বাস দিয়েছে যে, এই মর্মান্তিক ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত ও ন্যায়বিচার নিশ্চিতে তাদের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সব পদক্ষেপ গ্রহণ অব্যাহত থাকবে। বিজ্ঞপ্তি।