গাজায় ইসরাইলি বাহিনীর অব্যাহত সহিংসতায় শান্তির আশা ম্লান

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ফিলিস্তিনি ছিটমহল গাজায় ইসরাইলি বাহিনী গতকাল ভোর থেকে শুরু করা বিভিন্ন হামলায় অন্তত দশজনকে হত্যা করেছে।

গাজার চিকিৎসা সূত্রগুলো রোববার আলজাজিরাকে এমনটি জানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতায় ফিলিস্তিনি স্বাধীনতাকামী সংগঠন হামাস ও ইসরাইলের মধ্যে যুদ্ধবিরতি চললেও গাজায় সহিংসতা চালিয়ে যাচ্ছে ইসরাইলি বাহিনী, এতে শান্তির আশা ক্রমেই ম্লান হচ্ছে। ঘটনাস্থলগুলোতে থাকা স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ দিন ভোর থেকে অবরুদ্ধ ছিটমহলটির বিভিন্ন এলাকায় হামলা চালায় ইসরাইলি বাহিনী। এতে গাজায় মৃত্যুর মিছিল দীর্ঘ হওয়া অব্যাহত আছে।

গাজার হামাস পরিচালিত সরকারের গণমাধ্যম দফতর জানায়, ইসরাইলের বিরুদ্ধে যুদ্ধবিরতি লঙ্ঘনের অভিযোগ এখন ১৬২০টিতে দাঁড়িয়েছে। প্রতিদিন বাড়তে থাকা এসব অভিযোগে যুদ্ধবিরতির ভঙ্গুরতা স্পষ্ট হচ্ছে আর যুদ্ধের মধ্যে থাকা দুই পক্ষের মধ্যে অবিশ্বাস কত গভীর তা প্রকাশ পাচ্ছে।

ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধের সম্ভাবনায় মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যখন উত্তেজনা চলছে, তার ছায়ার মধ্যেই গাজায় নতুন করে এসব রক্তপাতের ঘটনা ঘটছে। এর আগে ইসরাইলের সামরিক বাহিনী লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলে ধারাবাহিকভাবে কয়েকটি হামলা চালিয়েছে। এসব হামলায় লেবাননের সশস্ত্র ও রাজনৈতিক গোষ্ঠী হিজবুল্লাহর গুদামগুলোকে লক্ষ্যস্থল করা হয়েছে বলে দাবি ইসরাইলি বাহিনীর। এসব আন্তঃসীমান্ত হামলার কারণে ইসরাইলের উত্তর সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়তে পারে, এমন শঙ্কা তীব্র হচ্ছে। ২০২৩ এর অক্টোবরে গাজায় ইসরাইলের আগ্রাসন শুরু হওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত নিহতের সংখ্যা ৭২ হাজার ৫১ জনে দাঁড়িয়েছে বলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। একই সময় আহত হয়েছে আরো এক লাখ ৭১ হাজার ৭০৬ জন ফিলিস্তিনি।

‘আমরা সুরক্ষিত নই’: হেবরনের মেয়র

অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলের নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণের সর্বশেষ পদক্ষেপকে ফিলিস্তিনিদের সাথে আলোচনার ‘চূড়ান্ত সমাপ্তি’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন স্থানীয় হেবরন শহরের মেয়র। হেবরনের ভারপ্রাপ্ত মেয়র আসমা আল-শারাবাতি বিবিসিকে জানিয়েছেন, ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভার মন্ত্রীরা যে নতুন আইনি পরিবর্তন ঘোষণা করেছে তার ফলে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ এমনকি তাদের নিজেদের নিয়ন্ত্রণে থাকা এলাকার নগর পরিকল্পনা ও উন্নয়নমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া থেকেও বঞ্চিত হবে।

গত রোববার ইসরাইলি নিরাপত্তা মন্ত্রিসভা পশ্চিম তীরের ক্ষমতার প্রতিষ্ঠিত বিভাজনে বড় ধরনের পরিবর্তনের অনুমোদন দিয়েছে। তিন দশক আগে যুক্তরাষ্ট্র সমর্থিত ঐতিহাসিক ‘অসলো চুক্তি’র মাধ্যমে ক্ষমতার এই ভারসাম্য নির্ধারিত হয়েছিল, যে চুক্তিতে ইসরাইল ও ফিলিস্তিনি নেতারা স্বাক্ষর করেছিলেন। নতুন এই নিয়মে ফিলিস্তিনের পশ্চিম তীরে ইসরাইল শুধুমাত্র সামরিক দখলদারিত্বের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থেকে ফিলিস্তিনিদের দ্বারা পরিচালিত এলাকাগুলোতেও পৌরসেবা প্রদানের নিয়ন্ত্রণ নেবে।

এর পাশাপাশি পুরো পশ্চিম তীরের পানি, পরিবেশ ও প্রতœতাত্ত্বিক সম্পদ রক্ষার অজুহাতে তথাকথিত ‘ঐতিহ্যবাহী স্থান’এর নিয়ন্ত্রণ নেয়ার ক্ষমতাও দেয়া হয়েছে ইসরাইলি কর্তৃপক্ষকে। হেবরনের ইব্রাহিমি মসজিদের ভেতরে অবস্থিত পবিত্র ‘কেভ অব দ্য প্যাট্রিয়ার্কস’-এর পরিকল্পনা কর্তৃপক্ষও এখন থেকে ইসরাইল এককভাবে পরিচালনা করবে।

আল-শারাবাতি বলেন, ‘এখন তারা চাইলেই যেকোনো ভবনকে প্রাচীন প্রতœসম্পদ হিসেবে ঘোষণা করে দখল করতে পারবে, যেখানে নগর পরিকল্পনা বা উন্নয়নের বিষয়ে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের অংশ নেয়ার কোনো অধিকার থাকবে না।’ বিবিসিকে তিনি জানান, ইসরাইলের পরিকল্পনার বিষয়ে তিনি কোনো আনুষ্ঠানিক বিজ্ঞপ্তি পাননি, বিস্তারিত যা জেনেছেন সেগুলো ইসরাইলি খবরগুলো থেকে পাওয়া।

হেবরনের ফিলিস্তিনি অধিকার কর্মী ইসা আমরো জানান, এই পরিবর্তনগুলো আগের চেয়ে আলাদা। তিনি বলেন, ‘এত দিন তারা কোনো আইনি ভিত্তি ছাড়াই অনেক সম্প্রসারণ চালাচ্ছিল। এখন তারা আইন করেই এটি করছে। এটি ফিলিস্তিনিদের বাদ দিয়েই ভূখণ্ডকে ইসরাইলের অংশ করে নেয়ার একটি প্রক্রিয়া।’

নতুন পরিকল্পনায় ইসরাইল এখন থেকে হেবরনের ইহুদি বসতি স্থাপনকারীদের সরাসরি পৌরসেবা দেবে এবং পুরো পশ্চিম তীরে ব্যক্তিগত পর্যায়ে ইসরাইলি নাগরিকদের জমি কেনার পথ উন্মুক্ত করবে। জর্দান ও ফিলিস্তিনি আইনে ফিলিস্তিনিদের জন্য অ-ফিলিস্তিনিদের কাছে পশ্চিম তীরের জমি বিক্রি নিষিদ্ধ হলেও ইসরাইল এখন তাদের নাগরিকদের সেখানে সরাসরি জমি কেনার অনুমতি দিচ্ছে।

ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ‘কবর’ দেয়ার ঘোষণা ইসরাইলি মন্ত্রীর

ইসরাইলের কট্টর ডানপন্থী অর্থমন্ত্রী বেজালেল স্মোট্রিচ এই পদক্ষেপের লক্ষ্য স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা ইসরাইলের সব অংশে আমাদের শিকড় আরো গভীরে নিয়ে যাচ্ছি এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের ধারণাকে কবর দিচ্ছি।’ স্মোট্রিচের দলের আরেক আইনপ্রণেতা জভি সুক্কত জানান, তিনি পুরো পশ্চিম তীরে পূর্ণ ইসরাইলি সার্বভৌমত্ব আশা করেন।

এই পরিস্থিতিকে ফিলিস্তিনি প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাস আন্তর্জাতিক আইনের লঙ্ঘন হিসেবে অভিহিত করেছেন। তিনি মার্কিন সরকারের কাছে এর ‘কঠোর প্রতিক্রিয়া’ দাবি করে বলেন, ইসরাইলের এই সিদ্ধান্ত মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি ফেরাতে প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রচেষ্টাকে বাধাগ্রস্ত করবে।

ব্রিটেনের মধ্যপ্রাচ্য বিষয়ক মন্ত্রী হামিশ ফ্যালকনার এই সিদ্ধান্তের তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন, ‘ইসরাইলের প্রায় সব বন্ধু রাষ্ট্রই বলছে যে এটি একটি ভয়াবহ, ভয়াবহ ভুল। আমরা আশা করি ইসরাইল এই সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসবে।’ আন্তর্জাতিক মহলের মনোযোগ এখন গাজার দিকে থাকলেও পশ্চিম তীরের এই পরিবর্তনগুলো সুদূরপ্রসারী প্রভাব ফেলতে পারে। বিশ্লেষকরা মনে করছেন, ট্রাম্পের গাজা ও মধ্যপ্রাচ্য শান্তি পরিকল্পনা অনেকাংশেই আরব দেশগুলোর সমর্থনের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু পশ্চিম তীরে ইসরাইলের এই নিয়ন্ত্রণ সম্প্রসারণ এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করার পদক্ষেপ ট্রাম্পের সেই লক্ষ্যকে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলতে পারে।

গাজা যুদ্ধবিরতি ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের পথ প্রশস্ত করবে : সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী

সৌদি আরবের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ফয়সাল বিন ফারহান বলেছেন, গাজা উপত্যকায় কার্যকর হওয়া যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগিয়ে একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র গঠনের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। দ্বি-রাষ্ট্র কাঠামোর আওতায় এই রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিতে হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলনে কথা বলার সময় ফারহান ইসরাইল-ফিলিস্তিন সঙ্ঘাত নিরসনে নেয়া উদ্যোগগুলোর প্রতি সৌদি আরবের সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেন। শনিবার তিনি জানান, শান্তির প্রয়োজনেই সৌদি আরব এই ভূমিকা পালন করছে। ফারহান বলেন, ‘গাজা যুদ্ধবিরতির দ্বিতীয় ধাপে গঠিত গাজা পিস বোর্ড এবং এর ২০ দফার কাঠামোটি প্রথমে সঙ্ঘাতের অবসান নিশ্চিত করবে। এর পর এটি ফিলিস্তিনি জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় সহায়তা করবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘স্থিতিশীলতা ফিরিয়ে আনা, পুনর্গঠন এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে বাস্তব পদক্ষেপ নিতে যুদ্ধবিরতিকে কাজে লাগাতে হবে। এটিই দীর্ঘস্থায়ী আঞ্চলিক শান্তির একমাত্র পথ।’

সিরিয়া প্রসঙ্গে ফারহান জানান, দেশটির প্রশাসন সংখ্যালঘু ও বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর প্রতি গঠনমূলক দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করছে। বহু বছরের গৃহযুদ্ধের পর দেশটি এখন একটি কঠিন পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। তিনি উল্লেখ করেন যে সিরিয়ার পুনর্গঠন প্রক্রিয়ায় শেষ পর্যন্ত দেশটির জনগণই নেতৃত্ব দেবে এবং আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শক্তিগুলো এতে সহায়কের ভূমিকা পালন করবে।

বিন ফারহান আরো জানান, এসডিএফ-এর (সিরিয়ান ডেমোক্র্যাটিক ফোর্সেস) সাথে এমন একটি চুক্তি এগিয়ে নেয়া হচ্ছে, যা কুর্দিদের অধিকারকে সম্মান করে। সরকারের অব্যাহত অগ্রগতি আরো বড় সাফল্য বয়ে আনবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। আঞ্চলিক অস্থিরতা নিয়ে কথা বলতে গিয়ে সৌদি মন্ত্রী বলেন, ‘সঙ্ঘাত সাধারণত একে অপরকে উসকে দেয়।’ সুদানের সহিংসতা প্রতিবেশী দেশগুলোতে উত্তেজনা বাড়াচ্ছে উল্লেখ করে তিনি এর মূল কারণ সমাধানের এবং সহাবস্থান নিশ্চিত করার ওপর জোর দেন। তিনি সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোকে সঙ্কীর্ণ স্বার্থের ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানান, যা অশান্তি জিইয়ে রাখে। বিশেষ করে সিরিয়ার বর্তমান পরিস্থিতি আরো স্থিতিশীল পথের সম্ভাবনা দেখাচ্ছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। বিন ফারহান জানান, সুদানে সেনাবাহিনী এবং র‌্যাপিড সাপোর্ট ফোর্সেসের (আরএসএফ) মধ্যে সংঘর্ষের অবসান পুরো অঞ্চলের জন্য আশার উৎস হতে পারে।