বৃহত্তর খুলনা ও যশোরের ২০ আসনের ১৪টিতে জামায়াত প্রার্থীরা সুবিধায়
বিএনপির শত্রু অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও দুর্নীতিবাজদের দলে প্রত্যাবাসন
Printed Edition
খুলনা ব্যুরো
খুলনা, যশোর, বাগেরহাট ও সাতক্ষীরার মোট ২০ আসনে বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীদের সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা হচ্ছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। খুলনা জেলার ছয়টি আসনের মধ্যে তিনটি করে দুই দলের মধ্যে ভাগাভাগির সম্ভাবনা নিয়ে রাজনীতি সচেতন মহল ও মিডিয়া কর্মীদের মধ্যে আলোচনা রয়েছে। যশোর জেলার ছয়টি আসনের পাঁচটিতে বিএনপির অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং চাঁদাবাজি, দখল ও টেন্ডারবাজির মতো অপরাধের সাথে যুক্তদের বহিষ্কার করে আবার ফেরত নেয়ায় দলের ভাবমর্যাদায় নেতিবাচক প্রভাব পড়ায় জামায়াত প্রার্থীরা সুবিধা পাচ্ছেন। বাগেরহাটে বিএনপির অভ্যন্তরীণ রেষারেষিতে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকায় চারটি আসনের অন্তত তিনটিতে জামায়াত প্রার্থীরা সুবিধা পাচ্ছেন। আর সাতক্ষীরা জেলার চারটি আসনেই জামায়াত এখনো অগ্রগামী অবস্থান বজায় রাখতে সক্ষম হয়েছে।
খুলনায় সব আসনে বিএনপি-জামায়াতের কঠিন লড়াই
খুলনা-১ আসনের (দাকোপ-বটিয়াঘাটা) মোট তিন লাখ সাত হাজার ১০৩ ভোটারের মধ্যে দাকোপ উপজেলায় ৫৪ দশমিক ৪৪ শতাংশ ও বটিয়াঘাটা উপজেলায় ২৭ দশমিক ৫৬ শতাংশ হিন্দু সম্প্রদায়ের। এই আসনে হিন্দু ভোটেই জয়-পরাজয় নির্ধারিত হয়। এবার বিএনপি প্রার্থী আমির এজাজ খান একমাত্র মুসলিম। আর জামায়াতে ইসলামীসহ হিন্দু প্রার্থী হয়েছেন আটজন। অতীতে এ আসনে কয়েকবার আমির এজাজ বিএনপির প্রার্থী হয়ে বিজয়ী না হলেও ভালো ভোট পেয়েছিলেন। এ জন্য তিনি জয়ের আশা করছেন। তবে জামায়াতের প্রার্থী কৃষ্ণ নন্দী তার সবশেষ নির্বাচনী জনসভায় বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ব্যাপক চাঁদাবাজি, ঘের-বেড়ি ও জমি দখলের অভিযোগ করেন। ৫ ডিসেম্বরের পর আমির এজাজের অনুসারীদের বিরুদ্ধে কৈলাশগঞ্জে কয়েকজনের জমির পাকা ধান কেটে নেয়া ও সম্প্রতি মন্দিরের জমির তিন লাখ টাকার মাটি কেটে বিক্রি করার অভিযোগ রয়েছে। এসব নিয়ে ইউএনও অফিসে অভিযোগ ও আদালতে মামলা হয়েছে বলে জানা যায়। এ জন্য কৃষ্ণ নন্দীর দাবি, দাকোপ-বটিয়াঘাটার মানুষ এবার তাকেই ভোট দিয়ে নির্বাচিত করবে।
খুলনা-২ (সদর) আসনে ব্যক্তি ইমেজ এবং প্রবীণ রাজনীতিবিদ হিসেবে বিএনপির প্রার্থী নজরুল ইসলাম মঞ্জু সহজে নির্বাচনী বৈতরণী পার হবেন বলে ধারণা করা হচ্ছিল; কিন্তু প্রচারণার শেষে এসে তার সাথে ৩১ নম্বর ওয়াডের্র সাবেক কাউন্সিলর জামায়াতে ইসলামীর শেখ জাহাঙ্গীর হুসাইন হেলালের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বিতার আভাস পাওয়া যাচ্ছে। এ আসনে মঞ্জুর জন্য দলের মারাত্মক অভ্যন্তরীণ কোন্দল বিপজ্জনক শিরঃপীড়া হয়ে রয়ে গেছে।
খুলনা-৩ আসনে (খালিশপুর-দৌলতপুর) বিএনপির রকিবুল ইসলাম বকুল জামায়াতের মোহাম্মাদ মাহফুজুর রহমানের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছেন। এখানে চরমোনাই পীরের কিছু মুুুরিদের ভোট ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের মো: আব্দুল আউয়াল পাবেন বলে ধারণা করা হয়; কিন্তু তা মূল লড়াইয়ে হেরফের ঘটানোর মতো কোনো ভূমিকা রাখবে না। বিএনপি থেকে এনসিপিতে যাওয়া স্বতন্ত্র প্রার্থী এস এম আরিফুর রহমান মিঠুর ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য।
খুলনা-৪ আসন রূপসা-তেরখাদা-দিঘলিয়ায় বিএনপির এস কে আজিজুল বারী হেলাল সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামী আসনটি জোটের শরিক খেলাফত মজলিসের এস এম সাখাওয়াত হোসাইনকে ছেড়ে দেয়ার পর ছাত্রদলের সাবেক সভাপতি হেলাল অনায়াসে জিতে যাবেন বলে জনমনে ধারণা গড়ে উঠেছিল; কিন্তু সবশেষ প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী সাখাওয়াত হোসেন বিএনপির হেলালকে শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে টেনে এনেছেন।
খুলনা-৫ ফুলতলা-ডুমুরিয়া আসন এবার বেশ আলোচিত। হিন্দু-অধ্যুষিত ডুমুরিয়া উপজেলা নিয়ে গঠিত আসনে শক্তিশালী প্রার্থী জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল গোলাম পরওয়ার এবং সাবেক বিসিবি পরিচালক বিএনপির মোহাম্মাদ আলী আসগার লবি সেখানকার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। নির্বাচনী ডামাডোলের শুরু থেকেই মিয়া গোলাম পরওয়ারের অবস্থা অনেকটাই ভালো ছিল। তবে হিন্দুদের বাগে আনতে দিনরাত কাজ করছেন আলী আসগার লবি। তরুণ ভোটারদের মন জিততে কনসার্টের আয়োজন করছেন। ফলে জামায়াতে ইসলামী একটু চ্যালেঞ্জ বোধ করছে। মিয়া গোলাম পরওয়ার তার শেষদিকের সভাগুলোতে বিএনপি প্রার্থীর বিরুদ্ধে ভোটারদের মধ্যে কালো টাকা বিলি, সংখ্যালঘু ভোটারদের ভীতি প্রদর্শন ও প্রলোভনে আকৃষ্ট করা এবং সবশেষ সন্ত্রাসীদের জেল থেকে বের করে এনে ত্রাসের আবহ তৈরির চেষ্টা করার অভিযোগ করেছেন।
খুলনা-৬ কয়রা ও পাইকগাছা আসনে কয়রা উপজেলা জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত। তবু জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা আবুল কালাম আজাদের সাথে বিএনপির এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী প্রতিদ্বন্দ্বিতা গড়ার প্রাণান্ত চেষ্টা করে যাচ্ছেন।
যশোরে জামায়াতের বাজিমাতের সম্ভাবনা
যশোর-১ শার্শা আসনে জামায়াতে ইসলামীর মাওলানা মুহাম্মদ আজিজুর রহমানের সাথে বিএনপির নুরুজ্জামান লিটনের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে বিএনপি মফিকুল হাসান তৃপ্তিকে পরিবর্তন এবং গত বছরের ৫ মার্চ ১৫৫ বস্তা সরকারি চাল লুটের দায়ে দল থেকে বহিষ্কৃত উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি রুহুল কুদ্দুসকে ৩০ জানুয়ারি আবার দলে ফিরিয়ে নেয়ার ঘটনা জামায়াতের জন্যে সুবিধাজনক হয়ে উঠেছে।
যশোর-২ ঝিকরগাছা চৌগাছা আসনে জামায়াতে ইসলামীর ডা: মোহাম্মদ মোসলেহ উদ্দিন ফরিদের অবস্থান শক্ত। বিএনপির সাবিরা সুলতানা ভোটারদের মন জয় করতে কাজ করে যাচ্ছেন; কিন্তু আসনটিতে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন নিয়ে যে দ্বন্দ্ব তৈরি হয়েছিল নেতাকর্মীদের সেই বিভেদ কাটানো যায়নি। ফলে এখানেও ডা: ফরিদ এগিয়ে আছেন। এ ছাড়া গত বছরের জানুয়ারিতে চৌগাছার বেড়গোবিন্দপুর বাঁওড় দখল নিয়ে সংঘর্ষে বহিষ্কৃত বিএনপি নেতা আব্দুর রহিমকে দলে ফেরত নেয়া হয়েছে। চাঁদাবাজি ও বাড়িঘর ভাঙচুরের দায়ে বহিষ্কৃত ১৩ জনকে ফেরত নেয়ার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
যশোর-৩ (সদর) আসনে বিএনপির প্রার্থী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। যশোরে ছয়টি আসনের মধ্যে বিএনপির একমাত্র এ আসনে বিএনপির পাল্লা ভারী। এই আসনে ছয়জন প্রার্থী থাকলেও মূলত অমিতের সাথে জামায়াতের আব্দুল কাদেরের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। পৌরসভা ও শহর উপকণ্ঠ বাদে গ্রাম এলাকায় জামায়াতের সমর্থন ভালো। পিছিয়ে থাকা এলাকায় কাভার করতে পারলে আব্দুল কাদের বিএনপির অমিতকে ভালোভাবেই চ্যালেঞ্জ জানাতে পারবেন।
যশোর-৪ বাঘারপাড়া-অভয়নগর আসনে বিএনপির জনপ্রিয় নেতা টি এস আইয়ুব ঋণখেলাপি হওয়ায় প্রার্থী হতে পারেননি। মতিয়ার রহমান ফারাজি প্রার্থী হয়েছেন। সেখানে বিএনপি বহু ভাগে বিভক্ত থাকায় তিনি ঝুঁকির মধ্যে আছেন। এই অবস্থায় জেলা জামায়াতের গোলাম রসুল জয়লাভ করলে অবাক হওয়ার কিছুই থাকবে না।
যশোর-৫ মনিরামপুর আসনে বিএনপির বহিষ্কৃত উপজেলা সভাপতি স্বতন্ত্র শহীদ মো: ইকবাল হোসেনের (কলস) সাথে জামায়াতের গাজী এনামুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে। তবে সাবেক এমপি মুফতি ওয়াক্কাসের ছেলে রশীদ আহমাদ বিএনপির প্রার্থী হওয়ায় দলটির ভোট ভাগাভাগি হলে জামায়াতের এনামুল হক হবেন রেসের অগ্রগামী ঘোড়া।
যশোর-৬ কেশবপুর আসনে জামায়াতের মোক্তার আলী ভোটারদের পছন্দের নিরিখে এগিয়ে আছেন। এই আসনে বিএনপির প্রথম দিকের প্রার্থী পরিবর্তন করে প্রার্থী করা হয় ব্যবসায়ী আবুল হোসেন আজাদকে।
বাগেরহাটে দু’টি আসনে ত্রিমুখী লড়াই
বাগেরহাট-১ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী এম এ এইচ সেলিম (ঘোড়া) এবং বিএনপির কোপিল কৃষ্ণ মণ্ডল এবং জামায়াতের মাওলানা মশিউর রহমান খানের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াই জমে উঠেছে। সেখানে জেলা বিএনপির আহ্বায়ক কমিটির সদস্য মো: মাসুদ রানাও (ফুটবল) প্রার্থী রয়েছেন। বাগেরহাট-২ আসনেও এম এ এইচ সেলিম, বিএনপির ব্যারিস্টার শেখ মোহাম্মাদ জাকির হোসেন ও জামায়াতের শেখ মঞ্জুরুল হক রাহাদের মধ্যে ত্রিমুখী লড়াইয়ে রাহাদ বাজিমাত করতে পারেন।
অন্য দিকে বাগেরহাট-৩ আসনে মূল লড়াই হবে বিএনপির শেখ ফরিদুল ইসলাম ও জামায়াতের অ্যাডভোকেট আব্দুল ওয়াদুদের মধ্যে। সেখানে এম এ এইচ সেলিম প্রার্থী থাকলেও তেমন কার্যক্রম নেই। এম এ এইচ সেলিম বলেন, বিএনপির প্রার্থী হিসেবেই নির্বাচন করছি বলে আমি মনে করি। আমাদের কেন্দ্রীয় কমিটি যাদের মনোনয়ন দিয়েছে, তারা কেউই জামায়াতের সাথে পাস করতে পারবে না। বাগেরহাট-৪ আসনে জামায়াতের অধ্যক্ষ আব্দুল আলিম ও বিএনপির প্রার্থী সোমনাথ দে মূল প্রতিদ্বন্দ্বী। তবে বিএনপির জন্য বিপদ স্বতন্ত্র কাজী খায়রুজ্জামান শিপন (হরিণ)।
সাতক্ষীরায় জামায়াতের শক্ত অবস্থান
সাতক্ষীরার চারটি আসনে মূল লড়াইয়ে আছেন জামায়াতে ইসলামী ও বিএনপি প্রার্থীরা। সাতক্ষীরা-১ আসনে বিএনপির হাবিবুল ইসলাম হাবিব মোকাবেলায় জামায়াতের মো: ইজ্জত উল্লাহর এবং সাতক্ষীরা-২ আসনে বিএনপির আব্দুর রউফের মোকাবেলায় জামায়াতের মুহাদ্দিস আব্দুল খালেকের অবস্থান খুবই শক্ত। সাতক্ষীরা-৩ আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে বিএনপির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ডা: শহিদুল আলম মাঠে আছেন। দল তাকে মনোনয়ন না দিলেও তার কিছু সমর্থক আছেন। এই আসনে বিএনপির ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামান জামায়াতের হাফেজ রবিউল বাশারের চ্যালেঞ্জার।
সাতক্ষীরা-৪ আসনে জামায়াতের সাবেক এমপি জি এম নজরুল ইসলাম ও বিএনপির ড. মুহাম্মদ মনিরুজ্জামানের মধ্যে লড়াই হতে পারে।