হাবিবসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে চার্জ গঠনের আবেদন
যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যা
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
- ময়মনসিংহে মানবতাবিরোধী অপরাধ, প্রতিবেদন ১৬ ফেব্রুয়ারি
- বুলেটে বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে
- একজনকে মারতে কত গুলি লাগে স্যার : তাইমের বাবার জিজ্ঞাসা
জুলাই অভ্যুত্থানে রাজধানীর যাত্রাবাড়ীতে ইমাম হাসান তাইম হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ডিএমপির সাবেক কমিশনার হাবিবুর রহমানসহ ১১ জনের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠনের বিষয়ে শুনানি শেষ করেছে প্রসিকিউশন। আসামিপক্ষের শুনানির জন্য আগামী ২ ফেব্রুয়ারি (সোমবার) দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল।
গতকাল বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর সদস্য বিচারক মো: মঞ্জুরুল বাছিদের নেতৃত্বাধীন দুই সদস্যের বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্য বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। আসামিদের অভিযোগ গঠন নিয়ে ট্রাইব্যুনালে শুনানি করেন চিফ প্রসিকিউটর মোহাম্মদ তাজুল ইসলাম। শুনানিতে যাত্রাবাড়ীতে তাইম হত্যার পুরো বিবরণসহ ১১ আসামির ব্যক্তিগত দায় তুলে ধরেন তিনি।
চিফ প্রসিকিউটর বলেন, ২০২৪ সালের ২০ জুলাই যাত্রাবাড়ীর কাজলা এলাকায় ডিএমপির তৎকালীন কমিশনার হাবিবুর রহমান, যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তীসহ ঊর্ধ্বতন অন্যান্য কর্মকর্তার নির্দেশে খুব কাছ থেকে গুলি চালিয়ে নির্মমভাবে তাইমকে হত্যা করা হয়। এমনকি গুলিবিদ্ধ অবস্থায় তাকে বাঁচাতে পেছন দিয়ে ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছিলেন তার বন্ধু রাহাত। তখন তাকেও গুলি চালিয়ে তাইমকে ফেলে রেখে যেতে বাধ্য করে পুলিশ। মর্মান্তিক এ দৃশ্য সেই সময় সবার অন্তরে নাড়া দিয়েছিল। এ ছাড়া আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যার নির্দেশ, উসকানি-প্ররোচনাসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ আনা হয়। সবমিলিয়ে প্রাইমা ফেসি বিবেচনায় ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনের আবেদন করেন চিফ প্রসিকিউটর। পরে গ্রেফতার দুই আসামির পক্ষে শুনানির জন্য সময় প্রার্থনা করেন আইনজীবী আবুল হাসান। এ ছাড়া পলাতক ৯ আসামির পক্ষে রাষ্ট্রনিযুক্ত আইনজীবী এম হাসান ইমাম ও লোকমান হাওলাদারের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আগামী ২ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেন ট্রাইব্যুনাল।
এদিকে, বুধবার সকালে কারাগার থেকে এ মামলার দুই আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করা হয়। তারা হলেন যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন ওসি আবুল হাসান ও তৎকালীন ওসি (তদন্ত) জাকির হোসেন। হাবিবুর ছাড়া পলাতক অন্যরা হলেন ডিএমপির সাবেক যুগ্ম কমিশনার সুদীপ কুমার চক্রবর্তী, ওয়ারি জোনের সাবেক ডিসি ইকবাল হোসাইন, এডিসি শাকিল মোহাম্মদ শামীম, ডেমরা জোনের তৎকালীন এডিসি মো: মাসুদুর রহমান মনির, তৎকালীন সহকারী পুলিশ কমিশনার নাহিদ ফেরদৌস, যাত্রাবাড়ী থানার তৎকালীন পুলিশ পরিদর্শক (অপারেশন) ওহিদুল হক মামুন, এসআই (নিরস্ত্র) সাজ্জাদ উজ জামান ও মো: শাহদাত আলী। এর আগে, ২৪ ডিসেম্বর ১১ আসামির বিরুদ্ধে অভিযোগ আমলে নেন ট্রাইব্যুনাল-২। একইসাথে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। ওই দিন তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দাখিল করে প্রসিকিউশন।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালীন ২০২৪ সালের ২০ জুলাই পুলিশের গুলিতে শহীদ হন তাইম। তার বাবা মো: ময়নাল হোসেন ভূঁইয়াও রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের উপপরিদর্শক। ওই দিন বন্ধুর সাথে বেরিয়ে যাত্রাবাড়ী এলাকায় গুলি খেয়ে লাশ হয়ে ফিরতে হয় তাকে। খোঁজাখুঁজির একপর্যায়ে ছেলের লাশ পেয়ে ফোনে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাকে ময়নাল বলেন, ‘স্যার, আমার ছেলেটা মারা গেছে। বুলেটে ওর বুক ঝাঁজরা হয়ে গেছে। স্যার, আমার ছেলে আর নেই। এ সময় প্রশ্ন রেখে বলেছিলেন, একজনকে মারতে কতগুলো গুলি লাগে স্যার।
ময়মনসিংহে মানবতাবিরোধী অপরাধ
এদিকে জুলাই-আগস্ট আন্দোলন ঘিরে ময়মনসিংহের গৌরীপুরে তিনজনকে হত্যার ঘটনায় মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় আসামিদের বিরুদ্ধে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি দিন ধার্য করেছেন ট্রাইব্যুনাল। বুধবার আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল-২ এর বিচারিক প্যানেল এ আদেশ দেন। অপর সদস্য হলেন বিচারক নূর মোহাম্মদ শাহরিয়ার কবীর। ট্রাইব্যুনালে প্রসিকিউশনের পক্ষে শুনানি করেন প্রসিকিউটর সাইমুম রেজা তালুকদার। তিনি এ মামলার অগ্রগতি তুলে ধরে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য আরো দুই সপ্তাহ সময়ের আবেদন করেন। পরে আগামী ১৬ ফেব্রুয়ারি দিন নির্ধারণ করেন ট্রাইব্যুনাল।
এ মামলার তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য বুধবার দিন ধার্য ছিল। গত ২৮ ডিসেম্বর এ দিন ঠিক করেন ট্রাইব্যুনাল-২। তবে প্রতিবেদন জমা না দেয়ায় প্রসিকিউশনের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে আরো সময় বাড়ানো হয়।
এদিকে, বুধবার সকালে কারাগার থেকে এ মামলায় গ্রেফতার ছয় আসামিকে ট্রাইব্যুনালে হাজির করে পুলিশ। তারা হলেন ময়মনসিংহ-৩ (গৌরীপুর) আসনের সাবেক এমপি নাজিম উদ্দিন আহমেদের ছেলে তানজির আহমেদ রাজিব, গৌরীপুর থানার তৎকালীন এসআই শফিকুল আলম, এএসআই দেলোয়ার হোসাইন, স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা শাহাবুল আলম, জোসেফ উদ্দিন জজ ও আতাউর রহমান ফকির ওরফে ফারুক আহাম্মদ। উল্লেখ্য, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গৌরীপুর থানার সামনে পুলিশসহ আওয়ামী লীগ ও অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা হামলা চালান। এতে বিপ্লব হাসান, মো: নূরে আলম সিদ্দিকী ও মো: জুবায়ের শহীদ হন। আহত হন বহু ছাত্র-জনতা। এর পরিপ্রেক্ষিতে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে আসামিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলা হয়।