বহুমুখী সঙ্কটে প্রতিযোগিতা হারাচ্ছে উৎপাদন খাত
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
বহুমুখী চাপে ক্রমেই প্রতিযোগিতার সক্ষমতা হারাচ্ছে দেশের উৎপাদন খাত। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট, উচ্চ উৎপাদন ব্যয়, ব্যাংক ঋণের বাড়তি সুদের হার, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং অবৈধ আমদানির চাপে শিল্পখাত এখন গভীর সঙ্কটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। বিশেষ করে দেশের প্রধান রফতানিমুখী বস্ত্র, তৈরি পোশাক ও সিরামিক খাত সক্ষমতার তুলনায় অনেক কম উৎপাদনে চলছে। এর প্রভাব পড়ছে কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ, রফতানি সক্ষমতা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার ওপর।
শিল্প-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দীর্ঘদিনের জ্বালানি সঙ্কট উৎপাদন খাতকে কার্যত অচল করে দিচ্ছে। অনেক এলাকায় গ্যাস সরবরাহ অনিয়মিত, কোথাও আবার একেবারেই বন্ধ। শিল্পখাতে ক্যাপটিভ পাওয়ার প্ল্যান্ট চালু রাখতে যেখানে ন্যূনতম ১৫ পিএসআই গ্যাসচাপ প্রয়োজন, সেখানে বাস্তবে শিল্পাঞ্চলের বড় অংশেই তা পাওয়া যাচ্ছে না। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মানিকগঞ্জ ও ময়মনসিংহের মতো গুরুত্বপূর্ণ শিল্প এলাকায় গ্যাস সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ফলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সময়মতো রফতানি আদেশ পূরণ করা কঠিন হয়ে পড়ছে।
বাংলাদেশ টেক্সটাইল মিলস অ্যাসোসিয়েশন (বিটিএমএ) জানিয়েছে, দেশের অভ্যন্তরীণ বস্ত্র ও পোশাক বাজারের আকার প্রায় ১৪ হাজার কোটি টাকা এবং বছরে কাপড়ের চাহিদা প্রায় আট বিলিয়ন মিটার। কিন্তু এত বড় বাজার থাকা সত্ত্বেও খাতটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে। গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কট, উচ্চ সুদের হার এবং ইনপুট ব্যয় বাড়ায় অনেক কারখানা সক্ষমতার তুলনায় কম উৎপাদনে বাধ্য হচ্ছে, আবার উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কারখানা বন্ধও হয়ে যাচ্ছে।
বিটিএমএ সভাপতি শওকত আজিজ রাসেল বলেন, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সঙ্কটের কারণে প্রতি কেজি সুতা উৎপাদনে ব্যয় বেড়েছে প্রায় ৫০ শতাংশ। ইনপুট খরচ প্রায় তিনগুণ বেড়েছে, এর সাথে যুক্ত হয়েছে শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি। বর্তমানে খাতটির প্রায় ৩৫ শতাংশ উৎপাদন সক্ষমতা অব্যবহৃত রয়েছে এবং সাম্প্রতিক মাসগুলোতে অন্তত ৫০টি বড় টেক্সটাইল মিল বন্ধ হয়ে গেছে। ফলে হাজার হাজার শ্রমিক কর্মসংস্থান হারাচ্ছেন কিংবা পেশা পরিবর্তনে বাধ্য হচ্ছেন।
শিল্প উদ্যোক্তাদের অভিযোগ, অবৈধভাবে আমদানিকৃত সুতা ও কাপড় বাজারে অন্যায্য প্রতিযোগিতা তৈরি করছে। আন্ডার-ইনভয়েসিং ও চোরাচালানের মাধ্যমে বিদেশী কাঁচামাল দেশীয় পণ্যের তুলনায় অনেক কম দামে বাজারে ঢুকছে। ফলে স্থানীয় মিলগুলোর বাজার অংশীদারত্ব কমে যাচ্ছে। একই সাথে রফতানির উদ্দেশ্যে শুল্কমুক্ত সুবিধায় আমদানি করা কাঁচামাল স্থানীয় বাজারে সরিয়ে দেয়ার অভিযোগও রয়েছে, যা বাজারকে আরো অস্থির করছে।
লিটল গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক খোরশেদ আলম বলেন, মিথ্যা ঘোষণা দিয়ে ঢুকছে প্রায়ই বিপুল পরিমাণ সুতা ও কাপড় দেশে প্রবেশ করছে। কর ফাঁকি দিয়ে আনা এসব পণ্য স্থানীয় পণ্যের তুলনায় প্রায় ২০ শতাংশ কম দামে বিক্রি হচ্ছে, যা দেশীয় শিল্পের জন্য মারাত্মক হুমকি।
এ দিকে প্রতিযোগী দেশগুলো যেখানে বস্ত্র ও পোশাক খাতকে টিকিয়ে রাখতে ভর্তুকি ও প্রণোদনা দিচ্ছে, সেখানে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে নগদ সহায়তা কমিয়ে আনছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে দেশীয় কাপড় ব্যবহারের বিপরীতে নগদ সহায়তা দুই শতাংশ থেকে কমিয়ে ০.৫ শতাংশে নামানো হয়েছে। নতুন বাজার ও নতুন পণ্যের জন্য দেয়া প্রণোদনাও কমেছে। উদ্যোক্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে এ নগদ সহায়তা শিল্পের জন্য এক ধরনের লাইফলাইন হিসেবে কাজ করলেও এখন তা কমে যাওয়ায় সঙ্কট আরো গভীর হচ্ছে।
এ দিকে শিল্পখাতের সঙ্কট শুধু বস্ত্রখাতে সীমাবদ্ধ নয়। সিরামিক শিল্পও গ্যাস সঙ্কটে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আকিজ বশির গ্রুপের চিফ অপারেটিং অফিসার মোহাম্মদ খোরশেদ আলম বলেন, সিরামিক উৎপাদনে গ্যাস হচ্ছে অক্সিজেন। গ্যাসের চাপে সামান্য ওঠানামা হলেই বিশাল ক্ষতি হয়ে যায়। শুধু গ্যাস সঙ্কটের কারণে ২০২১-২২ সালের দিকে আকিজ সিরামিককে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা লোকসান গুনতে হয়েছে।
তিনি বলেন, বিকল্প হিসেবে বায়োগ্যাস ও এলপিজিতে যেতে হয়েছে। কিন্তু শিল্প উৎপাদনের জন্য এলপিজি কখনোই প্রথম পছন্দ হতে পারে না। এর দাম দেশীয় গ্যাসের তুলনায় প্রায় ২০০ শতাংশ বেশি। তবুও উৎপাদন সচল রাখতে বাধ্য হয়ে এ পথে যেতে হয়েছে। কারণ উৎপাদন বন্ধ হলে বাজারে সরবরাহ কমে যায়, ভোক্তার আস্থা নষ্ট হয়।
বাংলাদেশ সিরামিক ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিসিএমইএ) জানায়, গ্যাস সঙ্কটের কারণে এ খাতের উৎপাদন ক্ষমতার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ অব্যবহৃত থাকছে। সাভার ও ধামরাই অঞ্চলের কারখানাগুলো সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত। পর্যাপ্ত গ্যাস না পেয়ে একাধিক কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধও হয়ে গেছে।
বিসিএমইএর মহাসচিব ইরফান উদ্দিন বলেন, দেশীয় সিরামিক শিল্প দেশের চাহিদার ৮০ শতাংশের বেশি পূরণ করছে, ফলে বছরে অন্তত ৫০০ মিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয় হচ্ছে। কিন্তু এ শিল্প ক্ষতিগ্রস্ত হলে আমদানিনির্ভরতা বাড়বে এবং বছরে এক বিলিয়ন ডলারের বেশি খরচ করতে হবে।
তিনি আরো বলেন, গ্যাস সরবরাহে আগাম সতর্কতা না থাকায় শত শত কোটি টাকার কাঁচামাল নষ্ট হচ্ছে। এতে উৎপাদন ব্যয় বাড়ছে এবং রফতানি আদেশ পাওয়াও কঠিন হয়ে পড়ছে। ক্রেতারা সময়মতো পণ্য সরবরাহের নিশ্চয়তা না পেলে অর্ডার দিতে আগ্রহী হন না।
সামগ্রিকভাবে শিল্পখাতের এ সঙ্কট দেশের অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতাকেই সামনে আনছে। সর্বশেষ অর্থনৈতিক শুমারির তথ্যে দেখা যায়, মোট অর্থনৈতিক ইউনিটের মধ্যে উৎপাদন খাতের অংশ মাত্র ৮.৭৭ শতাংশে নেমে এসেছে, যেখানে ২০১৩ সালে ছিল ১১.৫৪ শতাংশ। বিপরীতে সেবা খাতের অংশ বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯১.২৩ শতাংশে। অর্থনীতিবিদরা বলছেন, শিল্পায়ন সম্পূর্ণ হওয়ার আগেই সেবা খাতে ঝুঁঁকে পড়া দেশের জন্য অস্বাভাবিক ও ঝুঁঁকিপূর্ণ।
পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশের চেয়ারম্যান এম মাসরুর রিয়াজ বলেন, প্রতিবছর প্রায় ২০ লাখ নতুন তরুণ শ্রমবাজারে আসছে। উৎপাদন খাত দুর্বল হলে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান সৃষ্টি সম্ভব নয়। এটি দীর্ঘমেয়াদে সামাজিক ও অর্থনৈতিক সঙ্কট তৈরি করতে পারে।
শিল্প উৎপাদন বাড়লেও কর্মসংস্থান না বাড়াকে অর্থনীতিবিদরা ‘চাকরিহীন প্রবৃদ্ধি’ হিসেবে আখ্যা দিচ্ছেন। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার সাবেক উপদেষ্টা রিজওয়ানুল ইসলাম বলেন, আধুনিক ও স্বয়ংক্রিয় শিল্পে বিনিয়োগ বাড়লেও দক্ষ শ্রমিকের ঘাটতি এবং উৎপাদন ব্যয়ের চাপ কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত করে ফেলছে।
এ দিকে বাংলাদেশ রেস্তোরাঁ মালিক সমিতির মহাসচিব ইমরান হাসান বলেছেন, এক হাজার ৩০০ টাকার এলপি গ্যাসের সিলিন্ডার কয়েক দিনের মধ্যে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত হয়ে গেছে। সরকারের কোনো উপদেষ্টা এ নিয়ে কথা বলছেন না, কোনো কার্যক্রম নেই। শুধু ভোক্তা অধিদফতর লোক দেখানো কিছু জরিমানা করছে। তাতে আরো হিতে বিপরীত হয়েছে।
গতকাল ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, দেশে এখন লুটেরা, সাম্রাজ্যবাদীরা এলপি গ্যাসের ব্যবসা করছে। তারা কৃত্রিম সঙ্কট তৈরি করে এলপি গ্যাসের দাম বাড়িয়েছে। বেশিরভাগ রেস্তোরাঁ গ্যাস পাচ্ছে না। যারা কিনছে, তারা এক হাজার ৩০০ টাকার সিলিন্ডারের জন্য তিন হাজার টাকা পর্যন্ত খরচ করছেন। এ অবস্থায় পেট্রোবাংলা ঠুঁঁটো জগন্নাথ হয়ে বসে রয়েছে। তিনি আরো বলেন, জুলাইবিপ্লবে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকারের কাছে দেশের মানুষ ও ব্যবসায়ীদের প্রত্যাশা ছিল অনেক।
বিগত দিনের অন্যায়-অত্যাচার, জুলুম থেকে মুক্তি মিলবে বলেই প্রত্যাশা ছিল সবার। কিন্তু বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার এক বছরের বেশি সময় অতিবাহিত হওয়ার পরও বিগত দিনের প্রতিবন্ধকতা দিন দিন বাড়ছে।
তথ্যে বিশ্লেষণে দেখা যায়, দেশে হোটেল ও রেস্তোরাঁ খাতে কর্মরত ৩০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে দুই কোটি মানুষ জড়িত। অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশে কমপক্ষে ৩০ শতাংশ লোক খাওয়াদাওয়ার বিষয়ে রেস্তোরাঁর ওপর নির্ভর করবে। রেস্তোরাঁ সেক্টরে কর্মসংস্থান তৈরি হবে, দেশের জিডিপিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখবে এ সেক্টর। সুতরাং রেস্তোরঁাঁ সেক্টরের দিকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিন। আর যদি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরি না হয়, অভিযানের নামে হয়রানি বন্ধ না করা হয় এবং গ্যাস সঙ্কটসহ সব সমস্যা সমাধান না হয়, তবে ব্যবসা বন্ধ করে মালিক ও কর্মচারীরা রাস্তায় নেমে আসতে বাধ্য হবে।
অর্থনীতিবিদরা মনে করছেন, উৎপাদন ব্যয় কমানো, নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, অবৈধ আমদানি বন্ধ করা এবং শিল্পবান্ধব নীতি বাস্তবায়ন না হলে দেশের শিল্পখাত আরো গভীর সঙ্কটে পড়বে। শক্তিশালী উৎপাদন খাত ছাড়া কর্মসংস্থান, রফতানি ও দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা কঠিন হয়ে পড়বে বলেও তারা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন।