এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়ন, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, উদীয়মান প্রযুক্তি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কারিগরি সমন্বয় জোরদারের লক্ষ্যে ৭-১১ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ পর্যন্ত পাঁচ দিনব্যাপী এশিয়া-প্যাসিফিক টেলিকমিউনিটি (এপিটি)’র ‘AWG-37’ প্রোগ্রাম ঢাকার রেডিসন ব্লু ওয়াটার গার্ডেন এ শুরু হয়েছে।

এপিটির তত্ত্বাবধানে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ রেগুলেটরি কমিশনের (বিটিআরসি) আয়োজনে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক এ প্রোগ্রামের আজকের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি এবং বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো: এমদাদ উল বারী (অব.)-সহ সরকারি/বেসরকারি বিভিন্ন দফতরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাগণ উপস্থিত ছিলেন।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী ফকির মাহবুব আনাম বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ শুধু সংযোগ বাড়ানো নয়, বরং সেবার মান, সাশ্রয়, নির্ভরযোগ্যতা ও অর্থবহ সংযোগ নিশ্চিত করা। ডিজিটাল সংযোগের মাধ্যমে নাগরিকদের জন্য নতুন সুযোগ সৃষ্টি, অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডে সহায়তা এবং দেশের যেকোনো প্রান্তের মানুষকে প্রযুক্তির সুফল পাওয়ার সুযোগ নিশ্চিত করতে হবে।

মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে বর্তমানে বড় ও দ্রুত পরিবর্তনশীল টেলিযোগাযোগ বাজার রয়েছে। ২০২৬ সালের জুলাই পর্যন্ত দেশে প্রায় ১৯ কোটি মোবাইল সংযোগ এবং প্রায় ১১ কোটি গ্রাহক ফোর-জি সেবা ব্যবহার করছেন। টেলিযোগাযোগ অবকাঠামোর মধ্যে রয়েছে ৪৯ হাজারের বেশি ফোর-জি সাইট, ৪৬ হাজার টাওয়ার এবং প্রায় ১ লাখ ৭৩ হাজার কিলোমিটার অপটিক্যাল ফাইবার নেটওয়ার্ক।

তিনি বলেন, এসব পরিসংখ্যান দেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ব্যাপকতা তুলে ধরে। তবে এখন সরকারের লক্ষ্য শুধু আরো বেশি কানেক্টিভিটি নয়; বরং সেবার মান, সাশ্রয়ী মূল্য, নির্ভরযোগ্যতা ও অর্থবহ সংযোগ নিশ্চিত করা।

তিনি বলেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সফটওয়্যার, হার্ডওয়্যার এবং প্রযুক্তিনির্ভর অন্যান্য শিল্পে দেশের সক্ষমতা আরো বাড়ানোর পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে বৈশ্বিক ডিজিটাল অর্থনীতিতে বাংলাদেশের অবস্থান আরো শক্তিশালী করার লক্ষ্য রয়েছে।

মন্ত্রী বলেন, এই যাত্রায় স্পেকট্রাম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ডেটার চাহিদা বাড়ার পাশাপাশি ফাইভ-জি, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ, ইন্টারনেট অব থিংগস (আইওটি) এবং ভবিষ্যতের অন্যান্য ওয়্যারলেস প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। এসব প্রযুক্তির জন্য এমন দূরদর্শী নীতি প্রয়োজন, যা উদ্ভাবন, বিনিয়োগ এবং গ্রাহকদের জন্য উন্নত সেবা নিশ্চিত করতে সহায়তা করবে।

ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের সচিব বিলকিস জাহান রিমি বলেন, টেলিযোগাযোগ খাত দ্রুত পরিবর্তিত হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে সরকার ও প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের নীতি ও কার্যক্রমের সাথে মানিয়ে নিতে হবে। নতুন প্রযুক্তি নানা সুযোগ তৈরি করলেও এর সুফল নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতি এবং সরকার, নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিল্প খাতসহ সংশ্লিষ্টদের মধ্যে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় প্রয়োজন।

তিনি বলেন, এপিটি ওয়্যারলেস গ্রুপ এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে উদীয়মান ডিজিটাল চাহিদা পূরণে বিভিন্ন ওয়্যারলেস ব্যবস্থার নানা দিক নিয়ে কাজ করে। একইসাথে কার্যকর রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা গড়ে তোলা এবং প্রযুক্তি ও জ্ঞান স্থানান্তরেও এটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

এপিটি মহাসচিব মাসানোরি কোন্দো বলেন, এই সভার মাধ্যমে চলমান গবেষণাকাজকে এগিয়ে নেয়া হবে এবং প্রযুক্তিগত উন্নয়ন ও আঞ্চলিক প্রয়োজনের পরিপ্রেক্ষিতে নতুন কর্মসূচি গ্রহণের প্রস্তাবগুলো বিবেচনা করা হবে। AWG -37 সভায় ৬জি প্রযুক্তিতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট প্রযুক্তি এবং আল্ট্রা ওয়াইডব্যান্ড বিষয়ে বিশেষ কর্মশালার আয়োজন করা হবে। এসব কর্মশালা আমাদের অঞ্চলের জন্য এই প্রযুক্তিগুলোর সম্ভাব্য প্রভাব নিয়ে অভিজ্ঞতা বিনিময়, বিশেষজ্ঞ মতামত প্রদান এবং আলোচনা করার সুযোগ সৃষ্টি করবে। এ ছাড়াও, কৌশলগত পরিকল্পনা প্রণয়নসংক্রান্ত কাজেও এডব্লিউজি সম্প্রদায়ের সদস্যদের অবদান রাখার কথা উল্লেখ করেন তিনি।

এপিটি ওয়্যারলেস গ্রুপের সভাপতি দেজং কিম বলেন, বেতার যোগাযোগ একটি গভীর রূপান্তরের মধ্য দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছে। আইএমটি-২০৩০ ও ভবিষ্যৎ ৬জি প্রযুক্তির উন্নয়ন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ক্রমবর্ধমান ব্যবহার, স্যাটেলাইট যোগাযোগের সম্প্রসারণ এবং স্পেকট্রামের বাড়তি চাহিদাগুলো আমাদের সামনে নতুন সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ উভয়ই সৃষ্টি করছে। এই দ্রুত পরিবর্তনশীল পরিবেশে আমাদের পারস্পরিক সহযোগিতা আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। কোনো একক দেশ বা প্রতিষ্ঠান একা এসব চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারে না। AWG-এর মাধ্যমে আমরা আমাদের দক্ষতা ও অভিজ্ঞতাকে একত্রিত করতে পারি, পারস্পরিক বোঝাপড়া আরো শক্তিশালী করতে পারি এবং বিশ্বব্যাপী ও আঞ্চলিকভাবে প্রাসঙ্গিক সমাধান উন্নয়নে অবদান রাখতে পারি।

সভাপতির বক্তব্যে বিটিআরসি’র চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মো: এমদাদ উল বারী (অব.) বলেন, তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে আঞ্চলিক সহযোগিতা ও প্রযুক্তিগত জ্ঞান বিনিময় আরো জোরদার করতে চায় বাংলাদেশ। একইসাথে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের প্রযুক্তিগত সক্ষমতা বৃদ্ধিতে আরো সক্রিয় ভূমিকা রাখতেও আমরা আগ্রহী।

তিনি বলেন, ঢাকায় ‘AWG-37 আয়োজন’ বাংলাদেশের জন্য এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের বেতার যোগাযোগ ও স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা বিষয়ে চলমান আন্তর্জাতিক কারিগরি আলোচনায় আরো সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ। এ আয়োজনের মাধ্যমে বাংলাদেশের নিয়ন্ত্রক সংস্থা, শিল্পখাত, একাডেমিয়া ও কারিগরি বিশেষজ্ঞদের সাথে এপিটির সদস্য দেশগুলো এবং আন্তর্জাতিক পর্যায়ের বিশেষজ্ঞদের সরাসরি মতবিনিময়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে।

উল্লেখ্য, এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলে বেতার যোগাযোগ সংক্রান্ত আঞ্চলিক সহযোগিতা ও কারিগরি সমন্বয়ের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্ম হলো- এপিটির ওয়্যারলেস গ্রুপ (AWG), যা সদস্য দেশগুলোর শিল্পখাত, একাডেমিয়া, বেতার যোগাযোগ, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ এবং উদীয়মান প্রযুক্তি বিষয়ে কারিগরি জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়, গবেষণা এবং আঞ্চলিক সমন্বয়ে কাজ করে।

এ প্ল্যাটফর্মে এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের দেশগুলো (বাংলাদেশ, আফগানিস্তান, অস্ট্রেলিয়া, ভুটান, ব্রুনেই, কম্বোডিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ইরান, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, লাওস, মালয়েশিয়া, মালদ্বীপ, মঙ্গোলিয়া, মিয়ানমার, নেপাল, নিউজিল্যান্ড,পাকিস্তান,পাপুয়া নিউগিনি, ফিলিপাইন, সলোমন দ্বীপপুঞ্জ, থাইল্যান্ড, ভিয়েতনাম) বেতার যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন, কার্যকর রেডিও যোগাযোগব্যবস্থা, স্পেকট্রামের দক্ষ ব্যবহার এবং প্রযুক্তিগত জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা বিনিময়ের বিষয়ে যৌথভাবে কাজ করে।

বিশেষভাবে উল্লেখ্য, ঢাকায় অনুষ্ঠিত AWG-37 সভাগুলোয় ভবিষ্যৎ বেতার যোগাযোগ প্রযুক্তি, স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা এবং নতুন প্রজন্মের মোবাইল যোগাযোগ ব্যবস্থার কারিগরি কার্যক্রম নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হবে। পাঁচ দিনব্যাপী এ সভায় এপিটি সদস্যভুক্ত বিভিন্ন দেশের মোট ৩৯৫ জন (সরাসরি ১৬৮ জন এবং ভার্চুয়ালি ২২৭ জন) অংশগ্রহণ করবেন, যেখানে ২টি প্লানারি সভাসহ মোট ৫২টি সেশন অনুষ্ঠিত হবে। এ সেশনগুলোতে ৫জি সম্প্রসারণ, ভবিষ্যৎ IMT/৬জি ব্যবস্থা, স্পেকট্রাম পরিকল্পনা, স্পেকট্রাম শেয়ারিং, স্যাটেলাইট ও নিম্ন-কক্ষপথের স্যাটেলাইটভিত্তিক যোগাযোগ, রেলওয়ে বেতার যোগাযোগ এবং আঞ্চলিক অভিজ্ঞতা ও কারিগরি জ্ঞান বিনিময় করা সম্ভব হবে।

এর আগে গত ৫-৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ ঢাকায় এপিটি ফ্রিকোয়েন্সি ইনফরমেশন সিস্টেম (AFIS)-সংক্রান্ত প্রশিক্ষণ কার্যক্রম অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে এপিটির সদস্য দেশগুলোর মধ্যে ফ্রিকোয়েন্সি তথ্য ব্যবস্থাপনা বিষয়ে সমন্বিত ধারণা তৈরি করা এবং এপিটি ফ্রিকোয়েন্সি ইনফরমেশন সিস্টেমে সদস্য দেশগুলোর তথ্য হালনাগাদে সহায়তা করার বিষয় আলোচনা করেন ।