কারসাজির নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের মাধ্যমে জালিয়াতির ভিত্তি নির্মাণ
তদন্তে উদঘাটিত রাষ্ট্রীয় নিয়োগব্যবস্থার কাঠামোগত দুর্বলতা ও রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
অবাধ, সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও প্রতিযোগিতামূলক নির্বাচন গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূল ভিত্তি। এ ব্যবস্থার প্রথম ও সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো একটি স্বাধীন, দক্ষ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশন। বাংলাদেশের সংবিধানের ১১৮ অনুচ্ছেদে নির্বাচন কমিশন গঠনের কথা বলা হলেও দীর্ঘদিন কোনো নির্দিষ্ট আইন ছাড়াই প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়ে আসা হয়েছে।
জাতীয় নির্বাচন (২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪) তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে উঠে এসেছে- আইনগত শূন্যতা, রাষ্ট্রপতির সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রধানমন্ত্রীর প্রাধান্য ব্যবহার করে নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়াকে বারবার উদ্দেশ্যপূর্ণভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়েছে। লোকদেখানো সংলাপ, অনুসন্ধান কমিটি ও তথাকথিত রাজনৈতিক ঐকমত্যের আড়ালে ক্ষমতাসীনদের বিশ্বস্ত ও সুবিধাভোগী ব্যক্তিদেরই ধারাবাহিকভাবে নির্বাচন কমিশনে বসানো হয়েছে।
আইন না থাকায় ‘লোকদেখানো’ প্রক্রিয়ার সূচনা : সংবিধানের ৪৮(৩) অনুচ্ছেদ অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি প্রধান বিচারপতি ও প্রধানমন্ত্রী নিয়োগ ছাড়া অন্য সব বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী কাজ করতে বাধ্য। ফলে ১৯৭৩ সাল থেকেই নির্বাচন কমিশন নিয়োগ কার্যত প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছানির্ভর একটি প্রক্রিয়ায় পরিণত হয়।
২০১২ সাল থেকে এই নিয়ন্ত্রণকে আরো ‘প্রাতিষ্ঠানিক রূপ’ দিতে শুরু হয়- রাষ্ট্রপতির নামে সংলাপ, অনুসন্ধান কমিটি ও দলগুলোর কাছ থেকে নাম চাওয়ার নাটকীয় আয়োজন করা হয়, যদিও বাস্তবে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নেয়া হতো প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা অনুযায়ী।
একাদশ কমিশনে (২০১২) প্রস্তাব তালিকার বাইরে নিয়োগ : ২০১৪ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে গঠিত একাদশ নির্বাচন কমিশনের ক্ষেত্রেই প্রথম বড় আকারে এই কারসাজির চিত্র স্পষ্ট হয়।
রাষ্ট্রপতির আহ্বানে ২৪টি রাজনৈতিক দল সংলাপে অংশ নিলেও মাত্র আটটি দল নাম প্রস্তাব করে। প্রস্তাবিত ২৫ জনের তালিকায় কাজী রকীবউদ্দিনের নাম কোনো দলই দেয়নি। তবুও তাকেই প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়।
তদন্ত কমিশনের মতে, অনুসন্ধান কমিটি প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশে তালিকায় নতুন নাম অন্তর্ভুক্ত করে এবং রাষ্ট্রপতি সেই সুপারিশ অনুযায়ী নিয়োগ দেন। নিয়োগপ্রাপ্ত পাঁচ কমিশনারের সবাই কোনো না কোনোভাবে ক্ষমতাসীন দলের সুবিধাভোগী বা রাজনৈতিকভাবে ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত ছিলেন।
দ্বাদশ কমিশনে (২০১৭) সঙ্ঘবদ্ধ প্রস্তাবের ছক : ২০১৭ সালে দ্বাদশ নির্বাচন কমিশন গঠনের সময় আগের একই কৌশল আরো নিখুঁতভাবে প্রয়োগ করা হয়।
৩১টি দলের কাছ থেকে ১২৩টি নাম এলেও দেখা যায় যেসব নাম শেষ পর্যন্ত নিয়োগ পান, সেগুলো প্রায় সবাই আওয়ামী লীগপন্থী বা জোটভুক্ত একাধিক দল কর্তৃক একযোগে প্রস্তাবিত। তদন্ত কমিশনের ভাষায়, এটি ছিল ‘পর্দার আড়ালে সঙ্ঘবদ্ধ ও নিখুঁত পরিকল্পনার ফল’।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার কে এম নুরুল হুদা ও অন্য কমিশনাররা সবাই তৎকালীন সরকারের প্রতি বিশ্বস্ত হিসেবে পরিচিত ছিলেন। কমিশনের সিদ্ধান্ত গ্রহণে সরকারের প্রভাব ছিল প্রকাশ্য ও নিয়মিত।
ত্রয়োদশ কমিশনে (২০২২) ত্রুটিপূর্ণ আইনের জন্ম : দীর্ঘদিন আইন না থাকার পর হঠাৎ করে ২০২২ সালের জানুয়ারিতে মাত্র কয়েক দিনের মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ আইন, ২০২২ পাস করা হয়।
বিরোধী দলগুলোর ৭২টি সংশোধনী প্রস্তাব কার্যত উপেক্ষা করে কয়েক মিনিটের আলোচনায় বিলটি পাস হয়। তদন্ত কমিশনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কোনো নির্দেশক নীতিমালাই এ আইনে প্রতিফলিত হয়নি।
আইনের প্রধান ত্রুটি : এই আইনের প্রধান ত্রুটি হলো- অনুসন্ধান কমিটির স্বাধীনতা নিশ্চিত করার কোনো কার্যকর সুরক্ষা নেই; যোগ্যতা ও নিরপেক্ষতার মানদণ্ড অস্পষ্ট; অনুসন্ধান কমিটির কার্যক্রম আদালতে চ্যালেঞ্জ করা নিষিদ্ধ (দায়মুক্তি ধারা); রাজনৈতিক ঐকমত্য ও বিরোধী দলের অংশগ্রহণের কোনো বাধ্যবাধকতা নেই; প্রস্তাবিত নাম জনসম্মুখে যাচাইয়ের সুযোগ নেই। এই আইনের আওতায় গঠিত ত্রয়োদশ কমিশনের ক্ষেত্রেও দেখা যায়- নিয়োগপ্রাপ্তদের নাম মূলত আওয়ামী লীগ ও তার মিত্র দলগুলোই প্রস্তাব করেছে।
নিয়োগের পর নিয়ন্ত্রণ, পদত্যাগেও বাধা : তদন্ত কমিশনের প্রতিবেদনে আরো গুরুতর অভিযোগ উঠে এসেছে- নিয়োগের পরও কমিশনাররা স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেননি।
একাধিক সাক্ষ্যে বলা হয়েছে, কোনো কোনো কমিশনার সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় বা উপদেষ্টাদের সাথে যোগাযোগ রেখে সিদ্ধান্ত নিতেন। আবার কেউ সরকারের অতিরিক্ত চাপ সহ্য করতে না পেরে পদত্যাগ করতে চাইলে গোয়েন্দা সংস্থার মাধ্যমে ভয়ভীতি প্রদর্শন করে, তা ঠেকানো হয়েছে।
ত্রয়োদশ কমিশনের প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়ালের একাধিকবার পদত্যাগের সিদ্ধান্ত তদন্ত কমিশনের সামনে উঠে এসেছে- কিন্তু বাস্তবে তা আর কার্যকর হয়নি।
তদন্ত কমিশনের সার্বিক বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের নির্বাচন কমিশন গঠনের প্রক্রিয়া দীর্ঘদিন ধরে একটি নিয়ন্ত্রিত, উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ও রাজনৈতিকভাবে কারসাজিপূর্ণ ব্যবস্থাতে পরিণত হয়েছে।
আইনের অনুপস্থিতি থেকে শুরু করে ত্রুটিপূর্ণ আইন প্রণয়ন- সব ক্ষেত্রেই মূল লক্ষ্য ছিল ক্ষমতাসীনদের অনুগত ব্যক্তিদের নির্বাচন কমিশনের শীর্ষে বসানো। এর পরিণতিতে নির্বাচন কমিশন একটি স্বাধীন সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠান না থেকে ক্রমে সরকারের সম্প্রসারিত যন্ত্রে রূপ নিয়েছে।
গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের জন্য তদন্ত কমিশনের ইঙ্গিত স্পষ্ট- নির্বাচন কমিশন নিয়োগে কেবল আইন নয়, স্বচ্ছতা, রাজনৈতিক ঐকমত্য ও কার্যকর সাংবিধানিক সুরক্ষা নিশ্চিত করা ছাড়া বিকল্প নেই।