চট্টগ্রামে আতঙ্কে ব্যবসায়ীরা
চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিন
Printed Edition
ব্যবসায়ীদের কাছে সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির ঘটনা পুরনো হলেও সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে তা সব সীমা-পরিসীমা অতিক্রম করেছে। বন্দরনগরী চট্টগ্রাম যেন এখন সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির স্বর্গরাজ্যে পরিণত হয়েছে।
গত সোমবার চট্টগ্রামে ইন্টারনেট সেবা প্রদানকারী একটি প্রতিষ্ঠানের মালিককে দুই কোটি টাকা চাঁদা দাবিতে দুই দিনের সময় বেঁধে দিয়েছিল সন্ত্রাসী ডেভিড ইমন। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে চাঁদা না দেয়ায় ওই ব্যবসায়ীর প্রতিষ্ঠানে প্রকাশ্যে সশস্ত্র হামলা ও লুটপাট করে তার সহযোগীরা। এই ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, শুধু এই একটি ঘটনা নয়; এর আগে চট্টগ্রামের চকবাজার চন্দনপুরা এলাকায় এক শিল্পপতির বাড়ি লক্ষ্য করে প্রকাশ্যে দুই দফা ভারী অস্ত্রশস্ত্র দিয়ে গুলিবর্ষণ করা হয় চাঁদার জন্য। একাধিক চিহ্নিত সন্ত্রাসী গ্রুপ এভাবে নগরীতে বিত্তবান ও সচ্ছল ব্যবসায়ীদের টার্গেট করে হুমকি-ধমকি, চাঁদা দাবি এবং তা না পেলে হামলার ঘটনা ঘটাচ্ছে।
চাঁদাবাজির দু’-একটি ঘটনা প্রকাশ্যে এলেও অধিকাংশ ঘটনা থেকে যাচ্ছে আড়ালে। ভুক্তভোগী অধিকাংশ ব্যবসায়ী সন্ত্রাসীদের অত্যাচার নীরবে সহ্য করে যাচ্ছেন। তারা হয় প্রাণ বাঁচাতে ব্যবসায় গুটিয়ে ফেলছেন, নয়তো সন্ত্রাসীদের চাঁদা দিয়েই টিকে থাকার লড়াই করছেন। বিচার না পাওয়া কিংবা প্রাণ যাওয়ার আশঙ্কায় বেশির ভাগ ক্ষেত্রে থানায় অভিযোগও দিচ্ছেন না।
দিন-দুপুরে চাঁদা না দেয়ায় যে হামলার ঘটনা ঘটেছে তাতে ব্যবসায়ীদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার কারণ নেই। প্রশ্ন হলো- পুলিশের নীরবতায় কি প্রকাশ্য দিবালোকে এমন ঘটনা ঘটেছে? তা না হলে এই ঘটনায় এখন পর্যন্ত কেন কাউকে গ্রেফতার করা গেল না? বলা হচ্ছে বিদেশে পলাতক শীর্ষ সন্ত্রাসীদের মদদে চট্টগ্রামে এমন সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড ঘটছে। কিন্তু বিদেশে বসে থাকা সন্ত্রাসীদের হয়ে যারা চট্টগ্রামে এমন কাজ করছে তাদের গ্রেফতারে শিথিলতা কেন?
পতিত স্বৈরশাসক ও ছাত্র-জনতার খুনি শেখ হাসিনার আমলে দেশ চাঁদাবাজদের আখড়ায় পরিণত হয়েছিল। হাটবাজারসহ এমন কোনো বিভাগ ছিল না, যেখান থেকে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা চাঁদাবাজি করত না। ফলে নিত্যপণ্যের দাম যেমন বেড়ে গিয়েছিল, তেমনি গাড়ি ভাড়াসহ অন্যান্য জিনিসপত্রের দামও বেড়েছিল। তখন আওয়ামী লীগের কাছে জনগণ অনেকটা অসহায় হয়ে পড়েছিল।
চব্বিশের গণ-অভ্যুত্থানের পর আশা করা হয়েছিল, চাঁদাবাজির অবসান হবে; কিন্তু তা পুরোপুরি সম্ভব হয়নি। এখন নির্বাচিত সরকারের সময় চট্টগ্রামে যে হারে চাঁদাবাজি শুরু হয়েছে তা শুধু আওয়ামী আমলের চাঁদাবাজির সাথেই তুলনা করা চলে। চট্টগ্রামের সন্ত্রাসীদের চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে এখনই কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে। না হয় এই সমস্যা আরো প্রকট হয়ে সারা দেশে ছড়িয়ে যেতে পারে।
বিএনপি সরকার সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে পারে, সে ইতিহাস তাদের আছে। ২০০১ সালের নির্বাচনে তখনকার বিএনপি-জামায়াত জোট আওয়ামী আমলের সন্ত্রাস ও চাঁদাবাজ দমনের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল। নির্বাচিত হয়ে বিএনপি-জামায়াত জোট সে প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নও করেছিল ‘অপারেশন ক্লিন হার্ট’ নামে অভিযানের মধ্যে। যদিও সে অপারেশনে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ রয়েছে। বর্তমানে চাঁদাবাজদের দমনে মানবাধিকার লঙ্ঘন হবে না, এমন একটি অভিযান অপরিহার্য হয়ে পড়েছে।
চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবসায়ীসহ দেশের শান্তিকামী মানুষ একাট্টা। সংসদের বিরোধীদলীয় নেতাও চট্টগ্রামের চাঁদাবাজির ঘটনায় বলেছেন, ‘দুর্বৃত্তদের সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিচয় থাকলে তা প্রকাশ করুন। তাদের পাকড়াও করে আইনের আওতায় আনুন।’ এখন সন্ত্রাসী ও চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে- তাদের সাথে সরকারের কোনো সম্পর্ক নেই।