পূর্বমুখী কূটনীতির নতুন অধ্যায়
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ
Printed Edition
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ সড়ক নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা সঙ্কট, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ- সব কিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে
পরিবর্তিত বিশ্বব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বরাজনীতি ও অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে এশিয়ার দিকে সরে আসছে। এই বাস্তবতায় বাংলাদেশের জন্য পূর্বমুখী কূটনীতি কেবল একটি বিকল্প নয়; কৌশলগত প্রয়োজনীয়তা। দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি, আঞ্চলিক যোগাযোগ এবং নতুন বাণিজ্যিক নেটওয়ার্কে সক্রিয় অংশগ্রহণ বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ উন্নয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
চীন, মালয়েশিয়া, জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া এবং আসিয়ানভুক্ত দেশগুলোর সাথে সহযোগিতা সম্প্রসারণ যেমন জরুরি, তেমনি ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক রাখাও অপরিহার্য। আধুনিক কূটনীতির সাফল্য নির্ভর করে কোনো একক শক্তির ওপর নির্ভরশীলতার পরিবর্তে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব গড়ে তোলার সক্ষমতার ওপর।
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ সড়ক : নতুন সম্ভাবনার ইঙ্গিত
সাম্প্রতিক সময়ে আলোচনায় উঠে এসেছে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ সড়ক (সিএমবিসি) প্রতিষ্ঠার ধারণা। এই উদ্যোগের মূল লক্ষ্য হলো চীনের ইউনান প্রদেশকে মিয়ানমার হয়ে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের সাথে সংযুক্ত করা।
এ ধরনের ধারণা নতুন নয়। একসময় বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (বিসিআইএম) অর্থনৈতিক করিডোরের পরিকল্পনা আঞ্চলিক সহযোগিতার উল্লেখযোগ্য উদ্যোগ হিসেবে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু বিভিন্ন কৌশলগত ও নিরাপত্তাগত কারণে ভারত সেই প্রক্রিয়া থেকে সরে দাঁড়ায়। ফলে নতুন ভূরাজনৈতিক বাস্তবতায় সীমিত পরিসরে চীন, মিয়ানমার ও বাংলাদেশকে নিয়ে সংযোগ সড়ক প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা নতুন করে আলোচনায় এসেছে। যদি এই উদ্যোগ বাস্তবায়িত হয়, তাহলে তা বাংলাদেশের অর্থনীতি, বন্দর ব্যবস্থাপনা এবং আঞ্চলিক বাণিজ্যে উল্লেখযোগ্য ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
অর্থনৈতিক লাভ ও আঞ্চলিক সংযোগের বিস্তার
বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তিগুলোর একটি হলো তার ভৌগোলিক অবস্থান। দক্ষিণ এশিয়া ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থলে হওয়ায় আঞ্চলিক বাণিজ্যের স্বাভাবিক প্রবেশদ্বার হিসেবে গড়ে উঠতে পারে বাংলাদেশ।
সম্ভাব্য সংযোগ সড়ক বাস্তবায়ন হলে চট্টগ্রাম ও মোংলা বন্দরের ব্যবহার বাড়বে, পরিবহন ও লজিস্টিক খাতে নতুন কর্মসংস্থান হবে, বিদেশী বিনিয়োগ আকৃষ্ট হবে। বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল, শিল্পপার্ক এবং রফতানিমুখী শিল্পের বিকাশেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
চট্টগ্রামের আনোয়ারা অঞ্চলে গড়ে ওঠা শিল্প ও অর্থনৈতিক কার্যক্রমের সাথে আঞ্চলিক সংযোগ বাড়লে বাংলাদেশের উৎপাদন ও বাণিজ্যিক সক্ষমতা শক্তিশালী হবে। দীর্ঘমেয়াদে দেশটি দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ট্রানজিট ও লজিস্টিক হাবে পরিণত হওয়ার সুযোগ পেতে পারে।
মিয়ানমারের সঙ্কট : বাস্তবতার কঠিন প্রশ্ন
সম্ভাবনার পাশাপাশি বাস্তবতার কঠিন দিকগুলোও বিবেচনা করতে হবে। মিয়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক ও নিরাপত্তা পরিস্থিতি কোনোভাবেই উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।
দেশটির বিভিন্ন অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী সঙ্ঘাত চলছে। বিশেষ করে রাখাইন রাজ্যের পরিস্থিতি এখনো অস্থিতিশীল। প্রস্তাবিত করিডোরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ এই অঞ্চলের সাথে সম্পর্কিত হওয়ায় নিরাপত্তা, প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও অবকাঠামোগত স্থিতিশীলতা নিয়ে যৌক্তিক প্রশ্ন থেকে যায়।
যেকোনো বৃহৎ আঞ্চলিক প্রকল্প বাস্তবায়নের আগে এর অর্থনৈতিক সম্ভাবনার পাশাপাশি রাজনৈতিক ঝুঁকি ও নিরাপত্তাগত বাস্তবতাও সমান গুরুত্বের সাথে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন। অন্যথায় বিপুল বিনিয়োগ প্রত্যাশিত সুফল বয়ে আনতে ব্যর্থ হতে পারে।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক সহযোগিতা
বাংলাদেশের জন্য মিয়ানমার-সম্পর্কিত সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো রোহিঙ্গা সঙ্কট। বিপুলসংখ্যক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাকে মানবিক কারণে আশ্রয় দেয়ায় বাংলাদেশের ওপর উল্লেখযোগ্য সামাজিক, অর্থনৈতিক ও পরিবেশগত চাপ সৃষ্টি হয়েছে।
রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক এবং মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন নিশ্চিত করা বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান জাতীয় অগ্রাধিকার। এই বাস্তবতায় আঞ্চলিক সংযোগ ও সহযোগিতার যেকোনো উদ্যোগকে রোহিঙ্গা সমস্যার টেকসই সমাধানের সাথে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করা যুক্তিসঙ্গত।
চীন মিয়ানমারের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হওয়ায় দেশটির ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাবাসনপ্রক্রিয়াকে এগিয়ে নিতে সহায়ক হতে পারে। যদি রাজনৈতিক সমাধানের পথ সুগম হয়, তাহলে বৃহত্তর আঞ্চলিক সহযোগিতা বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নতুন সম্ভাবনার সৃষ্টি হবে।
প্রতিরক্ষা সংলাপ ও কৌশলগত আস্থা
বর্তমান বিশ্বে অর্থনৈতিক সহযোগিতার পাশাপাশি নিরাপত্তা ও প্রতিরক্ষা সংলাপও ক্রমবর্ধমান গুরুত্ব পাচ্ছে। অনেক দেশ পররাষ্ট্র ও প্রতিরক্ষা পর্যায়ে নিয়মিত ২+২ সংলাপ কাঠামো অনুসরণ করে থাকে।
এ ধরনের সংলাপ পারস্পরিক আস্থা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক নিরাপত্তা, সাইবার সুরক্ষা, মানবিক সহায়তা, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও কৌশলগত যোগাযোগ উন্নয়নে ভূমিকা রাখতে পারে। তবে এসব ব্যবস্থাকে সামরিক জোটের সমতুল্য হিসেবে দেখা উচিত নয়; এগুলো সহযোগিতা ও মতবিনিময়ের একটি প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো।
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের পররাষ্ট্রনীতির মূল ভিত্তি হলো- স্বাধীন সিদ্ধান্ত গ্রহণ এবং জাতীয় স্বার্থকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেয়া। ভবিষ্যতেও সেই নীতির ধারাবাহিকতা বজায় রাখা জরুরি।
ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই বাংলাদেশের শক্তি
বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো পরিবর্তিত আন্তর্জাতিক বাস্তবতায় কৌশলগত ভারসাম্য রাখা। ভারত ও চীন উভয়ই বাংলাদেশের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী ও উন্নয়ন সহযোগী। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন, জাপান ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর সাথে বহুমাত্রিক সম্পর্ক দেশের অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক স্বার্থের সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আধুনিক বিশ্বে স্থায়ী বন্ধু বা প্রতিদ্বন্দ্বীর চেয়ে স্থায়ী জাতীয় স্বার্থ অধিক গুরুত্বপূর্ণ। তাই বাংলাদেশের উচিত সবার সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক ঠিক রেখে পারস্পরিক সম্মান, সার্বভৌম সমতা এবং অভ্যন্তরীণ বিষয়ে হস্তক্ষেপ না করার নীতিকে সমুন্নত রাখা।
সংলাপ, সহযোগিতা ও আস্থা গড়ে তোলার মধ্য দিয়েই জটিল আন্তর্জাতিক সমস্যার সমাধান সম্ভব। বৈরিতার পরিবর্তে সহযোগিতার সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠা করাই দীর্ঘমেয়াদে জাতীয় স্বার্থ রক্ষার সর্বোত্তম উপায়।
উপসংহার : সুযোগ ও সতর্কতার সমন্বয়
চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ সংযোগ সড়ক নিঃসন্দেহে বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সম্ভাবনার দরজা খুলে দিতে পারে। তবে সেই সম্ভাবনাকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে মিয়ানমারের নিরাপত্তা পরিস্থিতি, রোহিঙ্গা সঙ্কট, আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য এবং জাতীয় স্বার্থ- সব কিছুকে সমন্বিতভাবে বিবেচনা করতে হবে।
পূর্বমুখী কূটনীতি বাংলাদেশের উন্নয়নযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে পারে, যদি তা বিচক্ষণতা, বাস্তববাদ এবং বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে পরিচালিত হয়। আমাদের লক্ষ্য হওয়া উচিত- সবার সাথে বন্ধুত্ব, কারো সাথে বৈরিতা নয়; তবে সর্বাগ্রে বাংলাদেশের সার্বভৌমত্ব, নিরাপত্তা ও জনগণের কল্যাণ।
দূরদর্শী ও ভারসাম্যপূর্ণ কূটনীতিই পারে একটি সমৃদ্ধ, মর্যাদাপূর্ণ এবং আত্মবিশ্বাসী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্মাণ করতে।
লেখক : সিনিয়র সাংবাদিক