বিশ্ব যুব দিবস আনুষ্ঠানিকতা মাত্র

জনসম্পদ তৈরির বিকল্প নেই

Printed Edition

জনমিতিক লভ্যাংশের দিক থেকে বাংলাদেশের অবস্থান এই মুহূর্তে সবচেয়ে সুবিধাজনক। দেশের জনসংখ্যার প্রায় ২৮ শতাংশের বয়স ১৫ থেকে ২৯ বছর। সংখ্যায় যা প্রায় চার কোটি ৭৫ লাখ। এরাই দেশের মূল কর্মশক্তি। কিন্তু এ সুবিধা কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে বিশ্বে সবচেয়ে পিছিয়ে বাংলাদেশ। আমরা যুবসমাজকে জনসম্পদে রূপান্তর করতে পারছি না। এ বিষয়ে সরকারের নানা কর্মসূচি থাকলেও তা কার্যকর সুফল দেয়নি।

গতকাল বুধবার দেশজুড়ে পালিত হলো বিশ্ব যুব দিবস। দিবসের মূল লক্ষ্য প্রযুক্তিগত ও কারিগরি শিক্ষার প্রসার এবং দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরা। এই গুরুত্ব কেউ বোঝে না এমন নয়; কিন্তু আমরা কাজটি করতে পারিনি। গত ৫৫ বছরে এক্ষেত্রে বাংলাদেশ ক্রমাগতভাবে পিছিয়ে গেছে।

সঙ্কটের অন্যতম প্রধান কারণ- চাহিদা ও দক্ষতার অমিল। দেশের শিল্প খাতে যে ধরনের দক্ষতার চাহিদা আছে সে ধরনের দক্ষ কর্মী তৈরি করতে পারছে না আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে তরুণরা যে ধরনের শিক্ষা নিয়ে বের হচ্ছেন, শিল্প ও সেবা খাতের বাস্তব চাহিদার সাথে তার মিল নেই। আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের বাস্তবতাও একই। আজকের বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্বয়ংক্রিয়করণ (অটোমেশন) ও ডিজিটাল প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার ঘটছে। কর্মক্ষেত্রের ধরন বদলাচ্ছে। আমাদের শিক্ষার্থীদের বৈশ্বিক চাহিদার সাথে সঙ্গতিপূর্ণ প্রযুক্তি জ্ঞান, ডিজিটাল সক্ষমতা, যোগাযোগ দক্ষতা, জটিল সমস্যা সমাধানের ক্ষমতা এবং ভাষাজ্ঞানে সমৃদ্ধ করে গড়ে তোলা যাচ্ছে না। এ কারণেই দেশের শ্রমবাজারে তারা অপাঙ্ক্তেয় থেকে যাচ্ছে, আবার বিদেশের বাজারেও অদক্ষ শ্রমিক হিসেবে সামান্য বেতনে কাজ করতে বাধ্য হচ্ছে।

গবেষণায় দেখা গেছে, আমাদের তৈরী পোশাক, তথ্যপ্রযুক্তি, নির্মাণ, হালকা প্রকৌশল ও কৃষিভিত্তিক শিল্পেও দক্ষ কর্মীর ঘাটতি আছে। অভ্যন্তরীণ শ্রমবাজারে নিয়োগদাতারা দক্ষ কর্মী ও পেশাজীবী খুঁজে পান না। বিদেশী নাগরিকদের নিয়োগ দিতে বাধ্য হন। প্রতিটি খাতের উচ্চ বেতনের পদগুলো দখল করছে ভারত, শ্রীলঙ্কা, চীন ও কোরিয়া থেকে আসা দক্ষ কর্মীরা। এমনকি অনেকে অবৈধভাবেও এদেশে কাজ করছে। দেশ থেকে চলে যাচ্ছে বিপুল অর্থ।

প্রতি বছর বাংলাদেশ থেকে যে বিপুলসংখ্যক কর্মী বিদেশে যাচ্ছেন, তারা মূলত নির্মাণশ্রমিক, কৃষিশ্রমিক, পরিচ্ছন্নতাকর্মী বা সাধারণ শ্রমিক হিসেবে কাজ করেন এবং খুব কম বেতন পান। অথচ জাপান, দক্ষিণ কোরিয়া, জার্মানি, ইতালি ও মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোয় নানা খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা বিপুল।

এ অবস্থা যুগের পর যুগ চলতে পারে না। জাতীয় জীবনের অর্ধেক সময় গেছে স্বৈরাচার ও আধা স্বৈরাচারের দুঃশাসন অপশাসনে। এখনকার নির্বাচিত সরকারকে যেসব বিষয়ে অগ্রাধিকার দিতে হবে তার অন্যতম হলো- দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উপযোগী শিক্ষার প্রবর্তন। সময় ক্ষেপণের সুযোগ নেই।

এ জন্য দরকার শিক্ষাবিদ, বিশেষজ্ঞ ও শিক্ষাসংশ্লিষ্ট অংশীদারদের নিয়ে স্বল্পসময়ের মধ্যে জাতীয় সংলাপের আয়োজন করা। সংলাপে ঐকমত্যের ভিত্তিতে এমন শিক্ষা প্রবর্তনের উদ্যোগ নেয়া যা শিক্ষার্থীদের আন্তর্জাতিক মানের কারিগরি প্রশিক্ষণ, ভাষাজ্ঞান এবং আন্তর্জাতিক বিশে^ স্বীকৃত সনদ দিতে পারে। অন্যথায় জাতি হিসেবে আমরা কখনই এগোতে পারব না।