এক দিনে হামে ১০ শিশুর মৃত্যু
সর্দি-জ্বর কাশি হলেই হাসপাতালে ভিড়
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
এক দিনে দেশে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে। এ ছাড়া গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল পর্যন্ত সারা দেশে হামে ১১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মানুষের মধ্যে কিছুটা আতঙ্কও বিরাজ করছে। শিশুর সাধারণ জ্বর, সর্দি ও কাশি হলেই অভিভাবকরা হাম সন্দেহ করে হাসপাতালে ভিড় করছে যেগুলো বাড়িতে থেকেও চিকিৎসা হতে পারে। বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসক বলেছেন, এ ধরনের শিশুদের হাসপাতালে নিয়ে আসতে পারলে অভিভাবকদের মধ্যে যে আতঙ্ক বিরাজ করছেন সেটি কমে যায়; কিন্তু হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার কারণে ভিড় লেগে যাচ্ছে। সরকারই পারে ব্যাপক প্রচারণার মাধ্যমে মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কমিয়ে আনতে।
তিনি বলেন, এর মধ্যেও কিছু শিশু আসে যাদের হাম সন্দেহ করার মতো কিছু লক্ষণ থাকে। তবে হাম হলেও শুরুতেই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী ওষুধ দেয়া হলে ভয়ের কিছু থাকে না। উল্লেখ্য, হাম একটি ভাইরাস-জনিত রোগ। ভাইরাসের বিরুদ্ধে নির্দিষ্ট কোনো ওষুধ নেই তবে চিকিৎসকরা শরীরের উপসর্গ দেখে চিকিৎসা দিয়ে আক্রান্ত শিশুকে সুস্থ করে তুলতে পারেন।
বর্তমানে হাসপাতালে ভর্তি যেসব শিশুর হাম সন্দেহে মৃত্যু হচ্ছে হাসপাতালগুলোতে কারণ হিসেবে ‘হাম’ লিখলেও সরকারিভাবে স্বীকার করছে না যে, এরা সবাই হামে মারা গেছে। স্বাস্থ্য অধিদফতর সন্দেহজনক মৃত্যু বলে ব্র্র্যাকেট-বন্দী করে রেখেছে। গতকাল যে ১০ শিশুর মৃত্যুর কথা সরকারিভাবে বলা হয়েছে এদের মৃত্যুও সন্দেহের তালিকায় রেখেছে। ১৫ মার্চ থেকে ১১৩ শিশুর মৃত্যু হয়েছে বলা হচ্ছে, এর মধ্যে সরকারিভাবে মাত্র ১৭ শিশুর কথা নিশ্চিত করা হয়েছে যে, এরা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে। ২০১৬-১৭ সালে ডেঙ্গুতে মৃত্যুর ব্যাপারেও স্বাস্থ্য অধিদফতর এভাবে নাকচ করে দিতো সন্দেহজনক বলে। খুব অল্প মৃত্যুকেই তখন ডেঙ্গুতে হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রতিষ্ঠান আইইডিসিআর স্বীকৃতি দিয়েছিল।
স্বাস্থ্য অধিদফতরের প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, গত ২৪ ঘণ্টায় যে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে হামে এর মধ্যে খুলনা বিভাগে সর্বোচ্চ পাঁচজনের সবাই কুষ্টিয়া জেলায় মারা গেছে। তবে স্বাস্থ্য অধিদফতর ওই ১০ শিশুর মধ্যে মাত্র দুইজনের মৃত্যুকে হামে হয়েছে বলে নিশ্চিত করেছে।
গত ২৪ ঘণ্টায় সারা দেশে হাম সন্দেহে ৬৫৪ শিশু ভর্তি হয়েছে বলে স্বাস্থ্য অধিদফতর জানিয়েছে। আবার হাম সন্দেহে ৯৭৪ শিশু আক্রান্ত হয়েছে বলেও জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদফতর। হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি শিশুর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে ২৬৯, এই বিভাগে হামে আক্রান্ত হয়ে ভর্তিসহ চিকিৎসার আওতায় এসেছে ৩৯২ শিশু।
নীলফামারী প্রতিনিধি জানান, নীলফামারীর ডিমলা উপজেলায় হামের উপসর্গ নিয়ে ১১ দিন বয়সী আফরিন জান্নাত নামে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গতকাল রোববার সকালে বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: রাশেদুজ্জামান। আফরিন জান্নাত খগাখড়িবাড়ি ইউনিয়নের খগারহাট এলাকার আবু বকর সিদ্দিকের মেয়ে।
হাসপাতাল সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুরে স্বজনরা শিশুটিকে ডিমলা উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করান। অবস্থার অবনতি হলে চিকিৎসকরা তাকে রংপুর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় রাত দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা: রাশেদুজ্জামান জানান, শিশুটির অবস্থা গুরুতর হওয়ায় তাকে উন্নত চিকিৎসার জন্য রংপুরে পাঠানো হয়। সেখানে তার নমুনা সংগ্রহ করা হয়েছিল। পরে রাতে তার মৃত্যুর খবর পাওয়া যায়। পরিবারের সাথে কথা বলে বিষয়টি নিশ্চিত হওয়া গেছে। জেলায় এটি হামে প্রথম মৃত্যু।
রাজশাহী ব্যুরো জানায়, রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে হাম উপসর্গে আরো দুই শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে হাম উপসর্গে রামেক হাসপাতালে মোট ৪০ শিশুর মৃত্যু হলো। হাম উপসর্গ নিয়ে রামেক হাসপাতালে ভর্তি আছে ১২৫ শিশু। গতকাল রোববার রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শঙ্কর কে বিশ্বাস সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান। তিনি জানান, শনিবার সকাল ৮টা থেকে রোববার সকাল ৮টা পর্যন্ত হাসপাতালে হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে দুই শিশু। এই ২৪ ঘণ্টায় হাম উপসর্গ নিয়ে ভর্তি হয়েছে ২৪ জন। সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে ৩৬ জন রোগী। বর্তমানে রামেক হাসপাতালে হাম উপসর্গ নিয়ে ১২৫ শিশু ভর্তি আছে।
মেহেরপুর জেলা প্রতিনিধি ও গাংনী সংবাদদাতা জানান, মেহেরপুর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গত এক সপ্তাহে ৩৫ শিশু চিকিৎসা নিয়েছে। এদের মধ্যে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতালে ১৫, মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৫ ও গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ জন ভর্তি হয়েছেন।
ইতোমধ্যে বেশ কয়েকজন সুস্থ হয়ে উঠলেও বর্তমানে মেহেরপুর জেনারেল হাসপাতাল, গাংনী ও মুজিবনগর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছে ২০ শিশু।
সরেজমিন দেখা গেছে, আক্রান্তদের মধ্যে অধিকাংশই শিশু। বিশেষ করে এক বছরের কম বয়সী এবং ৬ থেকে ৯ মাস বয়সী শিশু। যেসব শিশু এখনো পূর্ণ টিকাদান পায়নি বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম, তারাই বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে। আক্রান্ত শিশুদের মধ্যে জ্বর, সর্দি-কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে নিউমোনিয়া, ডায়রিয়া ও শ্বাসকষ্টের মতো জটিলতাও তৈরি হচ্ছে।