চাপে মধ্যবিত্ত-নিম্নআয়ের মানুষ
জীবনযাত্রায় ব্যয়ের তুলনায় আয় কম, বাড়ছে সংসার চালানোর সঙ্কট
Printed Edition
শাহ আলম নূর
দেশে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দাম যেভাবে বাড়ছে, সেভাবে মানুষের আয় বাড়ছে না, এটাই এখন সাধারণ মানুষের সবচেয়ে বড় বাস্তবতা। চাল, ডাল, তেল, সবজি থেকে শুরু করে গ্যাস-বিদ্যুৎ, বাড়িভাড়া ও যাতায়াত খরচ সব কিছুতেই ঊর্ধ্বগতি। অথচ বেসরকারি খাতের অধিকাংশ কর্মজীবী মানুষের বেতন বছরের পর বছর প্রায় একই জায়গায় আটকে আছে। এতে করে মধ্যবিত্ত ও নি¤œআয়ের মানুষের জীবনযাপন দিন দিন অসহনীয় হয়ে উঠছে।
দেশে নিত্যপণ্যের দাম যে হারে বাড়ছে, সেই তুলনায় নিম্নবিত্তের মানুষের আয় বাড়ছে না। এমন বাস্তবতা এখন পরিসংখ্যানেই স্পষ্ট। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গত এক বছরে মানুষের গড় আয় যেখানে ৮ শতাংশের আশপাশে বেড়েছে, সেখানে একই সময়ে দ্রব্যমূল্য বেড়েছে ৯ থেকে ১১ শতাংশ পর্যন্ত। ফলে আয় বাড়লেও মানুষের প্রকৃত ক্রয়মতা কমছে, বাড়ছে সংসার চালানোর চাপ।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্য অনুযায়ী, দেশে সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি দীর্ঘদিন ধরেই ৯ শতাংশের উপরে অবস্থান করছে। এর মধ্যে খাদ্য মূল্যস্ফীতি আরো বেশি। অনেক সময় তা ১২ থেকে ১৪ শতাংশ ছাড়িয়েছে। অথচ বেসরকারি খাতে কর্মরত অধিকাংশ মানুষের বেতন ও মজুরি বৃদ্ধি গড়ে ৭ থেকে ৮ শতাংশের বেশি হয়নি।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মানীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেছেন, আয় বৃদ্ধির হার যদি মূল্যস্ফীতির চেয়ে কম হয়, তা হলে বাস্তবে মানুষের আয় বাড়ে না বরং কমে যায়। এটিকে বলা হয় ‘প্রকৃত আয় হ্রাস’। বর্তমানে দেশের বড় একটি জনগোষ্ঠী সেই পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, উচ্চ মূল্যস্ফীতি এবং আয়ের স্থবিরতা এক সাথে চলতে থাকলে মানুষের প্রকৃত ক্রয়মতা দ্রুত কমে যায়। এতে শুধু ভোগ কমে না, সামগ্রিক অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তিনি বলেন, সরকারি ও বেসরকারি খাতে আয় বৃদ্ধির সাথে যদি পণ্যের দামের সামঞ্জস্য না থাকে, তা হলে সমাজে বৈষম্য বাড়বে। মধ্যবিত্ত শ্রেণী ধীরে ধীরে নিম্নআয়ের কাতারে নেমে যাবে, যা সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য ঝুঁকিপূর্ণ।
তিনি মনে করছেন, বাজার ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা, আমদানি ব্যয়ের চাপ, ডলার সঙ্কট ও কর কাঠামোর প্রভাব মিলিয়ে পণ্যের দাম বাড়ছে। কিন্তু আয় বৃদ্ধির জন্য কার্যকর কোনো সমন্বিত নীতি না থাকায় সাধারণ মানুষ পুরো চাপ বহন করছে।
রাজধানী ও জেলা শহরের বাজারগুলোতে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, চাল, ডাল, তেল, চিনি, ছোলা, পেঁয়াজসহ প্রায় সব নিত্যপণ্যের দাম গত এক বছরে উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। রমজানকে সামনে রেখে অনেক পণ্যের দাম নতুন করে বাড়ার প্রবণতাও দেখা যাচ্ছে।
তথ্য বিশ্লেষণে দেখা যায়, ব্যয় বৃদ্ধির ফলে সঞ্চয়ের সমতা হারাচ্ছে অনেক পরিবার। ব্যাংকার ও আর্থিক বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যবিত্ত শ্রেণীর একটি বড় অংশ এখন নিয়মিত সঞ্চয়ের বদলে ধার ও কিস্তিনির্ভর হয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতি দীর্ঘস্থায়ী হলে শুধু ব্যক্তিগত জীবন নয়, সামগ্রিক অর্থনীতিও তিগ্রস্ত হবে। ভোগ কমে গেলে উৎপাদন ও বিনিয়োগেও নেতিবাচক প্রভাব পড়বে।
ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন শহরের বাজারের তথ্যে দেখা গেছে, গত কয়েক মাসে চালের দাম কেজিতে ৫ থেকে ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। খোলা সয়াবিন তেল, ডাল, ছোলা ও চিনি রমজানকে সামনে রেখে এসব পণ্যের দাম নতুন করে ঊর্ধ্বমুখী। শীত মৌসুম শেষ না হতেই সবজির দামও বাড়তে শুরু করেছে। অন্য দিকে গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির বিল বাড়ায় মাসিক ব্যয় আরো চাপে পড়েছে।
এ দিকে দেশের ব্যয় বৃদ্ধির বিপরীতে মানুষের আয় বাড়েনি। বেসরকারি চাকরিজীবীদের বড় একটি অংশ জানান, গত দুই থেকে তিন বছরে তাদের বেতন এক টাকাও বাড়েনি। বরং অনেক েেত্র চাকরি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। শিল্প-কারখানায় উৎপাদন কমে যাওয়ায় অতিরিক্ত কাজের সুযোগও কমেছে।
রাজধানীর মিরপুরের একটি গার্মেন্টসে কাজ করা অপারেটর রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘আগে মাস শেষে কিছু টাকা হাতে থাকত। এখন বেতন পাই ১৪ হাজার টাকা, কিন্তু বাজার আর বাড়িভাড়া মেটাতে গিয়েই শেষ হয়ে যায়। বাচ্চাদের পড়াশোনা, চিকিৎসা- সব কিছু কষ্ট করে চালাতে হচ্ছে।’
একই চিত্র মধ্যবিত্ত পরিবারগুলোরও। সরকারি চাকরিজীবী, বেসরকারি অফিসের কর্মকর্তা কিংবা ছোট ব্যবসায়ীরা সবাই বলছেন, আয় স্থবির থাকলেও জীবনযাত্রার ব্যয় প্রতিনিয়ত বাড়ছে। ফলে সঞ্চয় তো দূরের কথা, অনেক পরিবার ধার করে সংসার চালাচ্ছে।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) সবশেষ তথ্যে দেখা গেছে, দেশে মূল্যস্ফীতির হার দীর্ঘদিন ধরেই সহনীয় সীমার বাইরে অবস্থান করছে। বিশেষ করে খাদ্য মূল্যস্ফীতি সাধারণ মানুষের ওপর সবচেয়ে বেশি চাপ তৈরি করছে।
ভোক্তা অধিকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজারে নজরদারি জোরদার না হলে এবং মধ্যস্বত্বভোগীদের দৌরাত্ম্য নিয়ন্ত্রণ না করলে পণ্যের দাম আরো বাড়বে। পাশাপাশি শ্রমিক-কর্মচারীদের ন্যায্য মজুরি ও বেতন কাঠামো পুনর্বিন্যাস করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পরিস্থিতি মোকাবেলায় সরকারকে এক দিকে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদপে নিতে হবে, অন্য দিকে বেসরকারি খাতে বেতন ও মজুরি বৃদ্ধির জন্য বাস্তবসম্মত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে। তা না হলে পণ্যের দাম ও আয়ের এই বৈষম্য সাধারণ মানুষের জীবনযাপনকে আরো সঙ্কটাপন্ন করে তুলবে।