জিএসপি সুরক্ষার অনিশ্চয়তায় ইউরোপে শুল্কঝুঁকিতে বাংলাদেশের পোশাক শিল্প

Printed Edition

শাহ আলম নূর

স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে বাংলাদেশের উত্তরণকে অর্থনৈতিক অগ্রগতির বড় মাইলফলক হিসেবে দেখা হলেও, এই উত্তরণ-পরবর্তী বাস্তবতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে দেশের প্রধান রফতানি খাত তৈরী পোশাক শিল্পে। বিশেষ করে ইউরোপীয় ইউনিয়নের (ইইউ) বাজারে শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর আশঙ্কা এখন আর তাত্ত্বিক নয়; বরং তা ধীরে ধীরে একটি বাস্তব ঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০২৯ সালে ইবিএ (অস্ত্র ছাড়া সব কিছু) সুবিধার রূপান্তরকাল শেষ হলে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানি ইইউ বাজারে ১২ শতাংশ পর্যন্ত শুল্কের মুখে পড়তে পারে। এমন পরিস্থিতিতে দেশের সবচেয়ে বড় রফতানি খাতে নেতিবাচক প্রভাব পড়বে বলে আশঙ্কা করছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।

বর্তমানে বাংলাদেশ এলডিসি হিসেবে ইইউর ইবিএ সুবিধার আওতায় প্রায় সব পণ্যে শুল্ক ও কোটামুক্ত বাজার সুবিধা ভোগ করছে। এই সুবিধাই গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ইউরোপের বাজারে বাংলাদেশের পোশাক রফতানির প্রবৃদ্ধিকে ত্বরান্বিত করেছে। তবে ২০২৬ সালে এলডিসি থেকে উত্তরণের পর তিন বছরের একটি রূপান্তরকাল শেষে ২০২৯ সালে এই সুবিধা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাবে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইউরোপীয় কমিশন, কাউন্সিল ও পার্লামেন্ট সম্প্রতি ইইউর জেনারালাইজড সিস্টেম অব প্রেফারেন্সেস (জিএসপি) স্কিম সংশোধনের বিষয়ে একটি সমঝোতায় পৌঁছেছে। নতুন এই জিএসপি স্কিম ২০২৭ সালের ১ জানুয়ারি থেকে কার্যকর হয়ে পরবর্তী ১০ বছর বলবৎ থাকবে। নতুন কাঠামোতে কিছু কঠোর শর্ত ও সুরক্ষা ব্যবস্থা যুক্ত করা হয়েছে, যা বড় রফতানিকারক দেশগুলোর জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তারা বলছেন প্রস্তাবিত স্কিম অনুযায়ী, কোনো একটি দেশ বা দেশের গোষ্ঠী যদি ইইউর মোট আমদানিতে নির্দিষ্ট মাত্রার বেশি অংশীদারিত্ব অর্জন করে, তা হলে স্বয়ংক্রিয় সেফগার্ড ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে। এই ব্যবস্থার আওতায় সংশ্লিষ্ট পণ্যে সাময়িক বা স্থায়ীভাবে শুল্ক সুবিধা প্রত্যাহার করা হয়।

বাংলাদেশের জন্য উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে স্কিমে টেক্সটাইল ও তৈরী পোশাক খাতে পণ্য গ্র্যাজুয়েশনের থ্রেশহোল্ড বর্তমান ৪৭.২ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩৭ শতাংশে নামিয়ে আনার প্রস্তাব রয়েছে। অর্থাৎ, জিএসপি বা জিএসপি-প্লাস সুবিধাভোগী দেশগুলোর মোট টেক্সটাইল আমদানির মধ্যে কোনো দেশের অংশ যদি ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং তা টানা তিন বছর স্থায়ী হয়, তা হলে সেফগার্ড আরোপের সুযোগ তৈরি হবে।

এ বিষয়ে ঢাকায় নিযুক্ত ইইউ রাষ্ট্রদূত ও প্রতিনিধিদলের প্রধান মাইকেল মিলার জানিয়েছেন, বাংলাদেশ এলডিসি থাকা পর্যন্ত এই থ্রেশহোল্ডের আওতায় পড়বে না। এলডিসি উত্তরণের পরও তিন বছরের একটি রূপান্তরকাল থাকবে, যেখানে ইইউ একতরফাভাবে সুবিধা অব্যাহত রাখবে, যাতে বাংলাদেশ জিএসপি বা জিএসপি-প্লাসের শর্ত পূরণের জন্য প্রস্তুতি নিতে পারে। তিনি আরো বলেন, স্বয়ংক্রিয় সেফগার্ড ব্যবস্থা নতুন কোনো বিষয় নয়। এটি আগের জিএসপি কাঠামোতেও ছিল, তবে এখন পর্যন্ত ইউরোপীয় কমিশন কখনো এই ব্যবস্থা কার্যকর করেনি, কারণ প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ হয়নি। তবে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি কী হবে, তা এখনই নিশ্চিত করে বলা সম্ভব নয় বলে তিনি জানান।

এ দিকে দেশীয় গবেষক ও বাণিজ্য বিশ্লেষকরা বিষয়টি নিয়ে বেশ সতর্ক। রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্ট (র‌্যাপিড) এর চেয়ারম্যান ড. এম এ রাজ্জাক বলেন, যদি কোনো দেশের রফতানি ইইউর মোট আমদানির ৬ শতাংশ বা জিএসপি সুবিধাভোগী দেশগুলোর মোট টেক্সটাইল আমদানির ৩৭ শতাংশ ছাড়িয়ে যায় এবং তা তিন বছর অব্যাহত থাকে, তা হলে সেফগার্ড ব্যবস্থা কার্যকর হতে পারে।

তার মতে, বর্তমানে ইইউর মোট পোশাক আমদানিতে বাংলাদেশের অংশ প্রায় ২৪ শতাংশ এবং জিএসপি সুবিধাভোগী দেশগুলোর মধ্যে এ হার প্রায় ৪৭ শতাংশের কাছাকাছি। এই পরিসংখ্যান ভবিষ্যতে বাংলাদেশের শুল্কমুক্ত সুবিধা হারানোর বাস্তব ঝুঁকির ইঙ্গিত দেয়।

ইউরোপীয় ইউনিয়ন বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রফতানি গন্তব্য। ইউরোস্ট্যাটের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সালে ইইউতে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক রফতানির পরিমাণ ছিল ১১.৫৪ বিলিয়ন ইউরো। ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮.২৮ বিলিয়ন ইউরোতে, যা প্রায় ৫৮.৪৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। এই প্রবৃদ্ধির বড় অংশই এসেছে শুল্কমুক্ত সুবিধার কারণে প্রতিযোগিতামূলক দামের সুবিধা থেকে।

শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, এই সুবিধা হঠাৎ করে হারালে বাংলাদেশের পোশাক খাতের প্রতিযোগিতামূলক সক্ষমতা মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। বিশেষ করে শ্রম ও উৎপাদন ব্যয় বাড়ার বর্তমান প্রেক্ষাপটে অতিরিক্ত ১২ শতাংশ শুল্ক বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াবে।

বিশ্ব বাণিজ্য পরিস্থিতির পরিবর্তনের কারণে বাংলাদেশের প্রধান প্রতিযোগী দেশগুলো নতুন কৌশলে এগোচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্রের বাড়তি শুল্কনীতির কারণে চীন, ভিয়েতনাম, ভারত ও কম্বোডিয়ার মতো দেশগুলো এখন ইইউ বাজারে অংশীদারিত্ব বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে। ভিয়েতনাম ইতোমধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সাথে মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি (এফটিএ) স্বাক্ষর করেছে। এর ফলে ধাপে ধাপে ভিয়েতনামের পোশাক পণ্যে শুল্ক শূন্যের কোঠায় নেমে আসবে। ২০২৯ সালের মধ্যে যেখানে ভিয়েতনাম শুল্কমুক্ত সুবিধা ভোগ করবে, সেখানে বাংলাদেশকে ১২ শতাংশ শুল্ক দিতে হতে পারে, যা অসম প্রতিযোগিতার ক্ষেত্র তৈরি করবে বলে মনে করছেন শিল্প উদ্যোক্তারা।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) নির্বাহী সভাপতি ফজলে শামীম এহসান বলেন, এই পরিস্থিতিতে কূটনৈতিক উদ্যোগ জোরদার করা অত্যন্ত জরুরি। তার মতে, সেফগার্ড ধারা শিথিল করা বা প্রত্যাহার এবং রূপান্তরকাল আরো অন্তত ছয় বছর বাড়ানোর বিষয়ে ইইউর সাথে আলোচনা প্রয়োজন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল কূটনৈতিক প্রচেষ্টাই যথেষ্ট নয়; শিল্প খাতকেও প্রস্তুত হতে হবে। উৎপাদন দক্ষতা বাড়ানো, পণ্যের বৈচিত্র্য আনা, উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদনে বিনিয়োগ, নতুন বাজার অনুসন্ধান এবং অপচয় কমানো- এসব পদক্ষেপ ছাড়া ভবিষ্যৎ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা কঠিন হবে। তারা বলছেন, এলডিসি উত্তরণ বাংলাদেশের জন্য একদিকে গর্বের অর্জন, অন্য দিকে এটি বৈশ্বিক বাণিজ্যে কঠিন প্রতিযোগিতার নতুন অধ্যায়ের সূচনা। এখনই সময়, সম্ভাব্য ঝুঁকি চিহ্নিত করে কৌশলগত প্রস্তুতি নেয়ার। তা না হলে ২০২৯ সালের পর ইউরোপীয় বাজারে বাংলাদেশের তৈরী পোশাক শিল্প বড় ধরনের চাপের মুখে পড়তে পারে- এমন আশঙ্কাই এখন শিল্প ও নীতিনির্ধারক মহলে জোরালো হয়ে উঠছে।