নারী শ্রমশক্তি কমছে অর্থনৈতিক সংস্কারের সামনে বড় চ্যালেঞ্জ

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

বাংলাদেশে গত এক দশকের মধ্যে প্রথমবারের মতো নারী শ্রমশক্তির উল্লেখযোগ্য সঙ্কোচন দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) শ্রমশক্তি জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী, ২০২৩ সালে যেখানে নারী শ্রমশক্তির সংখ্যা ছিল দুই কোটি ৫৩ লাখ, ২০২৪ সালে তা কমে দাঁড়িয়েছে দুই কোটি ৩৭ লাখে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশের (এলডিসি) তালিকা থেকে উত্তরণের সময় বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি ও কর্মসংস্থান কাঠামো চাপের মুখে পড়বে।

এই প্রেক্ষাপটে সোমবার ঢাকায় ‘বাংলাদেশে অর্থনৈতিক সংস্কারের জাতীয় সুযোগ হিসেবে নারী কর্মসংস্থান’ শীর্ষক একটি উচ্চপর্যায়ের নীতিনির্ধারণী সংলাপ অনুষ্ঠিত হয়। ইনোভিশন কনসাল্টিং, বাংলাদেশ রিসার্চ অ্যানালাইসিস অ্যান্ড ইনফরমেশন নেটওয়ার্ক (ব্রেইন) ও ভয়েস ফর রিফর্মের যৌথ আয়োজনে অনুষ্ঠিত এ সংলাপে নীতিনির্ধারক, অর্থনীতিবিদ, গবেষক, নারী সংগঠন, উদ্যোক্তা ও উন্নয়ন অংশীদার অংশ নেন।

অনুষ্ঠানে পরিকল্পনা কমিশনের সচিব ড. কায়্যুম আরা বেগম বলেন, ‘কৃষি খাত থেকে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক নারীশ্রমিক সরে গিয়ে অনানুষ্ঠানিক সেবা খাতে চলে যাচ্ছেন। কিন্তু কৃষিতে তাদের রেখে যাওয়া শূন্যতা পূরণ হচ্ছে না, যা উৎপাদন ব্যবস্থার জন্য উদ্বেগজনক।’

গবেষণায় দেখা যায়, পুরুষদের শ্রমশক্তিতে অংশগ্রহণ প্রায় অপরিবর্তিত থাকলেও নারীদের অংশগ্রহণ কমেছে সবচেয়ে বেশি শহরাঞ্চলে। শহরে নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণের হার ২০২৩ সালের ২৫.১ শতাংশ থেকে ২০২৪ সালে কমে ২২.৫ শতাংশে নেমেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, তৈরী পোশাক শিল্পে (আরএমজি) অটোমেশন ও প্রযুক্তি আধুনিকায়নের ফলে কর্মসংস্থান ৩০ শতাংশের বেশি কমেছে, যেখানে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন সেলাই ও ট্রিমিংয়ে নিয়োজিত নারীশ্রমিকরা।

শিক্ষিত নারীদের কর্মসংস্থান পরিস্থিতিও উদ্বেগজনক। স্নাতক ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রিধারী নারীদের মধ্যে বেকারত্বের হার জাতীয় গড়ের প্রায় ছয় গুণ। অন্য দিকে বর্তমানে কর্মরত নারীদের প্রায় ৯৬ শতাংশই অনানুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত, যেখানে নেই চাকরির নিরাপত্তা, সামাজিক সুরক্ষা বা পেশাগত উন্নয়নের সুযোগ।

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম নিয়াজ আসাদুল্লাহ বলেন, ‘অনেক আনুষ্ঠানিক খাতের নিয়োগকর্তা নারীদের নিয়োগকে এখনো বিনিয়োগ হিসেবে দেখেন না। প্রণোদনা ও নীতিগত সহায়তা ছাড়া এই মানসিকতা বদলানো কঠিন।’

সংলাপে বলা হয়, নারী কর্মসংস্থান কেবল সামাজিক ন্যায়ের প্রশ্ন নয়; এটি মধ্যম আয়ের ফাঁদ এড়ানোর জন্য একটি কাঠামোগত প্রয়োজন। ভিয়েতনামের উদাহরণ তুলে ধরে বক্তারা বলেন, সেখানে ৭০ শতাংশের বেশি নারী শ্রমশক্তি অংশগ্রহণ টেকসই প্রবৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।

নারী কর্মসংস্থান বাড়াতে শিশু যতœ কেন্দ্র সম্প্রসারণ, কর্মস্থলে নিরাপত্তা ও যৌন হয়রানি প্রতিরোধে কঠোর ব্যবস্থা এবং নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার সুপারিশ করা হয়। বক্তারা বলেন, দ্বৈত আয়ের পরিবার অর্থনৈতিক সঙ্কট ও মূল্যস্ফীতির ধাক্কা সামলাতে বেশি সক্ষম ফলে নারী কর্মসংস্থান ভবিষ্যৎ সরকারের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক বিনিয়োগ।