লালমনিরহাটের রাজকন্যা

রফিকুল হায়দার ফরহাদ
Printed Edition
khela-1
মুনকি আক্তার ; বাফুফে

বাংলাদেশের নারী ফুটবলে এখন উত্তরবঙ্গের খেলোয়াড়দের দাপট। রংপুর, দিনাজপুর, পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও থেকেই দল বেঁধে জাতীয় দলে ডাক পাচ্ছেন ফুটবলাররা। উত্তরবঙ্গের অপর জেলা লালমনিরহাটের খেলোয়াড় এই মুহূর্তে মাত্র একজন। আর তিনি হলেন, মোসাম্মৎ মুনকি আক্তার। এই মিডফিল্ডার বয়সভিত্তিক জাতীয় দলের সাথে সিনিয়র জাতীয় দলেও খেলছেন। নারী এশিয়ান কাপে কোয়ালিফাই করা সিনিয়র বাংলাদেশ দলের যেমন তিনি সদস্য তেমনি এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবলের চূড়ান্ত পর্বে উঠা দলেরও প্রতিনিধি। আর এবারের অনূর্ধ্ব-১৯ নারী সাফে প্রথম ম্যাচে চার গোল করেছেন ভুটানের বিপক্ষে। এটি আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে প্রথম হ্যাটট্রিক তার। পরের ম্যাচে ভারতের ডিফেন্স লাইনকে ছিন্ন ভিন্ন করেন তিনি। গতকাল নেপালের বিপক্ষে বদলি হিসেবে বিরতির পর মাঠে নামেন তিনি। এতে মাঝ মাঠে নেপালের দাপট কমে যায়। এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ নারী ফুটবলে তার তিন গোল। আর সিনিয়র জাতীয় দলে তার করা দুই গোল তুর্কমেনিস্তানের বিপক্ষে। তা এশিয়ান কাপের বাছাই পর্বে। সাথে বেশ কিছু গোলের জোগানদাতা। মুনকির বিশেষত্ব হলো তিনি যেমন গোল করেন তেমনি গোল করাতেও পারেন। গত বছর ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-২০ নারী সাফে চ্যাম্পিয়ন বাংলাদেশ দলের খেলোয়াড় ছিলেন তিনি। সেই আসরেও তার তিন গোল। শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে প্রথম ম্যাচে জোড়া গোল করেন। এরপর ভুটানের বিপক্ষে ম্যাচেও একবার বল জালে পাঠান।

লালমনিরহাটের পাটগ্রামের মেয়ে এই মুনকি। মা-বাবা দুই বোন আর একভাইকে নিয়ে মুনকিদের সংসার। বাবা কৃষি কাজ করেন। আর মা গৃহিণী। দশম শ্রেণীর ছাত্রী মুনকি এবারের নারী লিগে খেলছেন রাজশাহী স্টারসের হয়ে। টেপুরগাড়ী বিকে প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবলে অংশ নেন তিনি। পরবর্তীতে নারী দলের সাবেক হেড কোচ গোলাম রাব্বানী ছোটনের নজরে পড়েন। সেই থেকে শুরু। আর আজ তিনি মিডফিল্ডে অন্যতম ভরসা।

২০২২ ঢাকায় অনুষ্ঠিত অনূর্ধ্ব-১২ জাতীয় ফুটবলে দারুণ খেলেন তিনি। তখনই কোচ ছোটন ও মাহাবুবুর রহমান লিটুর নজরে আসেন। সেই আসর থেকে মুনকির ফুফাতো বোন লিভা আক্তার ও অপর ফুটবলার মরিয়ম ডাক পান বাফুফের ক্যাম্পে। লিভার বিয়ে হয়ে গেছে মরিয়মও আর নেই খেলার মধ্যে। লালমনিরহাটের আরেক ফুটবলার সুলতানা বয়সভিত্তিক জাতীয় দলে চমৎকার খেলেছিলেন। এখন তিনি বাদ। ফলে লালমনিরহাটের একমাত্র ফুটবলার হিসেবে মুনকি এখন লাল-সবুজ জার্সি গায়ে ধরে রেখেছেন।

তবে তার এই ফুটবলে আসার রাস্তাটা মোটেই মসৃণ ছিল না। অন্যদের মতো প্রথম বাধা আসে পরিবার থেকেই। বঙ্গমাতা স্কুল ফুটবলে খেলেন নিজ স্কুল টেপুরগাড়ী বিকে স্কুল থেকে। তখন পরিবার থেকে প্রবল বাধা। ‘ফুটবল খেললে হাত পা ভেঙে যাবে। তাছাড়া মেয়েরা কেন ফুটবল খেলবে। এদের বিয়ে দিতে সমস্যা হয়।’ এই যুক্তিতে মুনকির দাদী বন্ধ করে দিচ্ছিলেন টেপুরগাড়ী বিকে স্কুলে যাওয়াই বন্ধ করে দিচ্ছিলেন। কেড়ে নেন মুনকির বইপত্র। ওই স্কুলের বদলে অন্য স্কুলে ভর্তি করানোর সিদ্ধান্ত নেন। মুনকি জানান, এতে আমার এক বছর খেলা বন্ধ ছিল। পরে আমার স্কুলের প্রধান শিক্ষক আবদুর রশীদ আমাদের বাসায় এসে সবাইকে বুঝান। আশ্বাস দেন রংপুরের মৌসুমী আপু, স্বপ্না আপু রতœা আপুর মতো আমিও বড় খেলোয়াড় হতে পারব। এতে শেষ পর্যন্ত পরিবার থেকে ছাড়পত্র মেলে।’ জানান, ‘এখন আমাকে কেউ কিছু বলার সাহস পায় না। আমার টাকায় সংসার চলে। দুই বোন আর এক ভাইয়ের মধ্যে আমি বড়। তাই এলাকার লোকজন আমাকে বড় ছেলে বলেই অভিহিত করে- এটা আমার খুব ভালো লাগে।’

২০২২ সালে কমলাপুর স্টেডিয়ামে ভালো করার পর যশোরে দুই মাসের ক্যাম্প হয় ফুটবলারদের। সেখানেও কোচদের পাশ মার্ক জোটে মুনকির। সেই ছুটে চলাটা আজো অব্যাহত। যশোরের ক্যাম্পে লালমনিরহাট থেকে সাত ফুটবলার ডাক পেলেও একে একে সবাই বাদ। টিকে আছেন শুধু মুনকি। বললেন, ‘প্রথম দিকে ক্যাম্পে কান্না কাটি করতাম। বয়সও খুব কম ছিল। কোচরাও তেমন পরিশ্রম করাত না। এর পরও যতটুকু করেছি অনুশীলন- সেটিই যথেষ্ট প্রমাণিত হয়েছে।

মুনকির প্রথম জাতীয় দলে খেলা ২০২৩ সালে অনূর্ধ্ব-১৫ সাফ ফুটবলে। সে আসরে অবশ্য বাংলাদেশ চ্যাম্পিয়ন হতে পারেনি। নেপালের বিপক্ষে জয়নব বিবি রিতার পেনাল্টি মিসের কারণে রানার্সআপেই সন্তুষ্টি। এরপর ২০২৪ সালে অনূর্ধ্ব-১৯ সাফে ভারদের সাথে যৌথ চ্যাম্পিয়ন হওয়া বাংলাদেশ দলের সদস্য ছিলেন তিনি। সে বছরই চাইনিজ তাইপের বিপক্ষে ফিফা প্রীতিম্যাচে সিনিয়র জাতীয় দলে অভিষেক। গত বছর তিনি সিনিয়র জাতীয় দল ও অনূর্ধ্ব-২০ জাতীয় দলে খেলেছেন। দুই বিভাগেই দলকে ফাইনাল রাউন্ডে তুলতে ভুমিকা রাখেন। এ ছাড়া অনূর্ধ্ব-২০ সাফে বাংলাদেশকে চ্যাম্পিয়ন করানোর ক্ষেত্রেও বিশাল অবদান তার।

মুনকি নিজে যেমন গোল করতে পারেন। তেমনি গোল করানোর ক্ষেত্রেও সিদ্ধহস্ত। লাওসের মাঠে লাওসরে বিপক্ষে গোল করেছিলেন এএফসি অনূর্ধ্ব-২০ ফুটবলের বাছাই পর্বে। বিপক্ষ গোলরক্ষককে প্রথম পোস্টেই বোকা বানান তিনি। বাম পায়ের আলতো প্লেসিংয়ে বল জালে পাঠান। মুনকি জানান, আন্তর্জাতিক ম্যাচে এই গোলটিই আমার সবচেয়ে স্মরণীয়। লাওসের গোলরক্ষক ধরেই নিয়েছিল আমি বল ক্রস করব। তাই সে প্রথম পোস্ট একটু ফাঁকা রেখেছিল। আমিও সেন্স কাজে লাগিয়ে প্রথম পোস্টের সামান্য গ্যাপ দিয়েই বল জালে পাঠাই।’ আর সেরা অ্যাসিস্ট হিসেবে উল্লেখ করলেন গত বছর অনূর্ধ্ব-২০ সাফে নেপালের বিপক্ষে ফিরতি ম্যাচে সাগরিকাকে দিয়ে করানো গোলকে।

ব্রাজিলের নেইমার এবং দেশে হামজা চৌধুরী প্রিয় খেলোয়াড় মুনকির। নারী ফুটবলারদের মধ্যে মণিকা, মারিয়ার খেলা ফলো করেন। লক্ষ্য জাতীয় দলে নিয়মিত থাকা।