গৌরনদীতে উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ পেতে ১৪ শতাংশ লেনদেন
এ অর্থ একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে তিন স্তরে বণ্টন করা হয়
Printed Edition
আরিফিন রিয়াদ গৌরনদী (বরিশাল)
বরিশালের গৌরনদীতে সরকারি উন্নয়ন প্রকল্পে কাজ পেতে শুরু থেকেই ‘অঘোষিত লেনদেন’ বাধ্যতামূলক- এমন অভিযোগ তুলেছেন একাধিক ঠিকাদার। তাদের দাবি, কাজ পাওয়া থেকে শুরু করে বিল উত্তোলন পর্যন্ত প্রতিটি ধাপে নির্দিষ্ট হারে অর্থ দিতে হয়, যা প্রকল্পভেদে ৮ থেকে ১৪ শতাংশ পর্যন্ত পৌঁছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এ অর্থ একটি নির্দিষ্ট চক্রের মাধ্যমে তিন স্তরে বণ্টন করা হয়।
স্থানীয় সূত্র জানায়, ব্রিজ নির্মাণ, মুক্তিযোদ্ধা আবাসন, টিআর (টেস্ট রিলিফ) ও কাবিখা (কাজের বিনিময়ে খাদ্য) প্রকল্পসহ বিভিন্ন উন্নয়ন কাজে অংশ নিতে হলে আগে থেকেই ‘সমঝোতা’ করতে হয়। নির্ধারিত অর্থ দিতে না চাইলে দরপত্রে অংশ নিয়েও কাজ পাওয়া যায় না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে কাজ বাতিল বা অন্যের নামে বরাদ্দ দেয়ার অভিযোগও রয়েছে।
ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিটি প্রকল্পের জন্য একটি ‘অলিখিত হার’ চালু রয়েছে। ব্রিজ নির্মাণে গড়ে প্রায় ১০ শতাংশ, মুক্তিযোদ্ধা আবাসনে ৮ শতাংশ এবং টিআর ও কাবিখা প্রকল্পে বিল ছাড়ের সময় প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত অর্থ দিতে হয়। এ হার প্রকল্পভেদে পরিবর্তিত হলেও সংশ্লিষ্ট দফতরে এটি দীর্ঘদিনের প্রচলিত নিয়মে পরিণত হয়েছে বলে তারা দাবি করেন।
ভুক্তভোগীরা জানান, আদায়কৃত অর্থ একটি নির্দিষ্ট চেইনের মাধ্যমে তিন স্তরে বণ্টন করা হয়। তাদের মতে, উপজেলা প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়, প্রকল্প বাস্তবায়ন দফতর এবং বিল প্রক্রিয়ার সাথে যুক্ত সংশ্লিষ্ট দফতরের কিছু ব্যক্তি এতে জড়িত।
ঠিকাদাররা আরো অভিযোগ করেন, নির্ধারিত অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে বিল প্রক্রিয়ায় নানা জটিলতা সৃষ্টি করা হয়। ফাইল আটকে রাখা, কাগজপত্রে ত্রুটি দেখানো কিংবা অডিটের অজুহাতে বিলম্ব ঘটিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়। ফলে বাধ্য হয়ে অনেকেই অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে কাজ নিতে সম্মত হন। এতে প্রকল্পের ব্যয় বেড়ে যাওয়ার পাশাপাশি কাজের মানও ক্ষতিগ্রস্ত হয় বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন। তবে, অভিযোগের এসব বিষয়ের কোনো প্রামাণ্য নথি কিংবা দলিল পাওয়া যায়নি এবং অভিযোগগুলোর স্বাধীন যাচাই করাও সম্ভব হয়নি।
এদিকে কাবিখা প্রকল্পের চাল ও গম কম দামে বিক্রি, কাজ সম্পূর্ণ না করেই বিল উত্তোলন এবং প্রকল্প সভাপতিদের সাথে যোগসাজশে অর্থ ভাগাভাগির অভিযোগও উঠেছে। অভিযোগকারীরা ‘আলিম’ নামে এক প্রকৌশলীর সম্পৃক্ততার কথা উল্লেখ করলেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
জিআর বরাদ্দ নিয়েও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। বড় দিন উপলক্ষে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে অর্থ নেয়া এবং বরাদ্দ পাওয়া প্রতিষ্ঠানের মধ্যে বেশ কিছু ভুয়া বা অস্তিত্বহীন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া সরবরাহকৃত খাদ্য, টিন ও কম্বলের মান নিয়েও অসন্তোষ রয়েছে।
এসব অভিযোগের কেন্দ্রে পিআইও কার্যালয়ের অফিস সহকারী শংকর বড়াল মিলনের নাম উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, তার মাধ্যমেই অর্থ সংগ্রহ ও বণ্টন করা হয়। সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিওতে তাকে টাকার বান্ডিল গুনতে দেখা গেছে, যা এ বণ্টন প্রক্রিয়ারই অংশ।
তবে শংকর বড়াল মিলন অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, ‘আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সত্য নয়।’
এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো: ইব্রাহীম ও উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা খোকন শীলের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করেও তাদের সাথে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।