জোয়ান শাহী হাওরে হুমকির মুখে কৃষকের ৫ হাজার একর বোরো জমি

কর্তৃপক্ষের তদারকির অভাব

Printed Edition
bangla-4
নদীতে পানি না থাকায় ব্যাহত হচ্ছে সেচ : নয়া দিগন্ত

আলি জামশেদ নিকলী-বাজিতপুর (কিশোরগঞ্জ)

কর্তৃপক্ষের পর্যাপ্ত তদারকি ও সময়োপযোগী অবকাঠামো উন্নয়নের অভাবে কিশোরগঞ্জের বৃহত্তর হাওরে হুমকির মুখে পড়েছে কৃষকদের পাঁচ হাজার একর বোরো জমি। সেই সাথে দিন দিন বাড়ছে কৃষকদের ভোগান্তির মাত্রা।

কৃষকদের অভিযোগ, নদী-খাল খনন ও সড়ক সংস্কারের দীর্ঘদিনের সঙ্কট নিরসন না হওয়ায় বেড়েছে উৎপাদন ব্যয়, ব্যাহত হচ্ছে সেচব্যবস্থা এবং কৃষকদের মনে আশঙ্কা বাসা বাঁধছে অকাল বন্যার। তবে জেলা কৃষি অফিস বলছে, সমস্যার বড় অংশ ইতোমধ্যে সমাধান হয়েছে। বাকিগুলোও পর্যায়ক্রমে সমাধানের চেষ্টা করা হচ্ছে।

কিশোরগঞ্জ জেলার নিকলী-বাজিতপুর, অষ্টগ্রাম ও মিঠামইন উপজেলার মধ্যবর্তী বিস্তৃত হাওরটি জোয়ান শাহী নামে পরিচিত। এটি জেলার বৃহত্তম হাওর। কিশোরগঞ্জ জেলার মোট আয়তন প্রায় দুই হাজার ৬৮৯ বর্গকিলোমিটার, আবাদযোগ্য জমির পরিমাণ প্রায় ১৭ হাজার ৮২০ হেক্টর। স্থানীয় কৃষি অফিসের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে প্রায় ১৪ হাজার ৪৩১ হেক্টর জমিতে বোরো আবাদ হবে এবং এর থেকে প্রায় ৬৩ হাজার মেট্রিক টন চাল উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। স্থানীয়দের হিসেবে জোয়ান শাহী হাওরের আয়তন প্রায় ৫২ বর্গকিলোমিটার। এক কথায়, এই হাওরাঞ্চল কৃষিনির্ভর।

বর্ষায় হাওর ও অধিকাংশ সড়ক তলিয়ে যায়। পানি নামতেই শুরু হয় বোরোর আবাদ।

তবে, হাওরের বিভিন্ন বিল, নদী-নালা ও খালের খনন না থাকায় এবং সড়ক অবকাঠামোর দুরবস্থায় কৃষকদের ভোগান্তি থাকে চরমে। রাস্তা সংস্কার না হওয়ায় পরিবহন ব্যয় বাড়ছে, খাল-নদীর নাব্যতা সঙ্কটে সেচের পানি ঠিকমতো পৌঁছাচ্ছে না ইত্যাদি। চৈত্রের খরায় নদী থেকে খালে পানি প্রবেশ না করায় আশপাশের বোরো ফসল হুমকিতে পড়ে। কোথাও কোথাও বিলের পানি সময়মতো না নামায় দেরিতে আবাদ হয়। ফলে অকাল বন্যা বা ভারী বর্ষণে ফসল তলিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। কৃষকদের দাবি, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় কার্যকর ব্যবস্থা নিলে এই ভোগান্তি তাদের থাকতো না কিংবা অনেকাংশেই কমে আসতো।

নিকলী উপজেলার দামপাড়া গ্রামের কৃষক কামরুল ইসলাম জানান, বোরোলিয়া নদীতে ২০২২-২৩ অর্থবছরে প্রায় দুই কোটি টাকা ব্যয়ে খনন প্রকল্প নেয়া হলেও নদীর মুখের গুরুত্বপূর্ণ অংশ খনন না হওয়ায় কাক্সিক্ষত সুফল মেলেনি। ফলে নৌপথে কৃষি সরঞ্জাম আনা-নেয়ায় বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। এই নদীকেন্দ্রিক প্রায় চার হাজার একর জমি রয়েছে। প্রবাহ না থাকায় সেচের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে নদীর পানি শুকিয়ে যায়। সেই সাথে অকেজো হয়ে পড়ে বারোলিয়া খালের আশপাশের তিনটি বড় স্কিমসহ অন্তত ৩০টি ছোট ছোট স্কিম। এতে বোরো ফসল মারাত্মক ঝুঁকিতে পড়ে। তবে সম্প্রতি স্থানীয় কৃষকরা জানান, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অষ্টগ্রামের টেটা খালের মুখ খনন সম্পন্ন করায় প্রায় আড়াই হাজার একর বোরো জমি রক্ষা পেয়েছে।

অভিযোগের ভিত্তিতে জানা গেছে, পূর্ব অষ্টগ্রামের ইকরদিয়া থেকে চৌদন্ত বন্তীর বড় হাওর পর্যন্ত সাতটি মৌজার প্রায় ছয় হাজার হেক্টর জমি এই নদী ব্যবস্থার ওপর নির্ভরশীল। সরেজমিন জোয়ান শাহী হাওর ঘুরে দেখা যায়, ছাতিরচর থেকে অষ্টগ্রামমুখী প্রায় ছয় কিলোমিটার সাবমারসিবল সড়কটি প্রস্থে সঙ্কীর্ণ হওয়ায় মুখোমুখি যানবাহন চলাচলে ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, দ্রুত সড়ক প্রশস্তকরণ ও সংস্কার প্রয়োজন। পাশাপাশি লোহামারা নদীর পাড় থেকে নয়া সড়ক পর্যন্ত দুই কিলোমিটার মেঠোপথ এবং কাছাকাছি আরো একটি দুই কিলোমিটার কাঁচা সড়ক কৃষকদের খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

সিংপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক ও সাবেক ইউপি সদস্য মো: ইয়াকুব মিয়া বলেন, নাওটান ও চিকন খালী খালের খনন না থাকায় যাতায়াত ব্যয় বেড়েছে। শুকনো মৌসুমে খালের পানি শুকিয়ে যায়, বোরো জমির সেচ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়। নতুন খালকে ধনু নদীর সাথে যুক্ত করে পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে আশপাশের প্রায় পাঁচশ’ একর বোরো জমি রক্ষা পেত।

এ ছাড়া জেলার বিভিন্ন স্থানে নদী ও খাল খননের অভাবে বিপুল পরিমাণ আবাদি জমি ঝুঁকিতে রয়েছে। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন, অতীতে খাল খননের নামে দুর্নীতি ও অনিয়ম হয়েছে, অনেক প্রকল্পে সরকারি অর্থের অপব্যয় হয়েছে। এতে করে ক্ষতির মুখে পড়তে হয়েছে কৃষকদের।

এ বিষয়ে জেলা কৃষি অফিসার ড. সাদিকুর রহমান বলেন, জোয়ান শাহী হাওরের সমস্যাসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়মিত জেলা সমন্বয় সভায় উপস্থাপন করা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় অষ্টগ্রামের টেটা খালের খনন সম্পন্ন করে প্রায় আড়াই হাজার একর বোরো জমি ঝুঁকি থেকে উদ্ধার করা হয়েছে। অবশিষ্ট সমস্যাগুলো সমাধানেও কাজ চলমান রয়েছে।