শাকসু নির্বাচন ৪ সপ্তাহ স্থগিত হাইকোর্টে

Printed Edition
first-3
হাইকোর্টে শাকসু নির্বাচন স্থগিত রাখার নির্দেশ দেয়ায় শাবিতে শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে প্রতিবাদ : নয়া দিগন্ত

শাবিপ্রবি প্রতিনিধি ও সিলেট ব্যুরো

  • প্রতিবাদে সড়ক অবরোধ প্রশাসনিক ভবনে তালা

  • দায়িত্ব পালন না করার ঘোষণা বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের

  • ২০ জানুয়ারিতেই নির্বাচন দাবি ইউটিএলের

শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন চার সপ্তাহের জন্য স্থগিতের নির্দেশ দিয়েছেন হাইকোর্ট। দীর্ঘ ২৮ বছর পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই নির্বাচন স্থগিতের খবরে ক্যাম্পাসে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। শিক্ষার্থীরা নির্বাচনকে তাদের মৌলিক গণতান্ত্রিক অধিকার দাবি করে সড়ক অবরোধ, প্রশাসনিক ভবনে তালা এবং লাগাতার বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করছেন। একই সাথে শাকসু নির্বাচন ঘিরে শিক্ষক সমাজেও স্পষ্ট বিভাজন প্রকাশ্যে এসেছে। এর আগে শাকসু ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিত চেয়ে করা একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে গতকাল হাইকোর্ট চার সপ্তাহের জন্য নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশ দেন। এ আদেশের ফলে আজ মঙ্গলবার অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা থাকলেও শাকসু নির্বাচন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে।

হাইকোর্টের এ সিদ্ধান্ত বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। শিক্ষার্থীদের অভিযোগ, দীর্ঘদিন পর শিক্ষার্থীদের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হলেও একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে আইনি জটিলতা তৈরি করে নির্বাচন বানচালের চেষ্টা করছে।

নির্বাচন স্থগিতের নির্দেশে সোমবার বেলা ২টার দিকে শাবিপ্রবির মূল ফটক থেকে বের হয়ে শিক্ষার্থীরা সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়ক অবরোধ করেন। এতে সড়কের দুই পাশে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয় এবং সাধারণ যাত্রীরা চরম ভোগান্তিতে পড়েন। পরে শিক্ষার্থীরা জরুরি যান চলাচলের জন্য সড়কের এক পাশ আংশিকভাবে খুলে দেন।

বিক্ষোভে অংশ নেন শাকসু নির্বাচনে ছাত্রশিবির সমর্থিত ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’, ‘সাধারণের ঐক্যস্বর’ প্যানেল, ছাত্রদল সমর্থিত ‘সম্মিলিত সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের একাংশ, বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থী এবং বিপুলসংখ্যক সাধারণ শিক্ষার্থী।

বিক্ষোভ চলাকালে শিক্ষার্থীরা- ‘শাকসু আমার অধিকার, রুখে দেয়ার সাধ্য কার’/‘শাকসু কয় তারিখ- ২০ তারিখ’/‘শহীদ রুদ্র শিখিয়ে গেছে, লড়াই করে বাঁচতে হবে’/‘মব করে শাকসু বন্ধ করা যাবে না’/‘হাইকোর্ট দিয়ে শাকসু বন্ধ করা যাবে না’- এমন নানা স্লোগান দেন।

এর আগে নির্বাচন স্থগিতের প্রতিবাদে শিক্ষার্থী ও প্রার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রশাসনিক ভবনে তালা ঝুলিয়ে দেন। এতে ভিসি, প্রোভিসি, ট্রেজারার, রেজিস্ট্রারসহ প্রশাসনের শীর্ষ কর্মকর্তারা কিছু সময়ের জন্য অবরুদ্ধ হয়ে পড়েন। পরে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে প্রশাসনের পক্ষ থেকে শিক্ষার্থীদের সাথে আলোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়।

বিক্ষোভরত শিক্ষার্থীরা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন পর অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া শাকসু নির্বাচন একটি পক্ষ পরিকল্পিতভাবে আইনি জটিলতা সৃষ্টি করে বানচালের চেষ্টা করছে। তাদের মতে, হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ শিক্ষার্থীদের মধ্যে ক্ষোভ ও হতাশা তৈরি করেছে এবং এটি ক্যাম্পাসের গণতান্ত্রিক পরিবেশের জন্য অশনিসঙ্কেত।

শিক্ষার্থীদের স্পষ্ট দাবি- হাইকোর্টের আদেশ প্রত্যাহার করে আগামীকাল ২০ জানুয়ারিই শাকসু নির্বাচন আয়োজন করতে হবে; অন্যথায় আন্দোলন আরো কঠোর হবে বলে হুঁশিয়ারি দেন তারা।

দায়িত্ব পালন না করার ঘোষণা বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের : এ দিকে শাকসু নির্বাচন ঘিরে উত্তেজনার মধ্যেই বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের একটি অংশ নির্বাচনসংক্রান্ত দায়িত্ব পালন না করার ঘোষণা দিয়েছেন। গতকাল সামাজিক বিজ্ঞান ভবনের শিক্ষক মিলনায়তনে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের ব্যানারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেয়া হয়।

সংবাদ সম্মেলনে সংগঠনের সভাপতি অধ্যাপক ড. আশরাফ উদ্দীন বলেন, ‘শিক্ষকদের একটি অংশের বিরুদ্ধে পরিকল্পিতভাবে ষড়যন্ত্রের অভিযোগ তোলা হচ্ছে। এ অভিযোগের তীর বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের দিকেই ছোড়া হয়েছে। এখন আমরা দায়িত্ব পালন করলেও আবার আমাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ আসবে। এ অবস্থায় জাতীয়তাবাদে বিশ্বাসী শিক্ষকরা শাকসু নির্বাচনে দায়িত্ব পালন না করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’

তিনি আরো বলেন, শাকসু নির্বাচন যেন সুষ্ঠু ও অংশগ্রহণমূলক হয়, সে লক্ষ্যে তারা শুরু থেকেই সহযোগিতা করে আসছিলেন। কিন্তু ৫ আগস্টের পর একটি হল দখল, হল ব্যবস্থাপনা নীতিমালা বাতিল, নির্বাচন কমিশনে বারবার পরিবর্তন এবং নির্বাচন স্থগিতের বিষয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের চিঠি- এসব বিষয় নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

অধ্যাপক আশরাফ উদ্দীন অভিযোগ করেন ভিসি ও ট্রেজারার কোনো আলোচনা ছাড়াই নির্বাচন কমিশনে গিয়ে একক সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তিনি জানান, ১৫ সদস্যের নির্বাচন কমিশনের মধ্যে এরই মধ্যে আটজন শিক্ষক পদত্যাগের সিদ্ধান্ত নিয়েছেন এবং অন্য শিক্ষকদেরও দায়িত্ব থেকে সরে আসার আহ্বান জানান।

সংবাদ সম্মেলনে জাতীয়তাবাদী শিক্ষক ফোরামের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. আতিকুল ইসলামসহ অধ্যাপক ড. খায়রুল ইসলাম, অধ্যাপক ড. ইফতেখার আহমেদ, অধ্যাপক ড. সালমা আক্তার প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

২০ জানুয়ারিতেই নির্বাচন চাই ইউটিএল : একই দিনে বেলা ১টায় সামাজিক বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষক মিলনায়তনে সংবাদ সম্মেলন করে ইউনিভার্সিটি টিচার্স লিংক (ইউটিএল) সাস্ট চ্যাপ্টার। তারা স্পষ্টভাবে ২০ জানুয়ারিতেই শাকসু নির্বাচন আয়োজনের দাবি জানান।

ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের সদস্য সচিব অধ্যাপক ড. মো: সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘দীর্ঘ ২৮ বছর পর শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে। শিক্ষার্থীদের এই গণতান্ত্রিক অধিকার কোনোভাবেই নষ্ট করা উচিত নয়। নির্ধারিত সময় অনুযায়ী নির্বাচন আয়োজনের জন্য আমরা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানাচ্ছি।’

তিনি আরো বলেন, কয়েকজন শিক্ষক অসহযোগিতার কথা বললেও বেশির ভাগ শিক্ষক শাকসু নির্বাচন অনুষ্ঠানের পক্ষে রয়েছেন এবং ইউটিএলের পক্ষ থেকে প্রশাসনকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করা হবে। ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের আহ্বায়ক অধ্যাপক ড. আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘আমরা কাউকে ষড়যন্ত্রকারী বলছি না। যারা দায়িত্ব পালন না করার কথা বলেছেন, তাদের প্রতিও আহ্বান- শিক্ষার্থীদের স্বার্থ বিবেচনায় এগিয়ে আসুন।’ সংবাদ সম্মেলনে অধ্যাপক ড. জামালুদ্দিন, অধ্যাপক ড. অহিদুজ্জামানসহ সংগঠনের নেতারা উপস্থিত ছিলেন।

প্রার্থীদের অবস্থান : ‘দুর্বার সাস্টিয়ান ঐক্য’ প্যানেলের ভিপি পদপ্রার্থী দেলোয়ার হাসান শিশির বলেন, ‘নির্বাচন যথাসময়েই হতে হবে। আমরা জানতে পেরেছি, নির্বাচন কমিশনের আটজন শিক্ষক পদত্যাগ করেছেন। আমাদের আন্দোলন আরো কঠোর হবে।’ বিকেল পর্যন্ত বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সাথে প্রার্থীদের বৈঠক চলছিল এবং ইউটিএল সাস্ট চ্যাপ্টারের পক্ষ থেকেও নতুন করে সংবাদ সম্মেলনের ঘোষণা দেয়া হয়।

এই প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত শাবিপ্রবির সামনের সিলেট-সুনামগঞ্জ সড়কে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভ কর্মসূচি চলমান ছিল। হাইকোর্টের স্থগিতাদেশ, শিক্ষক সমাজের বিভাজন এবং শিক্ষার্থীদের লাগাতার আন্দোলনে শাকসু নির্বাচন ঘিরে ক্যাম্পাসে অনিশ্চয়তা ও উত্তেজনা আরো গভীর হচ্ছে।

স্থগিতের বিরুদ্ধে চেম্বার আদালতে শাবিপ্রবি প্রশাসন : এ দিকে সিলেটের শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (শাবিপ্রবি) কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (শাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচন স্থগিত করে হাইকোর্টের দেয়া আদেশের বিরুদ্ধে আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে আবেদন করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

গতকাল সোমবার বিকেলে করা এ আবেদনে হাইকোর্টের চার সপ্তাহের স্থগিতাদেশ বাতিল বা স্থগিত চাওয়া হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট মো: সাদ্দাম হোসেন এ আবেদনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন বলছে, তারা আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই এ স্থগিতাদেশ মোকাবেলা করতে চায়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে আইনজীবী হিসেবে রয়েছেন অ্যাডভোকেট মোহাম্মদ হোসাইন লিপু ও অ্যাডভোকেট মো: সাদ্দাম হোসেন। রাষ্ট্রপক্ষে শুনানিতে অংশ নেন অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল অনীক আর হক।