পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বড় বাধা সংরক্ষণাগারের অভাব

Printed Edition
Back Photo-6
পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনে বড় বাধা সংরক্ষণাগারের অভাব

কাওসার আজম

রান্নাঘরে নিত্যদিনের অপরিহার্য একটি উপকরণ পেঁয়াজ। এ একটি পণ্য ঘিরেই বছরের পর বছর সাধারণ মানুষের স্বস্তি-অস্বস্তি, বাজার অস্থিরতা এবং সরকারের প্রস্তুতির প্রশ্ন উঠে আসে। কখনো প্রতিবেশী দেশের রফতানি নিষেধাজ্ঞা, কখনো দেশীয় বাজারে কৃত্রিম সঙ্কট- সব মিলিয়ে পেঁয়াজ বাংলাদেশের কৃষি ও বাজার ব্যবস্থার সবচেয়ে স্পর্শকাতর পণ্যগুলোর একটি। তবে কৃষি বিভাগের পরিসংখ্যান বলছে, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ চিত্র ধীরে হলেও বদলাচ্ছে। দেশে পেঁয়াজের উৎপাদন বাড়ছে, কমছে আমদানিনির্ভরতা। ২০২৪ সালের মধ্যে স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জনের কথা ছিল। কিন্তু সে সময় এক বছর পেরিয়ে গেলেও তা এখনো অর্জিত হয়নি। তবে, পেঁয়াজে আমদানিনির্ভরতা ৬০-৭০ শতাংশ কমে আসা একটি বড় অগ্রগতি হিসেবেই দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। পেঁয়াজ উৎপাদন বা উত্তোলন পরবর্তী সংরক্ষণ করার ব্যবস্থা না থাকায় উৎপাদিত পেঁয়াজের প্রায় ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যায়। উত্তোলন-পরবর্তী এ নষ্ট রোধ করা গেলে বিদেশ থেকে আর পেঁয়াজ আমদানি করতে হবে না বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের (ডিএই) উদ্ভিদ সঙ্গনিরোধ উইংসূত্রে জানা যায়, ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে পেঁয়াজ আমদানি করতে হয়েছিল ছয় লাখ ৬৪ হাজার ৭৭১ টন। পরের বছর ২০২২-২৩ অর্থবছরে আমদানি আরো বেড়ে দাঁড়ায় সাত লাখ ৪৩ হাজার ৮৩০ টনে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। ওই সময় বাজার পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়ে। তবে এরপর থেকেই পরিস্থিতি ধীরে ধীরে বদলাতে শুরু করে। ২০২৩-২৪ অর্থবছরে আমদানি নেমে আসে ছয় লাখ ৪২৬ টনে এবং ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তা আরো কমে দাঁড়ায় চার লাখ ৭৩ হাজার ১১৭ টনে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি হয়েছে ৮৩ হাজার ৯৬৫ টন। বর্তমানে পেঁয়াজ আমদানি বন্ধ রাখা হয়েছে। যদিও রমজান মাস সামনে রেখে বাজার স্থিতিশীল রাখতে আরো ৩০- ৪০ হাজার টন পেঁয়াজ আমদানির প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। এর পরই শুরু হবে দেশীয় পেঁয়াজ উত্তোলনের মৌসুম। সব মিলিয়ে চলতি অর্থবছরে পেঁয়াজ আমদানি এক লাখ ৫০ হাজার টনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতে পারে বলে ধারণা কৃষি বিভাগের।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এ অগ্রগতির পেছনে রয়েছে সরকারের দীর্ঘমেয়াদি কর্মপরিকল্পনা। ২০১৯ সালে নেয়া রোডম্যাপ অনুযায়ী ২০২০-২০২৪ সালের মধ্যে উৎপাদন ১০ লাখ টন বাড়িয়ে দেশকে পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়। ২০২৪ সালে সে লক্ষ্য পূরণের কথা থাকলেও বাস্তবে নির্ধারিত সময় পেরিয়ে আরো এক বছর চলে গেছে। এখনো পুরোপুরি স্বয়ংসম্পূর্ণতা অর্জিত হয়নি। তবে সংশ্লিষ্টদের মতে, আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। তাদের ধারণা, বর্তমান ধারা বজায় থাকলে আগামী দুই-তিন বছরের মধ্যেই পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার কাছাকাছি পৌঁছানো সম্ভব হবে।

পেঁয়াজ উৎপাদনের পরিসংখ্যানও এ আশার কথা বলছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে চারা, কন্দ ও বীজ মিলিয়ে দুই লাখ ৮০ হাজার ১০০ হেক্টর জমিতে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টন পেঁয়াজ উৎপাদন হয়েছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে আবাদি জমির লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে দুই লাখ ৮৬ হাজার ৩০০ হেক্টর এবং উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪২ লাখ ৬৪ হাজার ১০০ টন। আগের বছরগুলোতেও উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে বেড়েছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩৪ লাখ ১৬ হাজার ৯৯০ টন এবং ২০২৩-২৪ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়ায় ৩৭ লাখ ৮৯ হাজার ৮৮৭ টনে।

তবে শুধু উৎপাদন বাড়লেই সঙ্কটের স্থায়ী সমাধান হচ্ছে না। খাতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশে বছরে পেঁয়াজের চাহিদা ২৮-৩২ লাখ টনের মধ্যে। উৎপাদন এ চাহিদার চেয়ে বেশি হলেও অপরিপক্ব উৎপাদন, সংরক্ষণব্যবস্থার দুর্বলতা এবং পচনশীলতার কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ পর্যন্ত পেঁঁয়াজ নষ্ট হয়ে যায়। ফলে প্রকৃত প্রাপ্য উৎপাদন অনেক কমে আসে। এর সরাসরি প্রভাব পড়ে বাজারে। প্রায় প্রতি বছরই নভেম্বর-ডিসেম্বরের দিকে পেঁয়াজের সঙ্কট দেখা দেয়, হঠাৎ বেড়ে যায় দাম, আর তখনই আবার আমদানির ওপর নির্ভর করতে হয়।

২০২২-২৩ অর্থবছরের হিসাবেই এর স্পষ্ট উদাহরণ রয়েছে। সে বছর উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ৩৬ লাখ টন। তবে উৎপাদন হয় ৩৪ লাখ ১৭ হাজার টন। কিন্তু পচে যাওয়া ও সংরক্ষণ ঘাটতির কারণে প্রায় ৩০ শতাংশ বাদ দিলে প্রকৃত উৎপাদন নেমে আসে প্রায় ২৪ লাখ টনে। একইভাবে ২০২৩-২৪ অর্থবছরে উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে বেশি হলেও বাস্তবে বাজারে সরবরাহে চাপ তৈরি হয়েছিল।

বিশেষজ্ঞদের মতে, পেঁয়াজে স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে সবচেয়ে বড় বাধা সংরক্ষণাগারের অভাব। পেঁয়াজ পচনশীল পণ্য হওয়ায় স্বাভাবিকভাবে দীর্ঘদিন মজুত রাখা যায় না। স্থানীয় পদ্ধতিতে সংরক্ষণ করলে ১০-১২ শতাংশ পর্যন্ত শুকিয়ে যায়। আধুনিক কোল্ড স্টোরেজে সংরক্ষণের সুযোগ সীমিত এবং ব্যয়বহুল। বিশেষায়িত কোল্ড স্টোরেজ বাড়ানো গেলে পেঁয়াজের সঙ্কট অনেকটাই কমানো সম্ভব, যদিও এতে সংরক্ষণ ব্যয়ের কারণে দাম কিছুটা বাড়ার ঝুঁকিও থাকে।

এ বাস্তবতায় গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজকে তুলনামূলক নিরাপদ ও সম্ভাবনাময় হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্টরা। শীত আসার আগেই এ পেঁয়াজ বাজারে চলে আসে, ফলে দীর্ঘ সংরক্ষণের প্রয়োজন কমে। বাংলাদেশে মূলত গ্রীষ্মকালীন ও শীতকালীন- দুই মৌসুমেই পেঁঁয়াজ উৎপাদন হয়। উৎপাদন বাড়াতে গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজের ওপর জোর দেয়া হলেও এখানেও চ্যালেঞ্জ রয়েছে। গ্রীষ্মকালীন পেঁয়াজ চাষে খরচ প্রায় দ্বিগুণ হয়ে গেছে।

সব মিলিয়ে পেঁয়াজখাতে অগ্রগতি ও সীমাবদ্ধতা পাশাপাশি বিদ্যমান। উৎপাদন বাড়ছে, আমদানি কমছে- এটি স্বস্তির বার্তা। কিন্তু সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে না পারলে পেঁয়াজে স্থায়ী স্বস্তি আসবে না। কৃষক, ভোক্তা ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত উদ্যোগই পারে এ নিত্যপণ্যের দীর্ঘদিনের দোলাচল শেষ করে পেঁয়াজকে সত্যিকারের স্বয়ংসম্পূর্ণতার পথে নিয়ে যেতে।