তামাক কর কাঠামো সংস্কারে জোর অর্থনীতিবিদদের
ইআরএফ-পলিসি এক্সচেঞ্জ কর্মশালা
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বাংলাদেশে তামাক কর ব্যবস্থায় কাঠামোগত সংস্কার না হলে ভবিষ্যতে রাজস্ব বৃদ্ধির সম্ভাবনা সীমিত হয়ে পড়তে পারে বলে সতর্ক করেছেন অর্থনীতিবিদরা। তারা ধাপে ধাপে বর্তমান জটিল অ্যাড-ভ্যালোরেম (মূল্যভিত্তিক) কর ব্যবস্থা থেকে সরে এসে নির্দিষ্ট (স্পেসিফিক) কর ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে সরকারের রাজস্ব আয় বাড়ার পাশাপাশি ধূমপানের প্রবণতাও কমতে পারে বলে মনে করছেন তারা।
রাজধানীতে পলিসি এক্সচেঞ্জ বাংলাদেশ এবং ইকোনমিক রিপোর্টার্স ফোরাম (ইআরএফ) আয়োজিত এক কর্মশালায় এই বিশ্লেষণ তুলে ধরেন সংস্থাটির অর্থনীতিবিদ হাসনাত আলম। ইআরএফ সভাপতি দৌলত আক্তার মালার সভাপতিত্বে এবং সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেমের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত কর্মশালায় তিনি “বাংলাদেশে রাজস্ব বাড়াতে তামাক কর ব্যবস্থার অপ্টিমাইজেশন” শীর্ষক গবেষণা উপস্থাপন করেন।
গবেষণায় বলা হয়, বর্তমানে বাংলাদেশের অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বিনিয়োগে ধীরগতি, রাজস্ব আহরণে দুর্বলতা এবং বৈদেশিক খাতে চাপসহ নানা চ্যালেঞ্জের মুখে রয়েছে। এ পরিস্থিতিতে সরকারের আর্থিক ব্যবস্থাপনা কঠিন হয়ে উঠেছে এবং রাজস্ব আয়ের নতুন ও কার্যকর উৎস খুঁজে বের করা জরুরি হয়ে পড়েছে।
হাসনাত আলম তার গবেষণায় উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক সময়ে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে প্রায় ৩ দশমিক ৮ শতাংশে নামিয়ে এনেছে। একই সময়ে মূল্যস্ফীতি দীর্ঘ দিন ধরে উচ্চ পর্যায়ে রয়েছে। খাদ্য, জ্বালানি ও সারসহ বিভিন্ন পণ্যের দাম বৃদ্ধি এবং মুদ্রার অবমূল্যায়নের প্রভাবে মূল্যস্ফীতি আরো বেড়েছে। এর ফলে অভ্যন্তরীণ চাহিদা দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং সাধারণ মানুষের প্রকৃত আয় কমছে, কারণ মজুরি বৃদ্ধির হার মূল্যস্ফীতির তুলনায় কম।
অন্যদিকে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়ায় শিল্প ও বিনিয়োগ কার্যক্রমেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির গতি কমে যাওয়ায় কাঁচামাল ও মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানিতে ধীরগতি দেখা দিয়েছে।
গবেষণায় আরো বলা হয়, রাজস্ব আহরণ কম হওয়ায় সরকারের উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে ঋণের ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। বর্তমানে সরকারের মোট ঋণের পরিমাণ ২১ ট্রিলিয়ন টাকার বেশি, যার বড় অংশই বৈদেশিক ঋণ। গত এক দশকে ঋণ পরিশোধের ব্যয়ও দ্রুত বেড়েছে, যা দক্ষিণ এশিয়ার অন্যান্য দেশের তুলনায় বেশি।
কর-জিডিপি অনুপাত কম : বাংলাদেশের রাজস্ব ব্যবস্থার একটি বড় দুর্বলতা হলো নিম্ন কর-জিডিপি অনুপাত। ২০২২ সালে এ হার ছিল প্রায় ৭ দশমিক ৯ শতাংশ, যা ভারত, ভিয়েতনাম ও ইন্দোনেশিয়ার তুলনায় অনেক কম। এ ছাড়া মোট কর আয়ের বড় অংশ আসে পরোক্ষ কর- যেমন ভ্যাট ও আমদানি শুল্ক থেকে, ফলে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর তুলনামূলক বেশি করের চাপ পড়ে। এ প্রেক্ষাপটে তামাক খাতকে কার্যকর রাজস্ব উৎস হিসেবে আরো দক্ষভাবে ব্যবহার করার সুযোগ রয়েছে বলে গবেষণায় উল্লেখ করা হয়।
তামাক খাত রাজস্বের বড় উৎস : বাংলাদেশে তামাক খাত দীর্ঘ দিন ধরে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। বর্তমানে মোট রাজস্বের প্রায় ৯ থেকে ১১ শতাংশ আসে এ খাত থেকে। ২০১০ অর্থবছরে যেখানে রাজস্ব আদায় ছিল প্রায় ছয় হাজার ৪২০ কোটি টাকা, সেখানে ২০২৫ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪০ হাজার কোটি টাকার বেশি। তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এ খাতে রাজস্ব বৃদ্ধির গতি কিছুটা কমে এসেছে।
জটিল কর কাঠামোর সমস্যা
বর্তমানে দেশে সিগারেটের ওপর চার স্তরের কর কাঠামো- লো, মিডিয়াম, হাই ও প্রিমিয়াম চলমান রয়েছে। প্রতিটি স্তরের জন্য আলাদা ন্যূনতম মূল্য ও সম্পূরক শুল্ক নির্ধারিত। যদিও সাম্প্রতিক সময়ে সম্পূরক শুল্কের হার কাছাকাছি আনা হয়েছে, তবুও কাঠামোটি জটিল রয়ে গেছে। এর ফলে দাম বাড়লে ক্রেতারা কম দামের সিগারেটে ঝুঁকে পড়ে, অবৈধ বাজার বাড়ে এবং প্রত্যাশিত হারে রাজস্ব বৃদ্ধি হয় না। পাশাপাশি কর প্রশাসনও জটিল হয়ে পড়ে এবং কর ফাঁকি ও বাজার বিকৃতির সুযোগ তৈরি হয়।
গবেষণায় সুপারিশ করা হয়, তামাক কর ব্যবস্থাকে সহজ, স্বচ্ছ ও কার্যকর করতে ধাপে ধাপে নির্দিষ্ট কর ব্যবস্থায় রূপান্তর করা জরুরি। এতে রাজস্ব আহরণ বাড়ার পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের উন্নয়নেও ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।