চলতি অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি হতে পারে ৪.৭% : আইএমএফ

বাড়তি সহায়তার আশ^াস পাওয়া গেছে : অর্থমন্ত্রী

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি চার দশমিক ৭ শতাংশ হতে পারে বলে পূর্বাভাস দিয়েছে আন্তর্জাতিক অর্থ তহবিল (আইএমএফ)। তবে আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি কিছুটা কমে হতে পারে চার দশমিক ৩ শতাংশ।

যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের চলমান বসন্তকালীন সভা উপলক্ষে গত মঙ্গলবার রাতে (বাংলাদেশ সময় বুধবার সকাল) প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ বা ‘বিশ্ব অর্থনৈতিক পূর্বাভাস’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধির এই পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। আইএমএফের পক্ষ থেকে আশঙ্কা ব্যক্ত করে বলা হয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে চলমান অস্থিরতা অব্যাহত থাকলে বিশ^ একটি মন্দার সম্মুখীন হতে পারে।

এই সম্মেলনে যোগ দিতে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে একটি প্রতিনিধিদল বর্তমানে ওয়াশিংটনে অবস্থান করছেন।

এ দিকে, এর আগে গত অক্টোবর মাসে বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফের বার্ষিক সভায় প্রকাশিত আউটলুকে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ছিল ৪ দশমিক ৯ শতাংশ। এখন চলমান মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণে বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমিয়েছে আইএমএফ। ইরান যুদ্ধের কারণে বৈশ্বিক জিডিপি প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ১ শতাংশ হতে পারে বলে জানিয়েছে সংস্থাটি।

একই কারণে বৈশ্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় মূল্যস্ফীতির পূর্বাভাস বাড়িয়েছে আইএমএফ। সংস্থাটি বলছে, চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার ৯ দশমিক ২ শতাংশ হতে পারে। গত অক্টোবর মাসে আইএমএফ বলেছিল, চলতি অর্থবছরে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ হবে। এ হার ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ছিল ১০ শতাংশ।

আইএমএফের প্রধান অর্থনীতিবিদ পিয়েরে-অলিভিয়ের গুরিনচাস জানিয়েছেন, বর্তমান ৩ দশমিক ১ শতাংশ পূর্বাভাসটি এই ধারণা দেয়া হয়েছে যে, ইরান যুদ্ধ দ্রুত শেষ হবে এবং ২০২৬ সালের দ্বিতীয়ার্ধে জ্বালানি বাজার আবার স্থিতিশীল হবে। কিন্তু বাস্তব পরিস্থিতি প্রতি দিন পরিবর্তিত হচ্ছে এবং যদি সঙ্ঘাত দীর্ঘায়িত হয়, তা হলে বিশ্ব অর্থনীতি ২ দশমিক ৫ শতাংশ প্রবৃদ্ধি আরো খারাপের দিকে চলে যেতে পারে। তিনি বলেন, বিশ্ব অর্থনীতি এখন ‘দুই অবস্থার মাঝখানে’ রয়েছে, এক দিকে তুলনামূলক স্থিতিশীল পূর্বাভাস, অন্য দিকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ নিম্ন প্রবৃদ্ধির পরিস্থিতি। তিনি সতর্ক করে বলেন, ‘প্রতি দিনই যদি জ্বালানি সরবরাহে বিঘœ ঘটে, তা হলে আমরা ধীরে ধীরে নেতিবাচক পরিস্থিতির আরো কাছাকাছি চলে যাচ্ছি।’

প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি

এ দিকে, গত সপ্তাহে দুটি আলাদা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কাক্সিক্ষত জিডিপির প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়ে দিয়েছে বিশ্বব্যাংক ও এডিবি। মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের কারণেই এই দুটি সংস্থা বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস কমিয়েছে। গত শুক্রবার এডিবির এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট আউটলুক এপ্রিল সংস্করণে বলা হয়, চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছরে বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ৪ শতাংশ হতে পারে। একই সাথে তারা জানিয়েছে, চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতির হার হবে ৯ শতাংশ।

এর আগে এডিবির গত সেপ্টেম্বর সংস্করণে চলতি অর্থবছরের প্রবৃদ্ধি ৫ শতাংশ হবে বলে পূর্বাভাস দেয়া হয়েছিল। এখন তা কমিয়ে দেয়া হলো।

এ দিকে গত বুধবার বিশ্বব্যাংক বলছে, বৈশ্বিক পরিস্থিতির কারণে চলতি (২০২৫-২৬) অর্থবছর বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি কমে ৩ দশমিক ৯ শতাংশ হতে পারে।

বাড়তি সহায়তার আশ^াস পাওয়া গেছে- অর্থমন্ত্রী

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে সৃষ্ট আর্থিক ঘাটতি পূরণে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংক থেকে বাড়তি সহায়তার আশ^াস পাওয়া গেছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী।

অর্থমন্ত্রী ওয়াশিংটনে আইএমএফ-বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন বৈঠকে সাইডলাইনে এসব সংস্থার কর্মকর্তাদের সাথে বৈঠকের পর সাংবাদিকদের এই ইঙ্গিত দেন। অর্থমন্ত্রী গত ১৩ এপ্রিল আইএমএফের নির্বাহী পরিচালক উর্জিত প্যাটেল এবং বিশ্বব্যাংকের দক্ষিণ এশিয়া বিষয়ক ভাইস প্রেসিডেন্ট জন জুটসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের সাথে পৃথক বৈঠক করেন।

অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে বলেন, আইএমএফ-এর বিদ্যমান প্রোগ্রামের কিস্তি ছাড়ের অতিরিক্ত আরো ভালো কিছু হতে পারে। তিনি বলেন, আশা করছি সার্বিকভাবে শর্ট-টার্মে জুনের মধ্যে এবং নেক্সট বাজেটে (অতিরিক্ত ফান্ডিং) পাওয়া যাবে। সার্বিক আলোচনা সফল হয়েছে।

তিনি বলেন, আমি মনে করি আমাদের যে ঘাটতিটা হয়ে গেছে, এটি পূরণে বহুলাংশে সফল হবো। বিশ্বব্যাংক অল-আউট সাপোর্ট দেয়ার জন্য রেডি রয়েছে। এর মধ্যে পলিসিগত সাপোর্ট যেমন রয়েছে, আবার ফান্ডিংয়ের বিষয় রয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘এমনিতে অর্থনীতিতে বিভিন্ন ঘাটতি নিয়ে আমরা সরকার পরিচালনায় এসেছি, যুদ্ধের কারণে বড় ধরনের আর্থিক ঘাটতির মধ্যে পড়েছি। এসব সমাধানে বিভিন্ন পদক্ষেপ নিয়ে আলোচনা হয়েছে।

ইতোমধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের ক্ষতি পুষিয়ে নিতে উন্নয়নশীল ও নিম্ন আয়ের দেশগুলোকে আইএমএফ ৫০ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত এবং বিশ্বব্যাংক ২৫ বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত জরুরি সহায়তার ঘোষণা দিয়েছে।

বর্তমানে বাংলাদেশের ৫ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার ঋণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে জুনের মধ্যে দুই কিস্তিতে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন ডলার পাওয়ার কথা রয়েছে এবং বিশ্বব্যাংক থেকে ৪০০ মিলিয়ন ডলার বাজেট সহায়তা পাওয়ার কথা রয়েছে।