ব্যাংকে বিপদ সঙ্কেত রেমিট্যান্সে প্রাণ

রিজার্ভ, ঋণ, বাজার ও প্রবৃদ্ধি- বাংলাদেশ অর্থনীতির ভেতরের দ্বৈত বাস্তবতা

Printed Edition

বিশেষ সংবাদদাতা

ঢাকার মতিঝিলের সকালে সংখ্যাও যেন গল্প বলে। এক দিকে ডলার আসছে, প্রবাসীরা পাঠাচ্ছেন রেকর্ড রেমিট্যান্স; অন্য দিকে ব্যাংকের ভল্টে জমছে খেলাপি ঋণের পাহাড়। রফতানি বাড়ছে; কিন্তু শেয়ারবাজার পড়ছে। রাজস্ব বাড়ছে; কিন্তু গতি খুব ধীর। এই বিপরীতমুখী প্রবাহের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আজকের বাংলাদেশ অর্থনীতি- না সঙ্কটে ভেঙে পড়েছে, না স্বস্তিতে স্থির হয়েছে।

গতকাল রোববার প্রকাশিত সর্বশেষ সাপ্তাহিক অর্থনৈতিক সূচক বলছে, দেশের সামষ্টিক অর্থনীতিতে একই সাথে স্বস্তি ও সতর্কবার্তার ছবি স্পষ্ট হচ্ছে। এক দিকে প্রবাসী আয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, রফতানিও কিছুটা ঘুরে দাঁড়াচ্ছে; অন্য দিকে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ওঠানামা, শেয়ারবাজারে পতন, রাজস্ব প্রবৃদ্ধির শ্লথতা এবং ব্যাংক খাতে খেলাপি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অর্থনীতির ভিতকে নড়বড়ে করে দিচ্ছে।

অর্থনীতির শরীরে একই সাথে ‘শক্তি’ ও ‘ঝুঁকি’- দু’টাই কাজ করছে। প্রশ্ন হলো, কোনটি শেষ পর্যন্ত জয়ী হবে?

রিজার্ভ : পুনরুদ্ধার হলেও স্থিতি নাজুক

বিপিএম৬ পদ্ধতিতে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ২০-২১ বিলিয়ন ডলারের ঘরে নেমে যাওয়ার পর আবার ৩০-৩৪ বিলিয়ন ডলারের স্তরে উঠেছে। তবে অর্থনীতিবিদদের মতে, এ বৃদ্ধির বড় অংশ স্বল্পমেয়াদি আমদানি স্থগিত, মুদ্রানীতি কড়াকড়ি ও কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রশাসনিক ব্যবস্থার ফল; টেকসই রফতানি-প্রবাহ বা দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগের কারণে নয়। বাজারভিত্তিক শক্ত ভিত্তি তৈরি না হলে এই রিজার্ভ আবার চাপে পড়তে পারে। অর্থাৎ- এটা ‘স্বস্তি’, কিন্তু ‘নিরাপত্তা’ নয়।

প্রবাসী আয়ের ঢেউ : অর্থনীতির লাইফলাইন

বিগত অর্থবছরে রেমিট্যান্স এসেছে ৩০.৩ বিলিয়ন ডলার-প্রায় ২৬.৮৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি। চলতি অর্থবছরের সাত মাসে এসেছে ১৯.৪ বিলিয়ন ডলার আর প্রবৃদ্ধি হয়েছে পৌনে ২২ শতাংশ। এই প্রবাহই এখন ডলারের বাজারে প্রধান জ্বালানি।

গ্রামের বাড়ি, শহরের ফ্ল্যাট, ছোট ব্যবসা, ভোগব্যয়- সবখানেই এই টাকার ছাপ। অনেক অর্থনীতিবিদ খোলাখুলিই বলছেন, ‘রেমিট্যান্স না থাকলে রিজার্ভ অনেক আগেই সঙ্কটে যেত।’

তবে প্রশ্ন থেকে যায়- শুধু রেমিট্যান্স দিয়ে কি শিল্পভিত্তিক প্রবৃদ্ধি সম্ভব?

আমদানি-রফতানি : ব্যবধানের চাপ

বিগত অর্থবছরে আমদানি (সিঅ্যান্ডএফ) হয়- ৬৮.৩৫ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ২.৪৪ শতাংশ) আর রফতানি (এফওবি) হয়- ৪৩.৯৬ বিলিয়ন ডলার (প্রবৃদ্ধি ৭.৭২ শতাংশ)। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে আমদানি ৫ শতাংশের কাছাকাছি বাড়লেও একই সময়ে রফতানি ১ শতাংশের মতো কমে গেছে। সে সাথে আমদানি রফতানির ব্যবধান বেড়েছে। এতে চলতি হিসেবে ঘাটতি আরো বেড়ে গেছে। শিল্প কাঁচামাল ও জ্বালানি আমদানি বেশি থাকায় বৈদেশিক লেনদেনে চাপ অব্যাহত।

পোশাক খাত ঘুরে দাঁড়ালেও শিল্প কাঁচামাল, জ্বালানি ও ভোগ্যপণ্যের আমদানি এখনো বেশি। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি বৃদ্ধি পাচ্ছে।

চট্টগ্রাম বন্দরে কনটেইনারের সারি যেমন বাড়ছে, তেমনি বৈদেশিক লেনদেনের ভারসাম্যও চ্যালেঞ্জে থাকছে।

শেয়ারবাজার : আস্থার সঙ্কট

দেশের শেয়ার বাজারের শুরুর সঙ্কেত ভালো নয়। চলতি অর্থবছরের ১৯ ফেব্রুয়ারি নাগাদ ঢাকা স্টক একচেঞ্জ সূচক কমেছে ২.৫৫ শতাংশ আর চট্টগ্রাম স্টক একচেঞ্জ এর সুচক কমেছে ৩.৮৮ শতাংশ। অথচ আগের বছর সূচক ১৩/১৪ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছিল।

এখন চলছে দুই বাজারেই টানা পতন। ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, নীতিগত অনিশ্চয়তা এবং করপোরেট মুনাফার নিম্নগতি বিনিয়োগকারীদের সতর্ক করে তুলছে।

স্টক এক্সচেঞ্জে এখন ‘অপেক্ষা’ই সবচেয়ে বড় ট্রেন্ড।

ব্যাংকিং খাত : লুকানো আগুন

সবচেয়ে উদ্বেগজনক চিত্র খেলাপি ঋণ। মোট ঋণের বিপরীতে শ্রেণিকৃত ঋণের হার ৩৫ শতাংশ ছাড়িয়ে গেছে- যা কার্যত ব্যাংকিং ব্যবস্থার জন্য অ্যালার্ম। এর ফলে ব্যাংকের তারল্য কমে যায়; নতুন ঋণ দেয়া কঠিন হয়; বিনিয়োগ কমে; অর্থনীতি ধীর হয়।

একজন সাবেক ব্যাংকারের ভাষায়, ‘এই হার দীর্ঘ দিন থাকলে ব্যাংকগুলো শুধু টিকে থাকার লড়াই করবে, উন্নয়ন অর্থায়ন করতে পারবে না।’

ঋণপ্রবাহ : সরকার বেশি, ব্যবসা কম

সরকারের নেট ঋণপ্রবাহ বেড়েছে প্রায় ৩২ শতাংশ; কিন্তু বেসরকারি খাতে মাত্র ৬ শতাংশ। একে অর্থনীতির ভাষায় বলে ‘ক্রাউডিং আউট’- সরকার ঋণ নিলে ব্যবসা কম পায়।

ফলে নতুন শিল্প, নতুন কারখানা, নতুন কর্মসংস্থান- সবকিছুই ধীর হয়ে যায়।

সুদহার ও অর্থ সরবরাহ : কড়াকড়ির যুগ

কলমানি রেট প্রায় ১০ শতাংশ। উচ্চ সুদহার মূল্যস্ফীতি কমাতে সাহায্য করলেও ব্যবসার জন্য ঋণ ব্যয়বহুল হয়ে উঠছে।

ব্যাপক অর্থ সরবরাহ প্রবৃদ্ধি সীমিত- মানে বাজারে অর্থপ্রবাহও নিয়ন্ত্রিত। এটি একধরনের ‘ব্রেক কশা অর্থনীতি’।

রাজস্ব : সরকারের আরেক মাথাব্যথা

এনবিআর রাজস্ব প্রায় ৩.৭ লাখ কোটি টাকা হলেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশ।

উচ্চ মূল্যস্ফীতির সময়ে এমন কম প্রবৃদ্ধি বাস্তবে রাজস্ব সক্ষমতার দুর্বলতা নির্দেশ করে। সরকারের উন্নয়ন ব্যয়, ভর্তুকি ও ঋণ পরিশোধে চাপ বাড়বে- এটা নিশ্চিত।

প্রবৃদ্ধির বাস্তবতা

জিডিপি প্রবৃদ্ধি এখন ৪ শতাংশের নিচে। যে অর্থনীতি একসময় ৭ শতাংশের ওপরে ছুটত- সেটি এখন হাঁটছে।

এই ধীরগতি যদি দীর্ঘমেয়াদি হয়, তবে মধ্যম আয়ের ফাঁদে আটকে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে।

অর্থনীতির ‘দুই গতি’

সবকিছু মিলিয়ে চিত্রটা যেন দুই রকম- ভালো দিক হলো : রেমিট্যান্স বাড়ছে; রফতানি বাড়ছে; রিজার্ভ কিছুটা স্থিতিশীল। আর খারাপ দিক : খেলাপি ঋণ বিস্ফোরণ; বিনিয়োগ কম; শেয়ারবাজার দুর্বল এবং রাজস্ব প্রবৃদ্ধি কম।

অর্থাৎ, বাইরে থেকে ডলার আসছে, ভেতরে উৎপাদনশীল শক্তি দুর্বল।

সামনে পথ

বিশেষজ্ঞদের মতে, এই মুহূর্তে তিনটি সংস্কার ছাড়া গতি ফেরানো কঠিন- ব্যাংকিং খাত সংস্কার : খেলাপি ঋণে কঠোর ব্যবস্থা; রফতানি বহুমুখীকরণ: পোশাকনির্ভরতা কমানো আর বিনিয়োগবান্ধব নীতি : সাশ্রয়ী সুদ ও নীতিগত স্থিতিশীলতা।

সার্বিকভাবে বাংলাদেশ অর্থনীতি এখন এক মোড়ে দাঁড়িয়ে। সংখ্যাগুলো বলছে- বাংলাদেশ অর্থনীতি এখনো ধসে পড়েনি, তবে ভারসাম্যের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। রেমিট্যান্স ও রফতানি তাকে টেনে রাখছে, আর ব্যাংকিং দুর্বলতা ও নিম্ন বিনিয়োগ নিচে নামাচ্ছে।

এই মুহূর্তে সঠিক নীতিগত সিদ্ধান্ত না নিলে ‘ধীরগতির ফাঁদে’ আটকে পড়ার ঝুঁকি উড়িয়ে দেয়া যায় না। অর্থাৎ, স্থিতিশীলতার জন্য এখনই কাঠামোগত সংস্কার- নয়তো পরের ধাক্কা সামলানো কঠিন হয়ে পড়বে।

রেমিট্যান্স তাকে বাঁচিয়ে রাখছে; কিন্তু ব্যাংকিং দুর্বলতা তাকে টেনে নামাচ্ছে। এখন সিদ্ধান্তের সময়- সংস্কার নাকি স্থবিরতা? কারণ সংখ্যা কখনো মিথ্যা বলে না; তারা শুধু সতর্ক করে।