কয়েক দিন আগের কথা। গ্রামের বাড়িতে হঠাৎ পড়ে গিয়ে আমার প্রায় শতবর্ষী মায়ের বাম হাতের উপাস্থি ভেঙে যায়। বুকের বাম দিকের তিনটি পাঁজরও ভেঙে যায়। বাম হাতের উপাস্থি ভেঙে দুই খণ্ড হয়ে দুই দিকে সরে গিয়ে নিদারুণ অবস্থার সৃষ্টি করে। তার এক্সরে এবং অন্যান্য পরীক্ষার রিপোর্ট ঢাকায় অর্থোপেডিক বিশেষজ্ঞের সাথে আলোচনার পর প্রাথমিক চিকিৎসা দেয়া হয় ঠাকুরগাঁওয়ে। ঢাকার বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের পরামর্শ ছিল আমার মাকে পুরোপুরি অজ্ঞান না করে স্থানিক (Local)) অবশকরণের মাধ্যমে ভাঙা হাড় যথাস্থানে বসিয়ে দেয়া যায় কিনা চেষ্টা করা যেতে পারে। তবে সফলতার সম্ভাবনা খুবই সীমিত। বয়স বেশি হওয়ায় অন্যান্য উপায় উপকরণ ব্যবহারের সুযোগ বলতে গেলে খুবই সীমিত। বয়স একটা বড় বাধা। আমি নিজেও চিকিৎসকদের মতের সাথে একমত ছিলাম। একজন হাড় বিশেষজ্ঞ আছেন যিনি এ ধরনের অপারেশন করেন। তার সাথে যোগাযোগ করার ব্যবস্থা করা হলো। তিনি আমাকে চেনেন, আমিও তাকে চিনি। একদিন পর রাত ১০টার দিকে তার সহকারী চিকিৎসক আমাকে টেলিফোনে জানালেন পরদিন সকাল ১০টায় যেন মাকে অপারেশনের জন্য তার হাসপাতালে ভর্তি করাই।
আমার শতবর্ষী মা একই সাথে শ্বাসকষ্ট এবং ডায়াবেটিসে ভোগছেন। দুর্ঘটনার আগেও তিনি খুব একটা চলাফেরা করতে পারতেন না। ফলে অপারেশনের ব্যাপারে উদ্বিগ্ন থাকায় আমি তার সহকারীকে আমার পরিচয় দিয়ে চিকিৎসক মহোদয়ের সাথে কথা বলতে চাইলাম। কিন্তু তার সহকারী জানালেন তিনি ব্যস্ততার কারণে কথা বলতে অপারগ। অপারেশন করতে চাইলে তার দেয়া সময় অনুসারে হাসপাতালে উপস্থিত থাকতে হবে। আমি নিজে একজন চিকিৎসক হিসেবে রোগীর প্রতি চিকিৎসকের দায় সম্পর্কে সম্পূর্ণ ওয়াকেবহাল। যেকোনো অপারেশনের আগে সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক রোগী দেখবেন, প্রয়োজনে পরীক্ষা নিরীক্ষার পরামর্শ দেবেন। আমার মায়ের মতো একজন শতবর্ষী ঝুঁকিসম্পন্ন রোগীর অভিভাবক বা আত্মীয় পরিজনের সাথে অপারেশন সম্পর্কে মতবিনিময় করবেন এটাই প্রত্যাশা। সংশ্লিষ্ট চিকিৎসক এ ব্যাপারগুলোকে কোনো গুরুত্ব না দিয়ে অপারেশনের পরামর্শ দিলেন তার সহকারীর মাধ্যমে।
আমি সম্মানিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক মহোদয়ের কাছে আমার মাকে আর নিয়ে যাইনি। তার ব্যবহারিক আচরণে আমি স্বাভাবিকভাবেই আস্থা রাখতে পারিনি। একজন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক হয়েও তিনি রোগী না দেখে, রোগী বা তার আত্মীয়স্বজনের সাথে আলোচনা না করেই একজন ঝুঁকিপূর্ণ রোগীর অপারেশনের সিদ্ধান্ত নেন এবং সময় নির্ধারণ করে দেন। অথচ চিকিৎসা ক্ষেত্রে একটি অলিখিত দায়বোধ ও নৈতিকতা রয়েছে। আমার মতো একজন চিকিৎসককে যদি এরকম বিড়ম্বনার শিকার হতে হয়, তাহলে সাধারণ মানুষের বিড়ম্বনা কতটুকু, সহজে অনুমেয়। এটা কি রোগীর সেবা নাকি নিরেট বাণিজ্য? এ ঘটনার উল্লেখ করলাম মাননীয় চিকিৎসক মহোদয়ের দক্ষতা বা সক্ষমতা অস্বীকার করার জন্য নয়; বরং চিকিৎসকের আচরণের কারণে তার ওপর রোগী বা তার স্বজনের আস্থা কিভাবে বিনষ্ট হতে পারে তা বোঝাতে।
আমাদের দেশে দক্ষতাসম্পন্ন অনেক চিকিৎসক থাকার পরও প্রতি বছর প্রচুর রোগী দেশের বাইরে যান চিকিৎসার জন্য- এ কথা অস্বীকারের উপায় নেই। এ কথাও সত্যি, দেশের অনেক চিকিৎসকের দক্ষতা ও সক্ষমতা বিশ্বমানের। যারা চিকিৎসার জন্য বিদেশে যান এবং যে চিকিৎসা পান-তা দেশেই বিদ্যমান। তবুও প্রতি বছর পাঁচ থেকে আট লাখ রোগী বিদেশে পাড়ি জমান। ব্যয় করেন পাঁচ শ’ কোটি ডলার। এটা বাংলাদেশ ব্যাংকের হিসাব। এর বাইরে অপ্রকাশ্য হুন্ডি মারফত নেয়া অর্থ তো আছেই। বার্ষিক সর্বোচ্চ ৩৬ বিলিয়ন মার্কিন ডলার রেমিট্যান্সের ছয় ভাগের এক ভাগ এভাবেই হারিয়ে যায় বিদেশে চিকিৎসার জন্য।
আমাদের ধারণা হাসপাতালের সংখ্যা, শয্যাসংখ্যা বা ডাক্তারের সংখ্যা বাড়ালেই জনগণের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করা যায়। ফলে দেশে বেড়েছে হাসপাতালের সংখ্যা, বেড়েছে শয্যাসংখ্যা, বেড়েছে চিকিৎসক সংখ্যাও। স্বাধীনতার প্রাক্কালে আট হাজার চিকিৎসকের জায়গায় এখন প্রায় দেড় লাখ চিকিৎসক নিয়োজিত রয়েছেন স্বাস্থ্যসেবায়। তারা সাধারণ চিকিৎসার পাশাপাশি বিশেষায়িত সেবাও দিচ্ছেন। তবুও চিকিৎসার জন্য বিদেশমুখী মানুষের মিছিল বাড়ছেই। এটা বিদেশী হাসপাতালগুলোর চটকদার বিজ্ঞাপন বা প্রচারের কারণে নয়। এটা হচ্ছে ওইসব হাসপাতালে পা রাখার সাথে সাথেই রোগী ও হাসপাতালের মধ্যে সম্পর্ক সৃষ্টির গভীরতায়। রোগী বা রোগীর আত্মীস্বজনের অভিজ্ঞতা এবং সামগ্রিক সেবার ব্যবস্থাপনা এখানে নিয়ামক হিসেবে কাজ করে। রোগী দেখা থেকে শুরু করে পরীক্ষা নিরীক্ষা চিকিৎসক ও তার সহকারীদের আচরণ ও এ সেবায় জড়িত সবার আন্তরিকতা অতি সহজেই রোগীর মনে আস্থা জন্মায়। যার অভাব বাংলাদেশে পদে পদে রোগীরা অনুভব করেন। রোগী এবং রোগীর স্বজনরা এমন চিকিৎসকের প্রত্যাশা করেন, যিনি মনোযোগ দিয়ে রোগীর কথা শুনবেন, সহজ ভাষায় রোগ সম্পর্কে রোগী বা স্বজনদের অবহিত করবেন, ধৈর্যসহকারে তাদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেবেন এবং চিকিৎসার সিদ্ধান্তের ব্যাপারে রোগী বা স্বজনদের অংশীদার করবেন। নিজে এককভাবে চিকিৎসাসংক্রান্ত সিদ্ধান্ত রোগীর ওপর চাপিয়ে দেবেন না। মোট কথা চিকিৎসক ও রোগীর মধ্যে যে আস্থার সেতুবন্ধ তৈরি হওয়ার কথা তা তৈরি হয় না। এটা দৃশ্যমান নয়, শুধু অনুভবের। এই আস্থার অভাবই দেশের লাখ লাখ রোগীকে প্রতি বছর বিদেশে যেতে বাধ্য করে। চিকিৎসাব্যবস্থার সামগ্রিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতাও রোগীদের বিদেশে চিকিৎসা নেয়ার অন্যতম অনুঘটক। এদেশের চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর জনগণের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্য মেডিক্যাল ও ডেন্টাল কাউন্সিল ও সরকারি নীতিমালার আলোকে কর্মযোগ-তৈরির পদক্ষেপ অত্যন্ত জরুরি। নতুবা প্রতি বছর চিকিৎসার জন্য বহির্মুখী রোগীর ঢল বাড়তেই থাকবে। চিকিৎসকরা এই প্রচেষ্টার কেন্দ্রবিন্দুতে নিয়ামক হিসেবে ভূমিকা পালন করবেন। সবার সমন্বিত চেষ্টায় এ দেশের চিকিৎসা ও চিকিৎসাসেবার প্রতি জনগণের আস্থা সৃষ্টি করা ছাড়া রোগীদের বিদেশ যাওয়ার প্রবণতা থামবে না।
লেখক : চক্ষুরোগ বিশেষজ্ঞ