নির্বাচনের উচ্ছ্বাসের পরই মুনাফা তুলতে ঝোঁক পুঁজিবাজারে সূচক পতন, কমেছে লেনদেন
Printed Edition
নিজস্ব প্রতিবেদক
টানা উত্থানের ধারায় থাকা দেশের পুঁজিবাজারে একদিনের ব্যবধানে ভাটা পড়েছে। নির্বাচনের পরদিন বড় উল্লম্ফনের পর সপ্তাহের দ্বিতীয় কার্যদিবসে সূচকের পতনের মধ্য দিয়ে লেনদেন শেষ হয়েছে। একই সাথে আগের দিনের তুলনায় টাকার অঙ্কে লেনদেনও কিছুটা কমেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নির্বাচনে নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি) সরকার গঠন করতে যাচ্ছে এমন প্রত্যাশায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ইতিবাচক মনোভাব তৈরি হয়েছিল। দীর্ঘ রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা কাটিয়ে নতুন সরকারের অধীনে বাজারে স্থিতিশীলতা ও নীতিগত সহায়তা বাড়বে এমন আশায় রোববার বড় উত্থান দেখা যায়। তবে গতকাল অনেক বিনিয়োগকারী আগের দিন কেনা শেয়ার থেকে মুনাফা তুলে নেয়ায় সূচকে সংশোধন দেখা দিয়েছে।
দিনের শুরুতে দেশের প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জ (ডিএসই) ও চট্টগ্রাম স্টক এক্সচেঞ্জে (সিএসই) সূচকের ঊর্ধ্বমুখী প্রবণতা লক্ষ করা যায়। লেনদেন শুরুর প্রথম ১০ মিনিটে ডিএসইএক্স সূচক ৪০ পয়েন্টের বেশি বাড়লেও সকাল ১০টা ২০ মিনিটের পর থেকে ধীরে ধীরে পতনমুখী হয় বাজার। শেষ পর্যন্ত দিনজুড়ে সেই নি¤œমুখী ধারা অব্যাহত থাকে।
ডিএসইর তথ্যে দেখা যায়, দিন শেষে প্রধান সূচক ডিএসইএক্স আগের দিনের চেয়ে ১১ দশমিক ০৯ পয়েন্ট কমে পাঁচ হাজার ৫৮৯ পয়েন্টে নেমে এসেছে। ডিএসই শরিয়াহ সূচক কমেছে ৮ দশমিক ৬২ পয়েন্ট, অবস্থান করছে এক হাজার ১১৮ পয়েন্টে। ডিএস৩০ সূচক ৯ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট হারিয়ে দাঁড়িয়েছে দুই হাজার ১৩৫ পয়েন্টে।
গতকাল ডিএসইতে মোট ৩৯৭টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে দর বেড়েছে ১৫৩টির, কমেছে ২১৮টির এবং অপরিবর্তিত রয়েছে ২৬টির। এদিন ডিএসইতে মোট লেনদেন হয়েছে এক হাজার ২৫৭ কোটি তিন লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট, যা আগের কার্যদিবসে ছিল এক হাজার ২৭৫ কোটি ৯ লাখ টাকা। অর্থাৎ একদিনের ব্যবধানে লেনদেন কমেছে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
অন্যদিকে সিএসইতে সিএসসিএক্স সূচক ১৪ দশমিক ৩০ পয়েন্ট কমে ৯ হাজার ৫৪০ পয়েন্টে নেমে এসেছে। তবে সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৭ দশমিক ৫৭ পয়েন্ট বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৫ হাজার ৫২৬ পয়েন্টে। সিএসই শরিয়াহ সূচক ৫ দশমিক ৫৮ পয়েন্ট কমে ৯৩২ পয়েন্টে এবং সিএসই-৩০ সূচক ৫০ দশমিক ৩৫ পয়েন্ট কমে ১৪ হাজার ১৩ পয়েন্টে অবস্থান করছে।
সিএসইতে মোট ২২৮টি কোম্পানির শেয়ার ও ইউনিট লেনদেন হয়েছে। এর মধ্যে ১১৬টির দর বেড়েছে, ৯০টির কমেছে এবং ২২টির অপরিবর্তিত রয়েছে। এদিন সিএসইতে লেনদেন হয়েছে ১৩ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার ও ইউনিট, যা আগের কার্যদিবসে ছিল ২৪ কোটি ৬৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ লেনদেন অর্ধেকেরও বেশি কমেছে।
উল্লেখ্য, রোববার ডিএসইর প্রধান সূচক ২০০ দশমিক ৭২ পয়েন্ট বেড়ে পাঁচ হাজার ৬০০ পয়েন্টে উঠে আসে, যা দেড় বছরের মধ্যে একদিনে সর্বোচ্চ উত্থান। একই দিন সিএসইর সার্বিক সূচক সিএএসপিআই ৪৮৪ দশমিক ৩৭ পয়েন্ট বেড়ে ১৫ হাজার ৫১৮ পয়েন্টে পৌঁছায়। নির্বাচনের ফল ঘোষণার পর বিনিয়োগকারীদের অতিরিক্ত উৎসাহে বাজারে বড় উত্থান হয়েছিল বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
তবে সাম্প্রতিক ইতিবাচক ধারার মধ্যেই নির্দিষ্ট কিছু শেয়ারে রেকর্ড লেনদেন হয়েছে। ডিএসইতে তালিকাভুক্ত চার প্রতিষ্ঠানের শেয়ারে গত দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ টাকার লেনদেন হয়েছে। এগুলো হলো ঢাকা ব্যাংক, আইএফআইসি ব্যাংক, শাহজীবাজার পাওয়ার এবং ন্যাশনাল ব্যাংক।
এর মধ্যে ঢাকা ব্যাংকের দুই কোটি ৭৩ লাখের বেশি শেয়ার লেনদেন হয়ে মোট টাকার অঙ্ক দাঁড়ায় ৪১ কোটি ১৬ লাখ টাকার বেশি, যা দুই বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। আইএফআইসি ব্যাংকের লেনদেনও ২৫ কোটি টাকার বেশি হয়েছে। শাহজীবাজার পাওয়ার ও ন্যাশনাল ব্যাংকের ক্ষেত্রেও একই ধরনের রেকর্ড লেনদেন লক্ষ করা গেছে। এসব শেয়ারের দর উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে, যা বাজারে খাতভিত্তিক আগ্রহের ইঙ্গিত দিচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, নির্বাচনের পর ইতিবাচক প্রত্যাশা থাকলেও স্বল্পমেয়াদে বাজারে অস্থিরতা থাকতে পারে। বড় উত্থানের পর স্বাভাবিকভাবেই কিছু বিনিয়োগকারী মুনাফা তুলে নেন, যা সূচকে চাপ সৃষ্টি করে। তবে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকলে বাজারে ধীরে ধীরে স্থিতিশীল প্রবণতা ফিরে আসতে পারে।
সব মিলিয়ে নির্বাচনী উচ্ছ্বাসে উড়তে থাকা পুঁজিবাজার একদিনের মধ্যেই সংশোধনের মুখে পড়লেও লেনদেনের পরিমাণ ও নির্দিষ্ট খাতে বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ ইঙ্গিত দিচ্ছে বাজার এখনো প্রত্যাশা ও সতর্কতার মধ্যবর্তী এক অবস্থানে রয়েছে।