৯০০ লাইটার জাহাজের ৬৮৭টিই আটকা ৭ দিনেও বরাদ্দ নেই লাইটার জাহাজের
চট্টগ্রাম বন্দরে প্রায় ১০০ মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাস বিঘিœত : ভোক্তাদের গুনতে হবে বাড়তি পণ্যমূল্য
Printed Edition
নূরুল মোস্তফা কাজী চট্টগ্রাম ব্যুরো
চট্টগ্রাম বন্দর থেকে দেশের নানা গন্তব্যে মালামাল বহনকারী ৯০০ লাইটারেজ জাহাজের মধ্যে ৬৮৭টি জাহাজই বিভিন্ন ঘাটে আটকা। আবার কেউ কেউ অভিযোগ করেন, এসব জাহাজকে ভাসমান গুদাম হিসেবে ব্যবহার করছেন কোনো কোনো অসাধু আমদানিকারক। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন লাইটারেজ জাহাজ সঙ্কটে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরে খাদ্যশস্যসহ বিভিন্ন পণ্যবাহী মাদার ভেসেল থেকে খালাস প্রায় বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বিভিন্ন শিল্পগ্রুপ আসন্ন রমজান সামনে রেখে বিপুল পণ্য আমদানি করলেও তা খালাস করা কার্যত কঠিন পরিস্থিতিতে পড়েছে। এর মধ্যে আবার বৃহৎ আমদানিকারকদের মাঝে যে কয়টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেয়া হয়েছে সেখানে অনিয়ম করে পক্ষপাতিত্বেরও অভিযোগ উঠেছে। সাত দিনে একটি লাইটারও বরাদ্দ না পাওয়ার তথ্য মিলেছে। এ অবস্থা দীর্ঘায়িত হতে পারে এমন আভাসও মিলেছে। লাইটারেজ জাহাজের সঙ্কটে একদিকে দেশের সাপ্লাই চেইন যেমনি ব্যাহত হচ্ছে, তেমনি আমদানিকারকদের গুনতে হচ্ছে বিপুল আর্থিক ক্ষতি, যা মূলত বহন করতে হবে ভোক্তাদেরই পণ্য মূল্যের বাড়তি দাম হিসেবে।
গভীরতার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের জেটিতে ভিড়তে পারে না বিভিন্ন খাদ্যশস্য ও সারসহ শিল্পের কাঁচামালবাহী বড় জাহাজগুলো (মাদার ভেসেল)। প্রায় ৭০ শতাংশ সাধারণ পণ্যবাহী বড় জাহাজ বহির্নোঙর থেকে ছোট জাহাজের (লাইটার জাহাজ) মাধ্যমে পণ্য খালাস করে।
চট্টগ্রাম বন্দরের তথ্য অনুযায়ী গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম বহির্নোঙরে ১১৫টি সমুদ্রগামী জাহাজ (মাদার ভেসেল) ছিল। এর মধ্যে সাধারণ পণ্যবাহী জাহাজ ছিল ৪৯টি, খাদ্যশস্য বোঝাই ছিল ১৬টি, সার বোঝাই ছয়টি, চিনি বোঝাই পাঁচটি, সিমেন্ট ক্লিংকার বোঝাই ২৫টি এবং তেলবাহী ১৩টি ট্যাংকার জাহাজ ছিল। বন্দরের তথ্য অনুযায়ী এসব জাহাজের মধ্যে ৭৫টি জাহাজে কাজ হলেও ৪০টি জাহাজে কোনো কাজ হয়নি।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বন্দর কর্তৃপক্ষ জাহাজে কাজ হওয়ার(লোডিং/আনলোডিং) কথা বললেও একেকটি মাদার ভেসেলের বিপরীতে একটি করে মঙ্গলবার ৪৯টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দিয়েছে ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল। ফলে অর্ধেক মাদার ভেসেলকে লাইটার বরাদ্দই দেয়া যায়নি।
বৃহৎ শিল্পগ্রুপগুলোর বেশির ভাগেরই নিজস্ব লাইটার জাহাজ থাকলেও তা একেবারেই সীমিত। ফলে তারা মাদার ভেসেল থেকে পণ্য খালাসে বাণিজ্যিক লাইটারেজ জাহাজের ওপরও নির্ভরশীল। ওয়াটার ট্রান্সপোর্ট সেল (ডব্লিউটিসি) থেকে এসব লাইটার জাহাজ বুকিং দেয়া হয়। দৈনিক ৮০টির মতো লাইটারেজ বরাদ্দ দেয়া হলেও চলতি সপ্তাহের শুরুর তিন দিন সেল থেকে কোনো জাহাজই বরাদ্দ দেয়া হয়নি। ফলে মাদারভেসেল থেকে পণ্য খালাস একেবারেই বন্ধ হয়ে পড়ে। গত মঙ্গলবার ৫৯টি লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়া হয়। গতকাল বুধবারও ৫০টির মতো লাইটারেজ জাহাজ বরাদ্দ দেয়া হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
শিপিং সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এক দিকে ঘন কুয়াশা, অন্য দিকে চট্টগ্রাম থেকে পণ্য বোঝাই করে নিয়ে দেশের নানা ঘাটে তা খালাস করে আবার ফিরে আসতে ২০ দিন পর্যন্ত লেগে যায় একেকটি লাইটারেজ জাহাজকে। সংশ্লিষ্টদের মতে, চট্টগ্রাম এবং ঢাকার কয়েকটি স্থান ছাড়া দ্রুত পণ্য খালাসের উপযোগী ঘাট বা জেটি নাই বললেই চলে। বেশির ভাগ স্থানে এখনো সনাতন পদ্ধতিতে লেবার দিয়েই পণ্য খালাস করা হয়। ফলে একেকটি লাইটার জাহাজ খালি করতেই চার দিন লেগে যায়।
এ দিকে লাইটার জাহাজ বরাদ্দে বৈষম্যেরও অভিযোগ উঠেছে। বেছে বেছে কিছু শিল্প গ্রুপের জন্য লাইটার জাহাজ বদুদ্দ দেয়া হলেও আবুল খায়ের, আকিজ গ্রুপের মতো বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মালামাল খালাসে লাইটার বরাদ্দ না দেয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে বাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়ে ভোক্তাদের অতিরিক্ত দামে পণ্য কিনতে বাধ্য হওয়ার ঝুঁকি সৃষ্টি হচ্ছে বলেও সূত্র জানায়।
আকিজ শিপিংয়ের জেনারেল ম্যানেজার মিজানুর রহমান জানিয়েছেন, গত সাত দিন যাবৎ তাদের গ্রুপের পাঁচটি জাহাজ বহির্নোঙরে অলস বসে আছে। এর মধ্যে প্রায় ৪৯ হাজার মে:টন ছোলা বোঝাই দুইটি এবং অপর তিনটি জাহাজ টিএসপি ও এমওপি সার বোঝাই বলে তিনি জানান। সাত দিনে একটি লাইটারও বরাদ্দ পাননি জানিয়ে তিনি বলেন, প্রতিটি জাহাজকে দৈনিক ২০ হাজার ডলারের বেশি ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে। গত মঙ্গলবার কয়েকটি শিল্প গ্রুপের মাদারভেসেলের বিপরীতে লাইটার বরাদ্দ দেয়া হলেও তারা পাননি বলে তিনি জানান।
বাংলাদেশ শিপিং এজেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের সাবেক পরিচালক খায়রুল আলম সুজন নয়া দিগন্তকে বলেন, আগে যেখানে একটা জাহাজ ১২-১৩ দিনে খালি হতো সেখানে এখন একটা জাহাজ থেকে পণ্য খালাসে প্রায় ২১ থেকে ৩০ দিন পর্যন্ত লাগছে। সে হিসাবে একেকটি জাহাজকে দুই লাখ ডলার পর্যন্ত ডেমারেজ গুনতে হচ্ছে।
ইনল্যান্ড ভেসেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন চট্টগ্রামের (আইভোয়াক) সহসভাপতি পারভেজ আহমেদ নয়া দিগন্তকে বলেন, লাইটারেজ জাহাজের সঙ্কট ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। ১০০-এর কাছাকাছি পণ্যবাহী মাদারভেসেল বহির্নোঙরে অপেক্ষমাণ রয়েছে পণ্যখালাসের জন্য। কিন্তু লাইটার জাহাজ মিলছে না। মঙ্গলবার কোনো রকমে ৫৯টি লাইটার জাহাজ বরাদ্দ দেয়া গেছে। বাকি জাহাজগুলো অলস বসে আছে। ইতোমধ্যে যেসব লাইটারে মাল বোঝাই করা হয়েছে তা দ্রুত খালি না করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে না জানিয়ে তিনি বলেন, ৬৮৭টি লাইটার জাহাজ পণ্য নিয়ে আটকা পড়েছে। তিনি জানান, আমাদের লাইটার জাহাজের ডিমান্ড এবং সাপ্লাইয়ে বড় একটা গেপ সৃষ্টি হয়েছে। দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘাটগুলোর অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা গেলে এর একটা স্থায়ী সমাধান আসবে জানিয়ে তিনি বলেন, সরকারিভাবে সাইলো বা জেটি আকারে পণ্য খালাসের ব্যবস্থা করা গেলে জাহাজগুলো দ্রুত পণ্য খালাস করে আবার নতুন পণ্য বোঝাই করতে পারবে।