ভারতে খ্রিষ্টানরা নির্যাতনের শিকার

হামলায় জড়িত বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস

Printed Edition
back-5
ভারতের পশ্চিমবঙ্গে খ্রিষ্টানদের ওপর হামলার প্রতিবাদে বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের মানববন্ধন : নয়া দিগন্ত

নিজস্ব প্রতিবেদক

ভারতে খ্রিষ্টানরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ২০২৪ সালে ৮৩০টি হামলা এবং ২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে নভেম্বর পর্যন্ত ১১ মাসে খ্রিষ্টান সম্প্রদায় ও চার্চের ওপর ৭০৬টি হামলার ঘটনা নথিভুক্ত হয়েছে। এ ছাড়া চলতি বছরেও বিভিন্ন স্থানে হামলা-নির্যাতন অব্যাহত রয়েছে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস এসব হামলায় জড়িত।

গতকাল জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে এক মানববন্ধনে বাংলাদেশ খ্রিষ্টান অ্যাসোসিয়েশনের (বিএসএ) নেতারা এ অভিযোগ করেন। বক্তারা ভারতের ইউনাইটেড খ্রিষ্টান ফোরামের তথ্য তুলে ধরে বলেন, ভারতে প্রতিনিয়ত সংখ্যালঘু খ্রিষ্টানরা অত্যাচার-নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। গত বছর এবং চলতি বছরের কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরে তারা বলেন, ২০২৫ সালের ২০-২৫ ডিসেম্বর বড় দিনের উৎসব চলাকালে ভারতজুড়ে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ ও প্রার্থনা সভায় বাধা দেয়ার ঘটনা ঘটে। হিন্দুত্ববাদী সংগঠন বজরং দল, বিশ্ব হিন্দু পরিষদ ও আরএসএস এসব ঘটনায় জড়িত ছিল। গোরখপুর এলাকায় ২০ ও ২২ ডিসেম্বর প্রার্থনা সভায় হামলা করা হয়। সেখানে এক দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী নারীকে শিশুদের সামনে গালাগাল ও শারীরিক হেনস্তা করা হয়। বিজেপি নেত্রী অঞ্জু ফরগবী এ ঘটনার সাথে জড়িত ছিলেন। শান্তিনগরে কাথলিক প্রার্থনা সভায় ঢুকে ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলা হয়। ক্যাথলিক বিশপস কনফারেন্স একে সংবিধানের ওপর আঘাত হিসেবে অভিহিত করেছে।

২৪ ডিসেম্বর আসামের নলবাড়ি সেন্ট মেরি ইংলিশ স্কুলে বজরং দল ঢুকে ক্রিসমাস ট্রি ও সাজসজ্জা পুড়িয়ে দেয়। রাস্তায় সান্তা ক্লজ সেজে থাকা ব্যক্তি ও ক্রিসমাসের জিনিস বিক্রেতাদের ওপরও হামলা হয়। ছত্তিশগড়ের রায়পুরাতে ম্যাগনেটো মলে বজরং দলের সদস্যরা হামলা চালায়। এ ছাড়া ২৪ ডিসেম্বর খ্রিষ্টানদের বিরুদ্ধে হরতালের ডাক দিয়ে ঘৃণামূলক পোস্টার ছড়ানো হয়। কেরালা পালাক্কড়ে আরএসএস সদস্যরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে ক্যারল গাওয়া বন্ধ করে দেয়। উত্তরাখন্ড, হরিদ্বার রাজ্য পর্যটন দফতরের হোটেলে বড়দিনের অনুষ্ঠান বন্ধ করে দেয়া হয়।

চলতি ২০২৬ সালের উল্লেখযোগ্য ঘটনার মধ্যে রয়েছে- গত ১৩ মে মণিপুরে সশস্ত্র হামলায় তিনজন কুকি চার্চ নেতা নিহত হন। ‘জেলিয়াংরং ইউনাইটেড ফ্রন্ট’ জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। হামলাটি এমন সময় হয় যখন চার্চ নেতারা সম্প্রীতি ফেরাতে আলোচনা করছিলেন। নাগাল্যান্ডের মুখ্যমন্ত্রী নিন্দা জানান।

মহারাষ্ট্র, গড়চিরোণিতে গত ১১-১২ জানুয়ারি মিদাপলি গ্রামে ৬টি খ্রিষ্টান পরিবারকে ‘খ্রিষ্ট ত্যাগ করো নয়তো ঘর হারাও’ বলে আলটিমেটাম দেয়া হয়। তা প্রত্যাখ্যান করায় ৪টি পরিবারের বাড়ি ভেঙে দেয়া হয়। শীতে তারা গৃহহীন হয়ে পড়ে, পুলিশও সাহায্য করেনি বলে অভিযোগ রয়েছে। পশ্চিমবঙ্গের সুভাস গ্রাম গত ৩ জুলাই নির্মাণাধীন একটি চার্চে হিন্দুত্ববাদী মব ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দিয়ে ক্রস ভেঙে ফেলে। গুজরাট ইস্টার সানডেতে দুই ডজনের বেশি সশস্ত্র লোক চার্চে ঢুকে ‘জয় শ্রী রাম’ স্লোগান দেয়, জোরপূর্বক ধর্মান্তরের অভিযোগ তোলে। পুলিশ মব’ সরালেও কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। পরে বাড়িওয়ালাকে হুমকি দেয়ায় চার্চ কর্তৃপক্ষ ১২ বছরের ভাড়া বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়।

মানববন্ধনে বক্তারা বলেন, ২০২৪ সালে ৮৩০টি হামলা হয়েছিল, যা গত এক দশকের সর্বোচ্চ। ২০২৫ সালে মাত্র ৩৯টিতে পুলিশ মামলা করে। সবচেয়ে বেশি আক্রান্ত রাজ্যের মধ্যে উত্তর প্রদেশ ১৮৪টি, ছত্তিশগড় ১৫৭টি। এ ছাড়া রাজস্থান, পাঞ্জাব, হরিয়ানায় অনেক হামলার ঘটনা ঘটেছে। বক্তারা অভিযোগ করেন, সরকার হামলাকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয় না। উল্টো সরকারি আদেশে উত্তর প্রদেশ ও কেরালায় ২৫ ডিসেম্বর বড়দিনে স্কুল খোলা রেখে বাজপেয়ির জন্মশতবার্ষিকী পালন বাধ্যতামূলক করা হয়।