জনসমর্থন বাড়াতে আগাম নির্বাচনের পথে জাপানের প্রধানমন্ত্রী

Printed Edition
onno-2
সানায়ে তাকাইচি

আসাহি শিম্বুন ও এএফপি

জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচি বলেছেন তিনি আগামি ৮ ফেব্রুয়ারি আগাম নির্ভাচনের লক্ষ্যে ২৩ জানুয়ারি পার্লামেন্টের নিম্ন পরিষদ ভেঙে দেবেন। গতকাল সোমবার তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে পার্লামেন্ট ভেঙে দেয়ার এই ঘোষণা দিয়েছেন। তার ঘোষণা অনুয়ায়ী আগামী ২৭ জানুয়ারি থেকে নির্ভাচনের প্রচারাভিযান আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হবে।

টোকিও থেকে এএফপি জানায়, দেশটির প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী তাকাইচি জনমত জরিপে নিজের জনপ্রিয়তার ওপর আস্থা রাখছেন। এর মাধ্যমে তিনি অজনপ্রিয় শাসক দল লিবারেল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিকে (এলডিপি) বিজয়ের পথে এগিয়ে নিতে চান। গত সপ্তাহে দলীয় কর্মকর্তাদের কাছে নিজের অভিপ্রায় জানানোর পর গতকাল সোমবার এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি ভোটের পরিকল্পনা তুলে ধরেন। দশকের পর দশক ধরে প্রায় নিরবচ্ছিন্নভাবে জাপান শাসন করে আসছে এলডিপি, যদিও দলটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তন হয়েছে ঘন ঘন।

গত অক্টোবরে প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব নেয়া তাকাইচির মন্ত্রিসভা জনমত জরিপে ভালো অবস্থানে রয়েছে, যদিও তার দলের জনপ্রিয়তা তুলনামূলকভাবে কম। তবে তার শাসক জোট যার মধ্যে জোটসঙ্গী জাপান ইনোভেশন পার্টি (জেআইপি) রয়েছে। পার্লামেন্টের ক্ষমতাধর নিম্নকক্ষে কেবল সামান্য সংখ্যাগরিষ্ঠতা ধরে রেখেছে।

এ অবস্থায় ‘প্রোঅ্যাকটিভ’ রাজস্ব ব্যয় বৃদ্ধি ও প্রতিরক্ষা বাজেট বাড়ানোর মতো নীতিগত কর্মসূচি পাসে বাধা সৃষ্টি হতে পারে। টোকিও বিশ্ববিদ্যালয়ের এমেরিটাস অধ্যাপক সাদাফুমি কাওয়াতো বলেন, ‘যদি এলডিপি এককভাবে নিম্নকক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পায়, তাহলে অন্য দলগুলোর কাছে ছাড় না দিয়েই তিনি নিজের নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবেন।’ তাকাইচির মন্ত্রিসভা এপ্রিল ২০২৬ থেকে শুরু হতে যাওয়া অর্থবছরের জন্য রেকর্ড ১২২ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ইয়েনের (প্রায় ৭৬৮ বিলিয়ন ডলার) বাজেট অনুমোদন করেছে। মূল্যস্ফীতি মোকাবেলা এবং বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম অর্থনীতিকে চাঙ্গা করতে তিনি যত দ্রুত সম্ভব পার্লামেন্টের অনুমোদন নিতে চান বলে প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।

তবে বিরোধী দলগুলো বলছে, নিম্নকক্ষ ভেঙে দেয়ার পরিকল্পনা বাজেট পাসে বিলম্ব ঘটাতে পারে। প্রধান বিরোধী দল কনস্টিটিউশনাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টি অব জাপানের (সিডিপি) জুন আজুমি বলেন, এতে ‘মানুষের জীবিকা বিসর্জন দেয়া হবে’। ৬৪ বছর বয়সী বাইসাইকেল পার্কিং ব্যবস্থাপক মাসাআকি টোকুনো এএফপিকে বলেন, ‘নির্বাচনের আগে মূল্যস্ফীতি মোকাবেলার নীতিই সবচেয়ে জরুরি হওয়া উচিত।’ খবরে বলা হয়েছে, নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধির চাপ কমাতে খাদ্যপণ্যের ওপর কর কমানোর বিষয়টি নির্বাচনী ইশতেহারে অন্তর্ভুক্ত করার কথা ভাবছে এলডিপি। বিশ্লেষকদের মতে, আগাম নির্বাচন তাকাইচিকে চীনের সাথে চলমান অচলাবস্থা ভাঙতেও সহায়তা করতে পারে। ঘরোয়া সমর্থন দৃঢ়ভাবে প্রদর্শন করতে পারলে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে তার দরকষাকষির ক্ষমতা বাড়বে। গত নভেম্বরে তাকাইচি মন্তব্য করেছিলেন, চীন যদি কখনো স্বশাসিত তাইওয়ানে হামলা চালায়, তবে জাপান সামরিকভাবে হস্তক্ষেপ করতে পারে। এরপর থেকেই টোকিও-বেইজিং সম্পর্কের অবনতি ঘটে।

তবে ন্যাশনাল গ্র্যাজুয়েট ইনস্টিটিউট ফর পলিসি স্টাডিজের ডিন মিকিতাকা মাসুয়ামা সতর্ক করে বলেন, তাকাইচি জিতলে চীন তার ওপর আরো চাপ বাড়াতে পারে। তার মতে, বেইজিং হয়তো ভোটারদের কাছে এই বার্তা দিতে চাইবে যে, কট্টর অবস্থান নেয়া নেতাকে সমর্থন করলে ‘কষ্টের’ মুখে পড়তে হতে পারে যার প্রকাশ ঘটতে পারে বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ বা অন্য উপায়ে। চীন সম্প্রতি জাপানে সম্ভাব্য সামরিক ব্যবহারের উপযোগী ‘দ্বৈত-ব্যবহারযোগ্য’ পণ্যের রফতানিতে ব্যাপক নিষেধাজ্ঞা ঘোষণা করেছে। এ ছাড়া বৈদ্যুতিক গাড়ি থেকে শুরু করে ক্ষেপণাস্ত্র তৈরিতে ব্যবহৃত গুরুত্বপূর্ণ বিরল ধাতুর রফতানিও সীমিত করছে বলে জানা গেছে। আসাহি পত্রিকার এক জরিপে দেখা গেছে, উত্তরদাতাদের ৬০ শতাংশই জাপান-চীন সম্পর্কের অবনতির অর্থনৈতিক প্রভাব নিয়ে উদ্বিগ্ন।

তাকাইচির পূর্বসূরি শিগেরু ইশিবার সময়ে এলডিপি ও তাদের দীর্ঘ দিনের জোটসঙ্গী কোমেইতো সর্বশেষ দু’টি জাতীয় নির্বাচনে সংসদের উভয়কক্ষে সংখ্যাগরিষ্ঠতা হারায় সবচেয়ে সাম্প্রতিক ছিল জুলাইয়ের উচ্চকক্ষ নির্বাচন। ওই নির্বাচনের পর ইশিবা পদত্যাগ করেন। এ সময় জনসমর্থন পায় কয়েকটি ছোট দল, যার মধ্যে রয়েছে জনতাবাদী সানসেইতো। দলটি অভিবাসনকে ‘নীরব আগ্রাসন’ বলে অভিহিত করে যদিও জাপানে বিদেশে জন্ম নেয়া বাসিন্দার হার মাত্র ৩ শতাংশ। কোমেইতো ও প্রধান বিরোধী দল সিডিপি তাকাইচির বিরুদ্ধে একজোট হয়ে নির্বাচনে লড়ার বিষয়ে একমত হয়েছে। তারা আশা করছে, এই জোট ভাসমান ভোটারদের আকৃষ্ট করতে পারবে।