দেশজুড়ে হামের ভয়াবহ প্রকোপ

২৪ ঘণ্টায় আরো ১১ শিশুর মৃত্যু আক্রান্ত ১,৪০০ ছুঁইছুঁই

Printed Edition

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

দেশে হামের প্রাদুর্ভাব ক্রমেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। ২৪ ঘণ্টায় রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে আরো ১১ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে স্বাস্থ্য অধিদফতরের তথ্যানুযায়ী নিশ্চিত হামে একজন এবং ‘সন্দেহজনক হাম’ নিয়ে ১০ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। মৃতদের মধ্যে ৯ জনই ঢাকা বিভাগের। আর অন্য দু’জনের মৃত্যু হয়েছে রাজশাহী ও সিলেট বিভাগে।

এ নিয়ে গত ২৩ দিনে সরকারি হিসাবে মোট মৃতের সংখ্যা ১৪৯ জনে দাঁড়িয়েছে (হামে ২১ ও সন্দেহজনক হামে ১২৮)। পরিস্থিতি সামাল দিতে হাসপাতালগুলোতে বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড চালু করা হলেও শয্যাসঙ্কটে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখে চিকিৎসা দিতে হচ্ছে।

স্বাস্থ্য অধিদফতরের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় সন্দেহজনক হাম নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৬৪১টি শিশু এবং নতুন করে হাম শনাক্ত হয়েছে ২২৪ জনের। বর্তমানে দেশে মোট নিশ্চিত হাম আক্রান্তের সংখ্যা এক হাজার ৩৯৮ এবং সন্দেহজনক উপসর্গ নিয়ে ভর্তির সংখ্যা ছয় হাজার ৮৮৩।

গত ২৪ ঘণ্টায় সর্বোচ্চ ২৫৬ জন রোগী ভর্তি হয়েছে ঢাকা বিভাগে। এরপরই রয়েছে চট্টগ্রাম (১২৫), রাজশাহী (৯২) ও খুলনা (৬৫)। তবে আশার কথা হলো, একই সময়ে সুস্থ হয়ে হাসপাতাল ছেড়েছে ৫৮৫ জন শিশু।

এ দিকে রাজশাহী ব্যুরো ও হাসপাতাল সূত্রে জানা গেছে, রাজশাহীতে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে আরো তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে রাজশাহী মেডিক্যাল কলেজ (রামেক) হাসপাতালে একজন এবং বেসরকারি রয়েল হাসপাতালে দু’জন শিশু মারা যায়। রামেক হাসপাতালের মুখপাত্র ডা: শংকর কে বিশ্বাস জানান, বর্তমানে সেখানে ১২৩ জন শিশু চিকিৎসাধীন। সংক্রমণরোধে রামেক হাসপাতালে ১৮টি আইসিইউ ও একটি বিশেষ আইসোলেশন ওয়ার্ড প্রস্তুত রাখা হয়েছে।

অন্য দিকে সিলেটে গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গে আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে বিভাগে পরিস্থিতির ওপর তীক্ষè নজর রাখছে স্বাস্থ্য বিভাগ।

ময়মনসিংহ অফিস জানিয়েছে, ময়মনসিংহে হামের উপসর্গ নিয়ে ৯ মাস বয়সী আরো এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। ময়মনসিংহ মেডিক্যাল কলেজ (মমেক) হাসপাতালে বর্তমানে বিশেষায়িত আইসোলেশন ওয়ার্ডে ৮০ শিশু চিকিৎসাধীন, যা নির্ধারিত শয্যার (৬৪টি) চেয়ে বেশি। পরিস্থিতি মোকাবেলায় তিনটি বিশেষ মেডিক্যাল টিম গঠন করা হয়েছে। ল্যাব পরীক্ষায় ময়মনসিংহে ৭০ শিশুর শরীরে হামের সংক্রমণ নিশ্চিত হওয়া গেছে।

কুমিল্লা প্রতিনিধির পাঠানো তথ্য অনুসারে, কুমিল্লা মেডিক্যাল কলেজ (কুমেক) হাসপাতালেও শয্যাসঙ্কট প্রকট। সেখানে ৪০ শয্যার বিপরীতে ৫৯ জন শিশু চিকিৎসাধীন থাকায় অনেককে মেঝেতে রেখে সেবা দেয়া হচ্ছে। কুমেক হাসপাতালের শিশু বিভাগীয় প্রধান ডা: মিয়া মনজুর আহমেদ জানান, গত ১৮ মার্চ থেকে এ পর্যন্ত ১১২ জন শিশু ভর্তি হয়েছে, তবে এখন পর্যন্ত সেখানে কোনো মৃত্যুর ঘটনা ঘটেনি। অনেক অভিভাবক স্বীকার করেছেন, জন্মের পর শিশুকে হামের টিকা না দেয়ায় তারা আক্রান্ত হচ্ছে।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রামে নতুন করে চার জনের শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে এবং ১৬ জন সন্দেহভাজন রোগী ভর্তি হয়েছেন। জেলা সিভিল সার্জন ডা: জাহাঙ্গীর আলম জানান, নগরে এখন পর্যন্ত মোট ১৪ জন নিশ্চিত রোগী পাওয়া গেছে। অন্য দিকে চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধির পাঠানো খবর অনুসারে, চুয়াডাঙ্গা সদর হাসপাতালে পাঁচ জন রোগী ভর্তি হলেও দুই জন সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছেন। আক্রান্তদের সবার মধ্যেই প্রথমে জ্বর, ঠাণ্ডা-কাশি এবং পরে শরীরে লালচে ফুসকুড়ি দেখা দিচ্ছে বলে জানিয়েছেন চিকিৎসকরা।

চিকিৎসকরা বলছেন, যেসব শিশুর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম এবং যারা নিয়মিত টিকা নেয়নি, তারাই বেশি জটিলতার শিকার হচ্ছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সহায়তায় আক্রান্ত শিশুদের নমুনা সংগ্রহ ও পরীক্ষা কার্যক্রম জোরদার করা হয়েছে।

কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা: আলী নূর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানান, ৯ মাস থেকে দুই বছর বয়সী যেসব শিশু টিকা নেয়নি, তাদের জরুরি ভিত্তিতে টিকা দেয়া হচ্ছে। এ ছাড়া শিশুদের জটিলতা কমাতে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো হচ্ছে। আগামী ৩ মে থেকে কুমিল্লার মতো জেলাগুলোতে বড় পরিসরে জরুরি টিকাদান কার্যক্রম শুরু হতে পারে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, হাম একটি অতিসংক্রামক রোগ। শিশুর জ্বর ও কাশির পর শরীরে র‌্যাশ দেখা দিলে দ্রুত নিকটস্থ হাসপাতালে যোগাযোগ করতে হবে। আক্রান্ত শিশুকে অন্য শিশুদের থেকে আলাদা (আইসোলেশন) রাখা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার ও ভিটামিন নিশ্চিত করা জরুরি।