এইচআরএসএস প্রতিবেদন

নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত ৩ আহত তিন শতাধিক

Printed Edition

নিজস্ব প্রতিবেদক

সদ্য শেষ হওয়া ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট অনেকটা শান্তিপূর্ণ পরিবেশে সম্পন্ন হলেও ফলাফল ঘোষণার পর দেশের বিভিন্ন স্থানে সঙ্ঘাত ও সহিংসতা ছড়িয়ে পড়েছে। নির্বাচন-পরবর্তী এসব সহিংসতায় এখন পর্যন্ত তিনজন নিহত এবং তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন।

গতকাল রোববার জাতীয় প্রেস ক্লাবে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য তুলে ধরে মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস সাপোর্ট সোসাইটি (এইচআরএসএস)। জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্রিক সহিংসতা ও নির্বাচন পর্যবেক্ষণ পরবর্তী সংবাদ সম্মেলন শীর্ষক অনুষ্ঠানে পৃথক দুটি প্রতিবেদনের লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক ইজাজুল ইসলাম ও প্রোগ্রাম অফিসার মো: সাইফুল ইসলাম।

সংবাদ সম্মেলনে এইচআরএসএস জানায়, নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতার পৃথক তিনটি ঘটনায় তিনজন নিহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে একজন মুন্সীগঞ্জে, একজন বাগেরহাটে এবং একজন ময়মনসিংহের হালুয়াঘাটে (শিশু) প্রাণ হারিয়েছেন। এ ছাড়া নোয়াখালীর হাতিয়া উপজেলার চানন্দী ইউনিয়নে ‘শাপলা কলি’ প্রতীকে ভোট দেয়াকে কেন্দ্র করে তিন সন্তানের জননীকে (৩২) ধর্ষণ ও শারীরিক নির্যাতনের অভিযোগ উঠেছে, যা অত্যন্ত ন্যক্কারজনক ও উদ্বেগজনক।

এইচআরএসএস আরো জানায়, মুন্সীগঞ্জ, ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, পটুয়াখালী, ফরিদপুর, পাবনা, ঝিনাইদহ, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, পঞ্চগড়, নাটোর, নেত্রকোনা, নড়াইল, চট্টগ্রাম, কুষ্টিয়া, সাতক্ষীরা, নোয়াখালী, কুড়িগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, ফেনী, ঝালকাঠি, চুয়াডাঙ্গা, পিরোজপুর, চাঁদপুর ও ঝালকাঠিসহ অন্তত ৩০টি জেলায় বিএনপি, জামায়াত ও স্বতন্ত্র প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে দুই শতাধিক পৃথক সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। এসব ঘটনায় তিন শতাধিক মানুষ আহত হয়েছেন এবং অন্তত ৩৫০টি অফিস, ব্যবসায় প্রতিষ্ঠান ও ঘরবাড়ি ভাঙচুর, লুটপাট ও অগ্নিসংযোগের শিকার হয়েছে।

ভোটের দিনের পরিস্থিতি

এইচআরএসএসের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, বড় ধরনের রক্তক্ষয়ী সঙ্ঘাত ছাড়াই নির্বাচনের দিন ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হয়েছে। তবে দেশের কয়েকটি স্থানে হামলা-পাল্টা হামলা ও সংঘর্ষের ঘটনা ঘটেছে। নির্বাচনের দিন সারা দেশে অন্তত ৩৯৩টি অপরাধমূলক ঘটনা নথিভুক্ত করা হয়েছে। এর মধ্যে কেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, জাল ভোট প্রদান, পোলিং এজেন্ট বের করে দেয়া এবং বিভিন্ন প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষের ঘটনা উল্লেখযোগ্য। এসব বিশৃঙ্খলার হার বরিশাল ও রাজশাহী বিভাগে বেশি এবং ঢাকা ও ময়মনসিংহ বিভাগে তুলনামূলক কম ছিল। তবে ভোটের দিন দেশজুড়ে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী, নির্বাচনের দিন ১৪৯টি ভোটকেন্দ্রে বিশৃঙ্খলা, ১০৫টি সংঘর্ষের ঘটনায় ১৪৫ জন আহত, ৫৯টি জাল ভোটের ঘটনা, ১৯ জন পোলিং এজেন্টকে বের করে দেয়া, ১৩ জন দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তির অবহেলা এবং ১৮টি ভোটকেন্দ্রে প্রবেশে বাধার ঘটনা ঘটেছে। এ ছাড়া ছয়জন প্রার্থীকে মারধর, তিনটি ব্যালট বাক্স ছিনতাই, দুটি অগ্নিসংযোগ এবং ৩১টি অন্যান্য বিশৃঙ্খলার ঘটনা ঘটেছে। ওই দিন আটক হয়েছেন ৫০ জন, প্রত্যাহার করা হয়েছে ১৩ জন প্রিজাইডিং ও পোলিং অফিসারকে। পাশাপাশি ৫৫টি কারাদণ্ড ও জরিমানার ঘটনা, পাঁচজন সাংবাদিক আহত হওয়া, তিনটি কেন্দ্রের ভোট বাতিল এবং এআই (কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা) ব্যবহার করে ৬৪টি অপতথ্য ছড়ানোর ঘটনা ঘটেছে।

নারী কর্মীদের ওপর হামলা

এইচআরএসএস জানায়, এবারের নির্বাচনে নারী প্রার্থীর সংখ্যা কম থাকলেও নির্বাচনী প্রচারণায় নারীদের অংশগ্রহণ ছিল চোখে পড়ার মতো। তবে একই সাথে নারী সহিংসতা, হামলা ও লাঞ্ছনার ঘটনাও বেড়েছে। তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত অন্তত ৩২টি ঘটনায় কমপক্ষে ৪৫ জন নারী হেনস্তার শিকার এবং ২৩ জন আহত হয়েছেন। ভুক্তভোগীদের মধ্যে ৩৯ জন জামায়াত সমর্থক, একজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশের সমর্থক এবং ৫ জন সাধারণ নারী (রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া যায়নি) রয়েছেন। এসব হামলার মধ্যে ৩১টি ঘটনায় বিএনপি ও তার সহযোগী সংগঠন এবং স্বতন্ত্র প্রার্থীর নেতাকর্মী এবং একটি ঘটনায় জামায়াতের সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ রয়েছে।সাড়ে ৪ মাসের নির্বাচনী সহিংসতা

প্রতিবেদনে গত চার মাসের সামগ্রিক চিত্র তুলে ধরে বলা হয়, অক্টোবর থেকে ১৪ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত নির্বাচন কেন্দ্রিক সাত শতাধিক সহিংসতার ঘটনা ঘটেছে। এতে নিহত হয়েছেন ১০ জন এবং আহত হয়েছেন অন্তত দুই হাজার ৫০৩ জন। এই সময়ে ৩৪ জনের বেশি মানুষ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন এবং পাঁচ শতাধিক ঘরবাড়ি, যানবাহন ও নির্বাচনী কার্যালয়ে ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করা হয়েছে। এ ছাড়া তফসিল ঘোষণার পর থেকে ১১ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত ২৫৪টি সহিংসতার ঘটনায় পাঁচজন নিহত এবং এক হাজার ৬৫০ জন আহত হয়েছেন। এই সময়ে ২৪ জন গুলিবিদ্ধ হওয়ার পাশাপাশি ২০০-এর বেশি স্থাপনায় হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে।