ভারতসহ বেসরকারি খাতে বিদ্যুৎ ক্রয়চুক্তি সার্বভৌমত্বের জন্য হুমকি : বিদ্যুৎমন্ত্রী
Printed Edition
বিশেষ সংবাদদাতা
বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেছেন, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ভারতসহ বিদেশী ও বেসরকারি খাতের সাথে করা বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তিগুলো দেশের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্বের জন্য মারাত্মক হুমকি। তিনি বলেন, বিদ্যুৎ খাতের সাথে দেশের সার্বভৌমত্ব নিবিড়ভাবে জড়িত, কিন্তু আগের সরকার এই বিষয়টিকে যথাযথ গুরুত্ব দেয়নি এবং একের পর এক দেশের স্বার্থবিরোধী চুক্তি করে ফেলেছে।
গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে নিজ দফতরে সাংবাদিকদের সাথে আলাপচারিতায় মন্ত্রী এসব মন্তব্য করেন। তিনি দেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি, জ্বালানি সঙ্কট, এলএনজি আমদানি এবং বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পরিশোধ নিয়ে বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর দেন। বিদ্যুৎ চুক্তি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, এই চুক্তিগুলো দেশের সার্বভৌমত্বের সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। অনেক ক্ষেত্রে এসব চুক্তিতে সার্বভৌমত্বকে কার্যত গ্যারান্টি হিসেবে রাখতে হয়। তিনি অভিযোগ করেন, আগের সরকার এই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টি নিয়ে যথাযথ সতর্কতা অবলম্বন করেনি।
মন্ত্রী আরো বলেন, আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ খাতের অধিকাংশ চুক্তিই জাতীয় স্বার্থবিরোধী। তিনি জানান, বিএনপি সরকারের নীতি ছিল দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বৃদ্ধির ওপর জোর দেয়া। কিন্তু বাস্তবে পর্যাপ্ত উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি খাত এবং বিদেশ থেকে বিদ্যুৎ আমদানির সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যা দেশের সার্বভৌমত্বের পরিপন্থী। এ প্রসঙ্গে মন্ত্রী বিশেষভাবে উল্লেখ করেন আদানির সাথে চুক্তিসহ অন্যান্য বিদেশী এবং বেসরকারি চুক্তিগুলো পর্যালোচনার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। নতুন সরকার দায়িত্ব গ্রহণের মাত্র সাত দিনেই প্রতিটি চুক্তি খতিয়ে দেখা শুরু করেছে। দেশের জনগণের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে চুক্তিগুলো পর্যালোচনা করা হবে। যেসব চুক্তি দেশবিরোধী হিসেবে চিহ্নিত হবে, সেগুলোর বিষয়ে উপযুক্ত পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।
বেসরকারি বিদ্যুৎ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর বকেয়া পরিশোধ নিয়ে মন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার মাত্র সাত দিন হলো দায়িত্ব নিয়েছে, বকেয়া একদিনে তৈরি হয়নি। তিনি উল্লেখ করেন, আগের সরকারের সময়ে এ বিষয়ে কী পদক্ষেপ নেয়া হয়েছিল, সেটাও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে। নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়ে বিষয়টি পর্যালোচনা করছে এবং প্রয়োজনীয় সমাধান খুঁজছে।
মন্ত্রী বলেন, দেশের স্বাধীনতাকে কিছু নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে তুলে দেয়া হয়েছিল। এসব বিষয় পুনর্মূল্যায়ন করে একটি সমাধানের পথে এগোনো প্রয়োজন। তিনি জানান, ইতোমধ্যে একটি কমিটি কাজ করেছে এবং প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে, যা সরকারের নীতিনির্ধারণে ব্যবহার করা হবে।
আইনি জটিলতার সম্ভাবনা প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার আলোচনার মাধ্যমে সমস্যার সমাধান করতে আগ্রহী। তবে যদি কেউ আদালতের আশ্রয় নেয়, তাহলে সরকারকেও সেই আইনি প্রক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হবে। তিনি এ বিষয়ে সতর্ক করে বলেন, চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন আইনসম্মত হতে হবে এবং দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা করতে হবে।
নবায়নযোগ্য জ্বালানিকে অগ্রাধিকার দেয়ার বিষয়ে মন্ত্রী বলেন, জনগণকে সাশ্রয়ীমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন জ্বালানি এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সরকারের প্রধান লক্ষ্য। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে দেশের দীর্ঘমেয়াদি স্বার্থ রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি।
মন্ত্রী এই মুহূর্তে বিদ্যুৎ খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে সামনে রেখে বিভিন্ন কার্যক্রম ও নীতিনির্ধারণের কাজ দ্রুত এগিয়ে চলছে বলে জানান। তিনি বলেন, নতুন সরকার প্রতিটি বিদ্যুৎ চুক্তি ও নীতি খতিয়ে দেখে নিশ্চিত করবে যে, দেশের সার্বভৌমত্ব এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষিত হচ্ছে। এ ছাড়া বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি আমদানিতে স্বচ্ছতা বজায় রাখা এবং ব্যয় ও নীতির যথাযথ নিয়ন্ত্রণের ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হবে।
বিদ্যুৎ চুক্তি পুনর্মূল্যায়ন এবং বকেয়া পরিশোধের বিষয়গুলো সরকারের কাছে প্রাধান্য পাবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, এই চুক্তিগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক প্রভাব রাখে না, বরং দেশের সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতার সাথে সরাসরি সম্পর্কিত। তাই প্রতিটি সিদ্ধান্ত অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নেয়া হচ্ছে।
মন্ত্রী সাংবাদিকদের আরো জানান, সরকারের লক্ষ্য হলো দেশের বিদ্যুৎ খাতকে দীর্ঘমেয়াদি এবং টেকসইভাবে পরিচালনা করা। এটি শুধুমাত্র বর্তমান সরকারের নয়, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে সুশাসন, স্বচ্ছতা এবং ন্যায্যতা নিশ্চিত করা নতুন সরকারের অঙ্গীকার। এই বিষয়ে মন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, দেশের বিদ্যুৎ খাতের উন্নয়নে নতুন নীতি ও পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজ চলছে। এটি দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং জনগণের স্বার্থ রক্ষার একটি অংশ। তিনি বলেন, সরকারের নীতি হলো দেশকে বিদেশী নির্ভরতা থেকে মুক্ত করা এবং দেশের নিজস্ব উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানো।
বিদ্যুৎমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানান, এই মুহূর্তে দেশের বিদ্যুৎ খাতের চ্যালেঞ্জগুলোকে সমাধান করার জন্য সচেষ্ট এবং প্রতিটি চুক্তি ও নীতিকে পুনর্মূল্যায়ন করা হবে। এতে দেশের সার্বভৌমত্ব রক্ষা পাবে এবং জনগণের জন্য সাশ্রয়ীমূল্যে গুণগত মানসম্পন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। এই প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে। তিনি আশা প্রকাশ করেছেন যে, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সব সমস্যা সমাধান করলে দেশের বিদ্যুৎ খাত দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল ও নির্ভরযোগ্য হবে।