২০ বছর পর গাজা উপত্যকায় প্রথম পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত

ইসরাইলের অব্যাহত হামলায় পুলিশসহ নিহত আরো ১২

Printed Edition
onno-`
মধ্য গাজা উপত্যকার দেইর আল-বালাহের একটি ভোটকেন্দ্রে পৌরসভা নির্বাচনে একজন ফিলিস্তিনি নারী ভোট দিচ্ছেন : ইন্টারনেট

নয়া দিগন্ত ডেস্ক

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজা উপত্যকার মধ্যাঞ্চল এবং অধিকৃত পশ্চিমতীরে পৌর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গাজায় ইসরাইলের নির্বাসিত যুদ্ধের সূচনার পর এটিই প্রথম স্থানীয় ভোট। শনিবার স্থানীয় সময় সকাল ৭টায় (জিএমটি ০৪:০০) গাজার দেইর আল-বালাহ এলাকার ৭০ হাজার যোগ্য ভোটারের জন্য ভোটকেন্দ্রগুলো উন্মুক্ত করা হয়- যা এই অবরুদ্ধ ভূখণ্ডে গত ২০ বছরের মধ্যে প্রথম নির্বাচন।

গাজার একটি মাত্র শহরে এই ভোট গ্রহণ মূলত প্রতীকী, যাকে কর্মকর্তারা একটি ‘পাইলট’ বা পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে অভিহিত করছেন। দেইর আল-বালাহকে বেছে নেয়ার কারণ হলো, এটি গাজার হাতেগোনা কয়েকটি এলাকার একটি যা ইসরাইলি বাহিনীর হাতে পুরোপুরি ধ্বংস হয়নি।

একই সাথে অধিকৃত পশ্চিমতীরের প্রায় ১০ লাখ নিবন্ধিত ভোটারও স্থানীয় কাউন্সিল নির্ধারণে ভোট দিচ্ছেন, যারা পানি, রাস্তা এবং বিদ্যুতের মতো পরিষেবাগুলো তদারকি করেন। তবে এই ভোটকে অনেকটা আনুষ্ঠানিকতা হিসেবে দেখা হচ্ছে, কারণ অধিকৃত এলাকায় ইসরাইলি অনুমোদন ছাড়া কোনো দাফতরিক নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

এই নির্বাচন এমন একসময়ে অনুষ্ঠিত হচ্ছে যখন রাজনৈতিক পরিবেশ অত্যন্ত সঙ্কুচিত এবং জনগণের মধ্যে গভীর হতাশা বিরাজ করছে। ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ (পিএ) দুর্নীতি, রাজনৈতিক স্থবিরতা এবং ২০০৬ সালের পর থেকে জাতীয় নির্বাচন না হওয়ায় জনমনে তৈরি হওয়া ক্ষোভের মুখে নিজেদের সংস্কার ও বৈধতা প্রমাণের চেষ্টা করছে। বেশির ভাগ নির্বাচনী তালিকা প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আব্বাসের ফাত্তাহ আন্দোলন অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের দ্বারা সমর্থিত। গাজার কিছু অংশ নিয়ন্ত্রণকারী হামাস বা অন্য কোনো রাজনৈতিক দলের আনুষ্ঠানিক অংশগ্রহণ এখানে নেই।

দুই বছরেরও বেশি সময় ধরে চলা যুদ্ধে গাজার অধিকাংশ এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়ায় রামাল্লাভিত্তিক কেন্দ্রীয় নির্বাচন কমিশন দেইর আল-বালাহতে প্রথম ভোট করার সিদ্ধান্ত নেয়। তারা প্রথাগত ভোটার নিবন্ধন করতে না পারায় নতুন পদ্ধতি অবলম্বন করেছে। কমিশনের মুখপাত্র ফরিদ তামাল্লাহ বলেন, এর মূল উদ্দেশ্য হলো পশ্চিমতীর ও গাজাকে রাজনৈতিকভাবে একটি ব্যবস্থার অধীনে যুক্ত করা। তিনি আরো জানান, দেইর আল-বালাহ ভোটের আগে কমিশন ইসরাইল বা হামাসের সাথে সরাসরি কোনো সমন্বয় করেনি এবং গাজায় ব্যালট পেপার, ব্যালট বাক্স বা কালির মতো সরঞ্জাম পাঠাতেও সক্ষম হয়নি।

কমিশনের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, যদিও ফিলিস্তিনি ভোটারদের উপস্থিতির হার ধীরে ধীরে কমছে, তবুও আঞ্চলিক মানদণ্ডে আগের স্থানীয় নির্বাচনগুলোতে এটি তুলনামূলকভাবে বেশি ছিল, যা গড়ে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশের মধ্যে থাকত।

গাজায় ২০ বছরের মধ্যে প্রথম নির্বাচন

হামাস ২০০৬ সালের সংসদীয় নির্বাচনে জয়লাভ করে এবং এক বছর পর ফাত্তাহ-নিয়ন্ত্রিত ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে গাজার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে। হামাস শনিবারের ভোটে কোনো প্রার্থী দেয়নি, তবে ফিলিস্তিনি সেন্টার ফর পলিসি অ্যান্ড সার্ভে রিসার্চের জনমত জরিপ বলছে, গাজা ও পশ্চিমতীর উভয় স্থানেই হামাস এখনো সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনৈতিক শক্তি।

মধ্যপ্রাচ্য শান্তি প্রক্রিয়ার জন্য জাতিসঙ্ঘের উপ-বিশেষ সমন্বয়কারী রামিজ আলাকবারভ এই নির্বাচনকে ‘একটি অত্যন্ত চ্যালেঞ্জিং সময়ে ফিলিস্তিনিদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। গাজার অর্ধেক বর্তমানে হামাসের নিয়ন্ত্রণে থাকলেও উপকূলীয় এই ভূখণ্ড মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ২০-দফা পরিকল্পনার অধীনে একটি নতুন শাসনকাঠামোতে রূপান্তরিত হওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এই পরিকল্পনায় আন্তর্জাতিক দূতদের সমন্বয়ে গঠিত একটি ‘শান্তি বোর্ড’ এবং অনির্বাচিত ফিলিস্তিনিদের নিয়ে একটি কমিটি গঠনের কথা বলা হয়েছে। তবে হামাসের নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন এবং ক্ষমতা হস্তান্তরের মতো পরবর্তী ধাপগুলোর অগ্রগতি বর্তমানে স্থবির হয়ে আছে।

গাজায় পুলিশসহ নিহত ১২

ফিলিস্তিনের অবরুদ্ধ গাজায় যুদ্ধবিরতি উপেক্ষা করে ইসরাইলি বাহিনীর বর্বর হামলায় কমপক্ষে ১২ জন ফিলিস্তিনি নিহত হয়েছেন। স্থানীয় চিকিৎসা সূত্রের বরাতে শুক্রবার এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে আলজাজিরা। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুক্রবার খান ইউনুসে একটি পুলিশের গাড়িকে লক্ষ্য করে চালানো হামলায় অন্তত আটজন নিহত হন, যাদের মধ্যে তিনজন সাধারণ পথচারী ছিলেন।

গাজা সিটিতে পৃথক আরেকটি হামলায় নিহত হয়েছেন দুই পুলিশ কর্মকর্তা। এ ছাড়া উত্তর গাজার বেইত লাহিয়ায় একটি বাড়িতে বোমা হামলায় আরো দু’জন প্রাণ হারান। এ নিয়ে গাজা উপত্যকায় ইসরাইলি হামলায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭২ হাজার ৫৮৫ জনে। ২০২৩ সালের অক্টোবর থেকে শুরু হওয়া সামরিক অভিযানের সর্বশেষ হতাহতের তথ্য প্রকাশ করেছে গাজার স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়।

যুদ্ধবিরতি সত্ত্বেও গাজায় নিয়মিত হামলা চলতে থাকায় মানবিক পরিস্থিতি আরো জটিল হয়ে উঠছে। চিকিৎসাব্যবস্থা, আশ্রয় ও খাদ্যসঙ্কটের পাশাপাশি উদ্ধারকার্যক্রমও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। গাজার স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, অব্যাহত হামলা ও অবরোধের কারণে আহতদের চিকিৎসা দেয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। অনেক হাসপাতাল আংশিক বা পুরোপুরি অকার্যকর হয়ে পড়ায় সঙ্কট আরো বাড়ছে।